মহিলার দুধে কোন ভেজাল ছিলনা আর আমি বলেছিলাম দুধ খারাপ-২

প্রকাশিত

তুহিন সারোয়ারঃ-
বাজারে আম জাম, কলা থেকে শুরু করে সব ধরনের ফলমূলে কেমিক্যাল মিশিয়ে আমাদের ফল খাওয়াটা হারাম করে দিয়েছে।এছাড়া কাচা বাজারে শিম, টমেটো, বেগুন, ফুলকপিসহ সব ধরনের সব্জি এখন বিষযুক্ত। মাছের বাজারেও একই কাহিনী। সব মাছ মমি করে শত বছর বাঁচিয়ে রাখার নিরন্তন প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। ইলিশ মাছের দাম গগনচুম্বী তাই বলে কি বাজারে ইলিশ মাছ পচে গোবর হয়? পহেলা বৈশাখেতো ক্রেতার লাইন লেগে যায়।ভেজাল নিয়ে আমরা এই দেশের আমজনতা বড়ই ভেজালে আছি। চালে ভেজাল, তেলে ভেজাল, ডালে ভেজাল, ঘিয়ে ভেজাল, চিনিতে ভেজাল, গুড়ে ভেজাল, পানীয়-জুস, হলুদ-মরিচ, মুড়ি-চিড়া, বিভিন্ন রকম মিষ্টান্ন থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রয়োজনীয় সকল দ্রব্যাদিতেই ভেজাল তার ভয়াল থাবা বিস্তার করেছে।
আজকাল বাজারে ফলমূলের দোকানে গেলে মৌমাছি আর চোখে পড়ে না, মাছের বাজারে নেই মাছের গন্ধ আর মাছির আনাগোনা। এর কারণ কি? উত্তর একটাই, তা হলো মাছে ফরমালিন মেশানোর ফলে বাজারে মাছের আঁশটে-পচা দুর্গন্ধ আর থাকে না। একইভাবে কোনো ফলমূলের দোকানেও মৌমাছির আনাগোনা নাই বললেই চলে, কারণ কারবাইড মেশানোর কারণে মৌমাছি আর মধু আহরণ করতে ওই ফলে যায় না। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এগুলো বেশি দিন তাজা রাখার উদ্দেশে ফরমালিন, কারবাইড ইত্যাদি ব্যবহার করে থাকে। অতিরিক্ত মুনাফার লোভে কিংবা অতি অল্প কালের মধ্যেই অর্থ-বিত্তের মালিক হওয়ার নেশায় বুদ হয়ে থাকা এসব অসাধু ব্যবসায়ী তাদের এই অপকর্মের মাধ্যমে দেশের যে সর্বনাশ সাধন করছে তা ভবলেও গা শিউরে উঠে। অপ্রিয় হলেও সত্য যে, আমাদের দেশের অসাধু ব্যবসায়ীরা অধিক মুনাফার আশায় দুধ, ফল, মাছ-মাংসে এমনকি শাকসবজিতেও ফরমালিন, হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড,কার্বাইডসহ বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করে থাকে। শাকসবজি কোনটা খাওয়া নিরাপদ, কোনটা নয়- সেটা বোঝার কোনো উপায় নেই। ফলমূলে যেমন বিষাক্ত কেমিক্যাল, মাছে দুধে ফরমালিন, সবজিতে কীটনাশক-এর সাথে অন্যান্য খাদ্যদ্রব্য যেমন জিলাপি চানাচুরে মবিল মেশানো হয়। আরো শোনা যায় বিস্কুট, আইসক্রিম, কোল্ড ড্রিংকস, জুস, সেমাই, আচার, নুডুলস, এমন কি মিষ্টিতে টেক্সটাইল ও লেদার রং, পানিতে ক্যাডমিয়াম, লেড, ইকোলাই, লবণে সাদাবালু, চায়ে করাতকলের গুঁড়া, গুঁড়া মসলায় ভূষি কাঠ বালু ইটের গুঁড়া ও বিষাক্ত গুঁড়া রং। বাজারজাত ফলের জুসে নাকি ফলের রসের ছিটে ফোটাও নেই । কনডেন্স মিল্কে নেই দুধের লেশ। বেকারি খাদ্য নিম্নমান, মেয়াদহীন আটা ময়দা,পচা ডিম,ডালডা আর নোংরা পরিবেশে তৈরি। ঘি,সরষের তেলে নেই মৌলিক উপাদানের চিহ্ন। সেমাইয়ের আছে সাবান তৈরির উপকরন। বাজারের সব দুধ নাকি দুধ নয়। এক দুধওয়ালা আমার বাসায় এসে নিয়মিত দুধ দিয়ে যেত। দুধ ফুটালে দেড় লিটার দুধে দেড়/দুই গ্লাস দুধ কমে যায়। আর সরের দেখাতো মেলেই না । তাকে দুধ দিতে না করে অন্য এক মহিলাকে বললাম দুধ দিয়ে যেতে, ভাবলাব মহিলা মানুষ,তার দুধে ভেজাল হবেনা!
