যা করেছি সন্তানেরা গর্ববোধ করবে : শ্রীদেবী

প্রকাশিত

বিনোদন ডেস্ক: বলিউড অভিনেত্রী শ্রীদেবী, যার চিত্তাকর্ষক চোখ ও নাচ এক সময় দর্শকের মনে শিহরণ জাগিয়েছে। তিনি হয়েছিলেন ভক্তদের স্বপ্নের রানি। ২৪ ফেব্রুয়ারি ইহলোক ত্যাগ করেছেন এ অভিনেত্রী। তার অকাল প্রয়াণে স্তব্ধ বলিপাড়া। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোক প্রকাশ করছেন তারকারা।

দীর্ঘ অভিনয় জীবনে তামিল, তেলেগু, হিন্দিসহ বেশ কিছু ভাষার সিনেমায় অভিনয় করেছেন শ্রীদেবী। ১৯৭৮ সালে বলিউড সিনেমায় শ্রীদেবীর অভিষেক হয়। ১৯৯৭ সালে ‘জুদাই’ মুক্তির পর পারিবারিক কারণে সিনেমা থেকে বিরতি নেন শ্রীদেবী। ২০১২ সালে মুক্তি পায় ‘ইংলিশ ভিংলিশ’। তার সর্বশেষ সিনেমা ‘মম’। গত বছর মুক্তিপ্রাপ্ত এ সিনেমায় অভিনয় করে প্রশংসিত হন তিনি। সিনেমাটি মুক্তির আগে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন শ্রীদেবী। সেই সাক্ষাৎকারের কিছু অংশ তুলে ধরা হলো।

প্রশ্ন: ‘ইংলিশ ভিংলিশ’ থেকে ‘মম’ পাঁচ বছর। এর মধ্যে কোনো আকর্ষণীয় সিনেমার প্রস্তাব পাননি?

শ্রীদেবী: এটা প্রস্তাব পাওয়ার বিষয় নয়। করতে হবে এজন্য কোনো সিনেমায় অভিনয় করতে চাই না। আমার সন্তানরা সবসময় আমার কাছে প্রাধান্য পায়। যখন ‘ইংলিশ ভিংলিশ’ করেছি তখন সময় আমার অনুকূলে ছিল। আর বালকি (‘ইংলিশ ভিংলিশ’ সিনেমার প্রযোজক) আমার ভালো বন্ধু। সুতরাং তিনি এমনভাবে শিডিউল করেছেন যেন সন্তানরা আমার সঙ্গে থাকতে পারেন। বাচ্চাদের ছুটি চলছিল। তাই ওই দুই মাস শুটিং করেছি। এরপর কিছু প্রস্তাব এসেছে কিন্তু নানা কারণে হয়ে ওঠেনি। যেমন– বাচ্চাদের ছেড়ে আউটডোরে শুটিং, চিত্রনাট্য পছন্দ না হওয়া ইত্যাদি।

প্রশ্ন: আপনার বয়সি অনেক অভিনেত্রী সিনেমায় ফিরে এসেছেন। কিন্তু আপনার বিষয়টি ছিল ভিন্ন। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?

শ্রীদেবী: আমি সবসময়ই আমার মন মতো চলেছি। সবকিছুর আগে চরিত্রটি আমার সঙ্গে খাপ খেতে হবে। ১০-২০ বছর আগে আমি যা করেছি এখন তা করতে পারব না। আমি চাই, যা করছি তার জন্য আমার সন্তানরা গর্ববোধ করুক। সুতরাং অবশ্যই সেই সিনেমা বেছে নেব যার গল্প অনেক ভালো এবং যার জন্য অতীতে আমি কী ছিলাম সেটি স্মরণ করার প্রয়োজন হবে না-ইট ওন্ট সিম অর লুক লাইক লজিক্যাল অ্যানিমোর।

প্রশ্ন: আপনার প্রত্যাবর্তনের এই সময়টুকুতে অনেক পরিবর্তন এসেছে। বিশ বছর কোনো চুক্তিবদ্ধ হওয়ার বিষয় ছিল না। মানুষ ফেসভ্যালু এবং সম্পর্কের কারণে সিনেমা করত…

শ্রীদেবী: হ্যাঁ এমন অনেক হয়েছে। কোনো প্রযোজক বিপদে থাকলে আমরা তার সাহায্যের জন্য সিনেমা করতাম। আমিও তেমন অনেক সিনেমায় অভিনয় করেছি। নির্দিষ্ট কোনো চিত্রনাট্য থাকত না। চুক্তির কথা বাদই দিলাম। কিন্তু এখন বিষয়গুলো অনেকটা গোছালো হয়েছে ও পেশাদারিত্ব এসেছে। আমি এটা খুবই পছন্দ করি। এখন সময়ও নির্দিষ্ট। কাজের পরিবেশ অনেক সুন্দর। সাথে প্রত্যেকটি বিভাগ আলাদা ব্যক্তি পরিচালনা করেন। সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনায় কাজ হয়। সুতরাং এটি খুবই ভালো।

প্রশ্ন: মা হিসেবে আপনি কোন বিষয়টি ভয় পান?

