ইউএস,বাংলা বিমান দূর্ঘটনা এবার চলুন অাসা যাক আসল কথায়

প্রকাশিত

লেখকঃ – সাংবাদিক,তুহিন সারোয়ার,চেয়ারম্যান চ্যানেল সিক্স, হিন্দুস্তান টাইমস এর বাংলাদেশ আবাসিক প্রতিনিধিঃ

 

সর্ব প্রথমেই বিমান দূর্ঘটনায় বাংলাদেশসহ শোকসন্তপ্ত পরিবারদের জানাই আন্তরিক সমবেদনা জানাচ্ছি।প্রথমেই বলে রাখি লেখাটি নেহায়েতই অ্যাকাডেমিক। ৩৪ বছর পর বাংলার ইতিহাসে ফের ঘটে গেল প্রাণ সংহারকারী বিমান দুর্ঘটনা। ইউ,এস,বাংলা এয়ারলাইন্সের বি,এস,বিমানটি নেপালের কাঠমুন্ডুতে ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে ল্যান্ড করতে যায় এবং ক্রাশ করে। এতে এখন পর্যন্ত নিহতের তালিকায় আছেন ৫১ জন, যাদের মধ্যে ২৬ জনই বাংলাদেশি। মর্মান্তিক এই ঘটনায় গতকাল বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় শোক পালন করা হয়।নেপালি কর্তৃপক্ষ বলছে, ফ্লাইট ২১১কে রানওয়ের দক্ষিণ দিক থেকে অবতরণ করতে বলা হলেও পাইলট উত্তর দিক থেকে অবতরণ করে।তবে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স নেপালি কর্তৃপক্ষের দাবী অস্বীকার করে বলেছে, কন্ট্রোল টাওয়ার থেকে পাইলটকে ভুল নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল।চলুন,এবার আসল কথায় আসি।এ ধরনের ঘটনার পেছনে শত সহস্র কারণ থাকতে পারে যা দীর্ঘ তদন্ত শেষে প্রকাশ করা হয় অথবা অধিকাংশ সময়ে অপ্রকাশিতই থেকে যায়।

wind shiar/ channel-6

গত সোমবারের বিমান দূর্ঘটনার ঘটনায় আসলে কী হয়েছিল তা এই মুহুর্তে আলোচনা করা অনুচিত। কারণ, এতে পাঠকরা (সাধারণ মানুষ) দিকভ্রান্ত হতে পারে অথবা এমন কিছু বলা উচিত না যাতে প্রয়াত ব্যক্তিবর্গের প্রতি অসন্মান প্রদর্শিত হয়।তবে একজন উড্ডয়নপ্রেমী হিসেবে তথ্যানুসন্ধান করা যেতে পারে যাতে নবীনরা শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে অথবা সংশ্লিষ্ঠ পক্ষ আগামী দিনগুলোর জন্য সচেতন হতে পারে। নিচের লেখাটি নেহায়েতই অ্যাকাডেমিক যা নিজ জ্ঞান, ইন্টারনেটে প্রাপ্ত তথ্য ও কয়েকজন অভিজ্ঞ পাইলটের বক্তব্যের কথাবার্তার সূত্রে গ্রন্থিত। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সঠিক তথ্যের ঘাটতি, অনুমাননির্ভর বক্তব্য-বয়ান, অপেশাদারিত্ব- এসব কারণে ভয়াবহ কোনো দুর্ঘটনার পর বাড়তে থাকে অহেতুক অষ্পষ্টতা, ডালপালা বিস্তার করে গুজব। একজন সংশ্লিষ্ট পেশাজীবী হিসেবে চাইছি যতদূর সম্ভব অস্পষ্টতা দূর হোক, দুর্ঘটনা রোধে আরো সচেতন হই আমরা। এখন আসুন দেখে নেই দুর্ঘটনার পরপর ঘটা কিছু বিষয় এবং এর আগের-পরের সংশ্লিষ্ট কিছু বিষয়-

১। প্লেনের চালক ও এয়ারপোর্টের কন্ট্রোল টাওয়ারের কথাবার্তার অডিও (পাইলট-কন্ট্রোল টাওয়ার কনভারসেশন) ইউটিউবে পাওয়া যায় প্রায় সাথে সাথে। এটা খুব আশ্চর্যের। কারণ, এটা মানুষকে বিভ্রান্ত করবে। এসব ক্ষেত্রে শুধুমাত্র এক্সপার্টরাই পারবেন পারিপার্শ্বিক অবস্থার সাথে মিলিয়ে এই বিষয়ে কোনো কনক্লুশনে আসতে। এটা নেপাল কন্ট্রোল টাওয়ারের অপেশাদার আচরণ।