কিন্তুু সেই মহিলার দুধের একই অবস্থা! দুধে না ছিল দুধের স্বাদ। খেলে মনে হতো দুধের হাড়ি ধোঁয়া পানি খাচ্ছি। তাকে বলেছিলাম, আপা আমি ভেবেছিলাম হয়তো আপনার দুধে কোন ভেজাল নেই, মহিলা মানুষ,দুধে ভেজাল দেন কেন? অভিযোগ করতেই তার জবাব,সারা এলাকার বড় বড় লোক দৈনিক আমার দুধ খায় কেউ কিছু বলে না, আর আপনি বলেন আমার দুধ খারাপ? হলো তো এবার,অভিযোগের জবাবে মোক্ষম অভিযোগ! প্যাকেটজাত তরল দুধের দাম তো ৮০/৯০ টাকার উপরে নেন যা চলতি দুধের মুল্যের দিগুণ, তারপরও দুধে ভেজাল।সেদিন পোলাও এর চাল কিনে এনে দেখি,এগুলোতে ভাতের চালের ধান, রান্না করলাম, ইয়া বড় বড় ভাত হয়ে গিয়েছে!
রোগ মুক্তির জন্য যে ঔষধ খাবো সেটাও আজ প্রশ্নের সম্মুখীন। সেদিন বউ বললোঃ সর্দির/ঠান্ডার ঔষধ আনতে, ডাক্তার এক সিরাপ দিয়ে বললেন ২ চামচ করে দৈনিক তিন বেলা করে খাওয়াবেন!
রাতে বাসায় এসে বউকে ঔষধটি খাবার নিয়ম বুঝিয়ে দিয়ে আমার রুমে কাজে বসে গেলাম,ঘন্টখানেক পরে বউকে ডাকলাম,ওগো আমাকে এক গ্লাস পানি দাও। ১০ মিনিট ডাকাডাকি করার পরেও কোন সাড়াশব্দ না পেয়ে মেজাজ গরম করে বেড রুমে গিয়ে দেখি খাটের উপর বউ নাই! কিরে এত রাতে আমার বউ গেল কই? অনেক খোঁজাখুজি করে খাটের ওপার অংশের নিচে পড়ে নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে! ভয় পেয়ে গেলাম,অনেক কষ্টে তাকে খাটের ওপর তুলে ঠিকমতন শোয়ালাম। সকালে বউ আমারে জিগায়, আচ্ছা আমারে কি ভালো লাগেনা? না লাগলে কও আমি বাপের বাড়ী যামুগা,তুমি গত রাইতে আমারে মাইরা ফালানোর লাইগ্যা কি ঔষধ আনছিলা? আমারে কি মাইরা ফেলানোর পেলান করতাছো। গেন্দার বাপ ভাল হইবনা কইয়া দিলাম।তারে অনেক কষ্টে বুঝালাম যে ঠান্ডা জাতীয় ঔষধগুলো খেলে একটু ঘুম হয় ,একটু নেশা নেশা লাগে।
ভেজাল আর নকল ঔষধে ছেয়ে গেছে ঔষধ বাজার। এখন আর কাউকে বিষ খেয়ে মরতে হবে না, বাহ, মৃত্যু এখন বেশ সহজলভ্য! উদাহরণ দেয়া শুরু করলে দিন রাত কুলাবে না ।ভেজাল নিয়ে আমাদের অবস্থা এমন যে, খাদ্যদ্রব্য থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন জিনিস কিনতে গিয়ে কোনটা ভেজাল আর কোনটা ভেজালমুক্ত সেটা নির্ণয় করতে গিয়ে আমরাই ভেজালে পড়ে যাই। ক্রমাগত ভেজাল আর রাসায়নিক পদার্থ দেওয়া খাদ্য গ্রহণ করার কারণে গণস্বাস্থ্য বড় ধরনের হুমকির মুখে। আর্ন্তজাতিক গবেষণা সংস্থার তথ্যমতে, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৪৫ লাখ মানুষ খাদ্য বিষক্রিয়ায় বিভিন্ন জটিল রোগে আকান্ত হয়। আর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জরিপ বলছে, পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রতি ১৯ শিশুর একজন মারা যায় খাদ্যে উচ্চমাত্রার ভেজালের কারণে। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি ভেজাল শিশুখাদ্যে।ভেজালের এই গ্যাঁড়াকল থেকে আমরা কবে মুক্তি পাব, আদৌ কোনোদিন মুক্তি পাব কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর আমরা কেউই জানি না।
মানুষের বেঁচে থাকার মূল ভিত্তি খাদ্য/ ঔষধ, তাতে বিষ মেশানোয় যদি জনসাধারণের ও কর্তৃপক্ষের টনক না নড়ে, তাহলে বলতে হবে আমাদের ভবিষ্যৎ ঝরঝরে। জনগণের সম্পৃক্ততা, সচেতনতা এবং সরকারি উদ্যোগের দৃঢ়তার মাধ্যমেই এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সম্ভব। এটা নিয়ে কেউ যেন ছিনিমিনি খেলতে না পারে সেটা নিশ্চিত করতে হবে যেকোনো মূল্যে। এত লোভনীয় বিজ্ঞাপন দিয়ে কি লাভ? আপনার বিবেক জাগ্রত করুন। মনে রাখবেন আমরা বেশী টাকায় মুল্য দিতে রাজি আছি কিন্তু জীবন দিয়ে নয় ।