শ্রীদেবী: অনেক বিষয় রয়েছে যা আমি ভয় পাই। আমার সন্তানদের ব্যাপারে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগী। তারা যখন ঘরের বাইরে বের হয়, ফিরে না আসা পর্যন্ত চিন্তায় থাকি। আমি তাদের কয়েকবার ফোন দিই, কী হচ্ছে, কোথাও গাড়ি আটকে গেল কিনা- এগুলো স্বাভাবিক বিষয়। অন্যান্য মায়েরাও সন্তান নিয়ে এরকম চিন্তায় থাকেন।

প্রশ্ন: মা হিসেবে কি আপনি রক্ষণশীল অথবা অধিকার খাটাতে চান? 

শ্রীদেবী: আমি কখনো অধিকার খাটাই না। কিন্তু আমি খুবই রক্ষণশীল।

প্রশ্ন: মেয়েদের জন্য কোনো বাধাধরা সময় আছে কি?

শ্রীদেবী: হ্যাঁ, জানভি ও খুশি কাপুরের জন্য নিয়ম একই। তারা জানে তাদের নির্দিষ্ট সময় বেধে দেয়া রয়েছে এবং সেই সময়ের মধ্যেই বাড়ি ফিরতে হবে। তা না হলে আমি তাদের ফোন করে প্রশ্ন করতেই থাকব।

প্রশ্ন: আপনার ফোন কলের ব্যাপারে তারা কেমন প্রতিক্রিয়া দেখায়?

শ্রীদেবী: প্রতিক্রিয়াটা দর কষাকষির মতো হয়। যেমন, ‘মা আর আধা ঘণ্টা। মা আরো বিশ মিনিট, প্লিজ। কিন্তু তারা খুবই বাধ্যগত সন্তান। জানভি এবং খুশির বোধশক্তি খুবই ভালো। তারা তাদের সীমাবদ্ধটা জানে। তাই তাদের জন্য আমাকে খুব বেশি ঝামেলা পোহাতে হয় না।

 

 

প্রশ্ন: আপনার মা যেমন ছিলেন, মা হিসেবে আপনি তার চেয়ে কতটা আলাদা?

শ্রীদেবী: আমি যদি আমার মায়ের ধারেকাছেও হতাম তারা আমার তল্পিতল্পা গুছিয়ে দিয়ে বলত, ‘তুমি গিয়ে চেন্নাই থাকো।’ আমার মায়ের কাছে যেভাবে বড় হয়েছি, আমার সন্তানদের ক্ষেত্রে তেমনটা চাই না। সময় বদলে গেছে এবং আমিও বদলেছি। জানভি ও খুশি দুজনই জানে আমি কোথা থেকে এসেছি। কিন্তু আমি বিজ্ঞান-প্রযুক্তি জানা আধুনিক মা নই, যার কাছে সবকিছুই ঠিকঠাক হবে।

প্রশ্ন: আপনার মেয়েরা কী করতে পারবে এবং করবে না এই তালিকাটা কী?

শ্রীদেবী: অবশ্যই অনেক কিছু রয়েছে। আমি তাদের বলি, একটি গেট টুগেদার রয়েছে। তারা বলে, ‘না মা অনেক দেরি হয়ে গেছে। আমার মনে হয় না স্বস্তিবোধ করব।’ তারা দুজনই খুবই স্বাস্থ্য সচেতন এবং আমি তাদের এ ব্যাপারে নিয়ন্ত্রণ করি না। এর মানে এই নয়, সবকিছু বিশৃঙ্খল, এটি এখনো সেই পর্যায়ে পৌঁছায়নি। একদিন বেশি রাত হয়ে গেলে পরদিন সকালে তারা বলে, ‘এটি সহ্য হচ্ছে না।’ এটি খুবই ভালো তারা জানে কীভাবে সুস্থ থাকতে হয়। তাই তাদের কোনো কাজ করতে আমাকে জোর করতে হয় না।

প্রশ্ন: বাড়িতে মেয়েদের খাওয়ানোর ব্যাপারে কোনো জোরাজুরি রয়েছে কি? আপনি কি তাদের জন্য রান্না করেন?