২। ত্রিভূবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একটাই মাত্র রানওয়ে  এবং রানওয়ে ২০ বা ০২ আসলে একই রানওয়ে (দক্ষিণমুখী হয়ে নামলে ২০ এবং উত্তরমুখী হয়ে নামলে ০২)। উচ্চারণে ভুল হলেও পাইলট বুঝে নেয় টাওয়ার আসলে কী বোঝাচ্ছে।

কারণ, একজন পাইলট প্রায় ৫ মাইল দূর থেকেই রানওয়ে টার্গেট করে এবং ধীরে ধীরে নেমে আসে। সুতরাং কোনো উড়োজাহাজ রানওয়ে ০২ তে অ্যাপ্রোচ করলে চাইলেও রানওয়ে ২০ তে এলাইন করতে পারবে না। তাই রানওয়ে নিয়ে কনফিউশনের যে কথা বলা হচ্ছে তা আসলে অসম্ভব একটি প্রস্তাবনা।

Google earth/ channel-6

৩। টাওয়ারের কন্ট্রোলারের ইংরেজিতে পারদর্শী হবার কথা। কিন্তু তার শেষ উক্তি খুবই কনফিউজিং যখন তিনি বলেন” KTH-Tower: „BanglaStar211, turn right and ah..you have the runway, confirm you have the runway not in sight, yet?” এটার উত্তর কী হবে তা কন্ট্রোলারই জানেন। তাছাড়া পুরো কনভারসেশন শুনে মনে হয়েছে তারা অমন গুরুতর সময়ে নিজেদের ভাষায় কথা বলে যা বিপদজনক।

 

 

৪। ত্রিভূবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হরদম টুরিস্টদের ভীড় লেগে থাকে। এক অর্থে ভ্রমণপ্রিয় বিশাল সংখ্যাক মানুষজনের কাছে খুবই পরিচিত এক এয়ারপোর্ট। অপরদিকে, ৪২০০ ফিট উপরে এবং আশপাশে সুউচ্চ পর্বতমালা থাকার কারণে এটা পৃথিবীর অন্যতম বিপদজনক বিমানবন্দরও। এখানে বছরে প্রায় সবসময় খারাপ আবহাওয়া, ঝড়-বৃষ্টি বা কুয়াশার চাদরে ঢাকা থাকে। অথচ এর ল্যান্ডিং সিস্টেম বোধ করি মান্ধাতার আমলের। এটি একটি ক্যাটাগরি সি এয়ারপোর্ট, সেখানে ল্যান্ড করতে যাওয়ার জন্য বৈমানিকদের বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। অর্থাৎ সব বৈমানিকই সেখানে অবতরণের জন্য যোগ্য বিবেচিত হন না।

যাহোক, একটা প্লেন রানওয়ে ২০ না ০২ তা রাডারে যেমন দেখা সম্ভব তেমনি পাইলটও (ইন্সট্রুমেন্ট ল্যান্ডিং সিস্টেম আধুনিক থাকলে) রানওয়ের ৮০০ মিটারের মধ্যে অটোপাইলটের দ্বারা সহজেই ঠিকমতো আসতে পারেন। আশ্চর্যের ব্যাপার হল, এখানে কোনো ইন্সট্রুমেন্ট ল্যান্ডিং সিস্টেম নেই এবং পাইলটকে অন্ধের মতো নামতে হয়।

৫। পাইলট হিসাবে ক্যাপ্টেন আবিদ একজন দক্ষ উড্ডয়নবিদ হিসেবে পরিচিত। পেশাগত জীবনে তিনি একজন ফ্লিট চিফ ছিলেন। উনি এই বিমানে ১৭০০ ঘণ্টা উড়েছেন এবং একই বিমানবন্দরে প্রায় শতাধিক ল্যান্ডিং করেছেন। তার যোগ্যতা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কো-পাইলট সম্পর্কে তেমন ধারণা নাই তবে আরিরাং ফ্লাইং স্কুল থেকে পাশ হওয়ে বলে তার যোগ্যতা উঁচু বলে ধরে নেয়া যায়।

৬। ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্স দেখতে চলতে ভালো হলেও মালিকদের অপেশাদার আচরণ বিষয়ে খোঁজ নেওয়া যায়। এটা নিছক অনুমানভিত্তিক কথা নয়। অনেক বেসরকারি বিমান সংস্থায়ই গুটিকয়েক পাইলট দিয়ে পুরো বিমানবহর চালানো হয়। ক্রু ফেটিগ (কর্মীদের দীর্ঘক্ষণ কর্মজনিত ক্লান্তি বা অবসাদ) বিশেষত কিউমুলেটিভ ফেটিগ খুবই বিপদজনক।

আমার জানা মতে, বাংলাদেশের সব প্রাইভেট এয়ারলাইন্সই এ ধরনের সমস্যায় ভুগছে। ইউএস বাংলার সিইও আসিফ ইকবাল একজন তরুণ ও অসাধারণ মেধাবী, কাজের মানুষ হিসেবে পরিচিত। তবে প্রতিকূল পরিবেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে কতটুকু পেশাদারিত্ব তিনি আনতে পেরেছেন তাও দেখার বিষয়। মালিক পক্ষ হয়তো নির্দোষ তবে সেই নির্দোষিতা প্রমাণের মাধ্যমেই আসতে হবে এবং তা প্রমাণের জন্য কোনো ধরনের বাঁকা পথে না যাওয়াটা নিশ্চিত করতে হবে।

৭। শেষ পর্যন্ত পাইলটের ভয়েস শুনে মনে হয়েছিল তিনি শান্ত ছিলেন এবং কনফিডেন্ট ছিলেন এবং ইঞ্জিনের কোনো ধরনের ফল্ট অনুভব করেননি বা ডিস্ট্রেস সিগন্যাল দেননি। তিনি অবতরণ নিয়ে কনফিডেন্ট ছিলেন; তাতে মনে হয় ইঞ্জিন বা এয়ারক্রাফট ত্রুটি ছিল না। তিনি যদি ডিসট্রেস সিগন্যাল দিতেন সেক্ষেত্রে পরিস্থিতি অন্যরকম হতে পারতো।

৮। আমার দৃষ্টিতে দুর্ঘটনার মূল কারণ হতে পারে আবহাওয়া। অবতরণের একটু আগে সেখানে প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টি হয় যা নেপালে খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। আসুন, প্রাসঙ্গিক বিধায় এখানে আবহাওয়ার দুটি অজানা দিক নিয়ে আলোচনা করি। এদের একটি হলো উইন্ড শিয়ার (Wind Shear) এবং আরেকটি হচ্ছে মাইক্রোবার্স্ট (Microburst)। এগুলো সাধারণত, পাহাড়ি এলাকায় দেখা যায়  এবং কোনো আলোচিত মেঘ-ঘূর্ণিঝড়, খারাপ আবহাওয়া বা কোনো সংকেত ছাড়াই বিমানের টেক অফ বা ল্যান্ডিংকে ভয়ংকরভাবে প্রভাবিত করে এই ইস্যুগুলো।

উইন্ড শিয়ার-এর সময় বাতাস কখনো সামনে থেকে আবার পর মুহুর্তে পেছন থেকে আসে এবং তা আসে ভীষণ গতিতে। এতে উড়ন্ত প্লেনকে কন্ট্রোলে রাখা খুব দুষ্কর। কারণ, এটা কখনো উড়োজাহাজকে ঠেলে নিচে নামায় আবার পর মুহূর্তে উঠিয়ে নেয় ওপরে।

আর, মাইক্রোবাস্ট হল টর্নেডো’র বিপরীত। কোনো ওয়ার্নিং ছাড়াই তীব্র গতিতে নিচে নেমে আসে। ফলে ল্যান্ডিংয়ের সময় এটা ঘটলে উড়োজাহাজের অবতরণ স্পিড নিমেষে বেড়ে যায়। তবে অধিকাংশ পাইলটই অভিজ্ঞতার দ্বারা এসব নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন।

প্রিয় পাঠক, এইসব বিষয় নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে এমনকি মূলধারার মিডিয়ায়ও আলোচনা-পর্যালোচনা অনেক সময়েই গতি হারায়। এর সহজ কারণ, যেহেতু বিষয়গুলো খুবই টেকনিক্যাল এবং সাধারণ মানুষের পক্ষে সঙ্গত কারণেই তাৎক্ষণিকভাবে এসব বিষয় জানা, বোঝা সহজতর নয়- তাই ধারণাপ্রসূত বাতচিত বাড়তেই থাকে। মানুষের মাঝে ছড়াতে থাকে বিভ্রান্তি। এমনতর বিভ্রান্তি দূর করার মানসেই এই সেচতনতামূলক লেখা। আশা করছি বিষয়টি আপনারা বুঝতে পারছেন। আরো আশা করছি সঠিক কারণগুলো খুঁজে পেতে এবং সে মোতাবেক ব্যবস্থা নিতে সমর্থ হবেন সংশ্লিষ্টরা। ধন্যবাদ।