শ্রীদেবী: আমি রান্না করি না। আমি রান্না ঘরে গিয়ে তদারকি করি এবং বাচ্চা কী খাবে তার পরিকল্পনা করি। কিন্তু রান্না তো অনেক দূরের বিষয়। জানভি রান্না করতে পছন্দ করে। সে কেক, কাস্টার্ড, কুকিজ এসব তৈরি করে। আমি খাওয়াটা উপভোগ করি। তাদের খাওয়ানোর পরিবর্তে তারাই রান্না করে এবং আমি খাই।

প্রশ্ন: ব্যক্তিক দিক থেকে কে আপনার কাছাকাছি- জানভি নাকি খুশি?

শ্রীদেবী: জানভি অনেকটা আমার মতো। সে খুবই আবেগপ্রবণ, সরল এবং বাধ্যগত। তার মধ্যে অনেকটা আমাকে খুঁজে পাই। খুশি স্বাধীনচেতা, শক্ত এবং তার নিজস্ব মতামত রয়েছে।

প্রশ্ন: সম্প্রতি, সাইফ খানের মেয়ে সারা সিনেমায় নাম লিখিয়েছে। সাইফ খুশি নন। কারণ এটি একটি নিরাপত্তাহীন পেশা। আপনি কি একমত?

শ্রীদেবী: সাইফের সঙ্গে আমি সম্পূর্ণ একমত। প্রথম দিকে আমিও চাইনি জানভি অভিনেত্রী হোক। স্বাভাবিকভাবেই মা-বাবারা সন্তানের ব্যাপারে অনেক রক্ষণাত্মক হন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে বলতে গেলে বিশ্বের সামনে সন্তানদের মেলে ধরা হচ্ছে। এত বছর আপনি তাদের লালন-পালন করেছেন এবং চাইবেন তারা সুখে শান্তিতে থাকুক। কিন্তু সিনেমায় গেলে তা হবে না। শুরুতে তাই এড়িয়ে গেছি এবং তাকে সাবধান করেছি, এটি খুবই কঠিন কাজ। অনেক আত্মত্যাগ করতে হবে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে সে প্রস্তুত। মা-বাবা হিসেবে আমরা তাকে সহযোগিতা করব।

প্রশ্ন: সে কী আপনার গানের সঙ্গে কখনো নেচেছে?

শ্রীদেবী: না, কখনো না। জানভি আমার সিনেমা দেখেনি। আমি কখনোই সন্তানদের আমার সিনেমা দেখাইনি। আমার মনে হয় না ‘মিস্টার ইন্ডিয়া’ এবং আরো কয়েকটি ছাড়া তারা কোনো সিনেমা দেখেছে। প্রথমবার জানভি অভিনেত্রী হওয়ার কথা স্বীকার করে যখন কেউ একজন তাকে জিজ্ঞেস করেছিল, জীবনে কী হতে চান? সে বলেছিল, ‘আমি চিকিৎসক হতে চাই কিন্তু বাস্তবে নয়। সিনেমাতে চিকিৎসকের ভূমিকায় অভিনয় করতে চাই।’ এটা খুবই হাস্যকর ছিল এবং আমি ভাবছিলাম, ‘বলে কী?’ মনে হয় তার মনের মধ্যে এটি ছিল কিন্তু আমাদের কাছে বলতে লজ্জা পাচ্ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে বোমা ফাটতে থাকে।

প্রশ্ন: তখন আপনার প্রতিক্রিয়া কী ছিল?

শ্রীদেবী: আমি রাগ করিনি। আমি বনিজির (বনি কাপুর) কাছে গিয়ে বলি, মেয়ে এটা করতে চায়। তারপর দুজন মাথায় হাত দিয়ে ভাবতে থাকি, এটা কী হলো? তারপর ধীরে ধীরে আমরা এ বিষয়টি মেনে নেই।

প্রশ্ন: মেয়েদের সঙ্গে আপনার সম্পর্কটা খুবই বন্ধুত্বপূর্ণ। তারা কি তাদের বয়ফ্রেন্ড এবং ব্যক্তিগত বিষয় আপনার সঙ্গে আলোচনা করে?

শ্রীদেবী: হ্যাঁ আমরা এটা করি। দুই সন্তানই আমার সঙ্গে সব বিষয় ভাগাভাগি করে। আমিও ওদের সঙ্গে অনেক কিছু ভাগ করে নেই। আমরা বন্ধুর মতো। তাই যা হোক না কেন, আমি সবার আগে জানতে পারি।