নতৃত্ব সংকটে গাজীপুর বিএনপি

প্রকাশিত

মৃণাল চৌধুরী সৈকত :
হান্নান-মান্নান-হাসানের পর নেতৃত্ব সংকটের শিকার হচ্ছে গাজীপুর বিএনপি। একবার কোন কমিটি হলে বছরের পর বছর চলে যায় আর নতুন নেতৃত্ব তৈরি হয় না। ঘুরে ফিরে পুরনোরাই থাকেন কমিটিতে। তদুপরি একই নেতা ইউনিয়ন ও উপজেলা থেকে শুরু করে জেলা পর্যন্ত একাধিক পদ দখল করে থাকেন।
তবে দীর্ঘ দিন ধরে চলে আসা মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির কারণে ঝিমিয়ে পড়া গাজীপুর জেলা বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনগুলোতে এবার নতুন কমিটি গঠনের প্রক্রিয়ায় নেতাকর্মীদের মধ্যে আবার প্রাণ চাঞ্চল্য ফিরে আসছে। ইতিমধ্যে জেলা ও মহানগর যুবদলের আংশিক কমিটি গঠন করা হয়েছে। এর আগে জেলা ও মহানগর মহিলাদলের কমিটি গঠন করা হয়। অচিরেই মূল সংগঠন বিএনপি ছাড়াও ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলসহ অন্যান্য অঙ্গ-সংগঠনের কমিটি গঠন করা হবে বলে দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে।
বিএনপির একাধিক সূত্রে জানা গেছে, গাজীপুর জেলা ছাত্রদলের বিদ্যমান সরাফত-হান্নু কমিটি কয়েক প্রজন্ম অতিক্রম করেছে। ফলে দলটি বিগত প্রায় দুই দশক ধরে জেলায় ছাত্র নেতৃত্ব তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে। বর্তমানে জেলা ও মহানগরিতে ছাত্রদলের কমিটি করার জন্য অবিবাহিত ও ছাত্রত্ব আছে এমন নেতা পাচ্ছে না দলটি। একইভাবে প্রায় ১৬ বছর ধরে জেলা যুবদলের বিদ্যমান কমিটি নতুন কোন নেতৃত্ব তৈরি করতে পারেনি। অন্য অঙ্গ সংগঠনগুলোর বিদ্যমান কমিটির অধিকাংশ সদস্যের মনে নেই তাদের কমিটি বিগত কত সালে গঠন করা হয়েছিল। জেলা বিএনপির বর্তমান কমিটিও প্রায় ৮ বছর অতিক্রম করেছে। গাজীপুর সিটি করপোরেশন গঠনের পর দুটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও বিএনপি এখন পর্যন্ত মহানগর কমিটিই গঠন করতে পারেনি। সবেমাত্র তারা মহিলা দল ও যুব দলের আংশিক কমিটি দিতে পেরেছে মহানগরে।
বিপরিত দিকে আওয়ামীলীগ ও তাদের অঙ্গ সংগঠনগুলো জেলা ও মহানগরীতে নিয়মিত কমিটি দিয়ে সাংগঠনিক ভাবে চাঙ্গা রয়েছে।
বিগ্রেডিয়ার অব. আ.স.ম হান্নান শাহ’র মৃত্যুর পর জেলা বিএনপি প্রায় অভিভাবকহীন হয়ে পড়ছে। মেয়র এম.এ মান্নান ও হাসান উদ্দিন সরকার আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত হয়তো যেতে পারেন। এরপর জেলা বিএনপিতে নেতৃত্ব সংকট তৈরি হচ্ছে। এই সংকট মোকাবেলায় বিএনপি এখনো কাঙ্খিত নতুন নেতৃত্ব তৈরি করতে পারেনি।
এদিকে সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে জেলা ও মহানগর বিএনপিতে যখন নতুন নেতৃত্ব তৈরি হচ্ছে না, তখন আওয়ামীলীগ মাত্র গত এক যুগের ব্যবধানে কয়েক ডজন নতুন নেতৃত্ব তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। যেখানে আগামী ৫ বছরের মধ্যেই বিএনপিতে নেতৃত্ব সংকট প্রকট হচ্ছে, সেখানে আগামী ১০০ বছরেও আওয়ামীলীগে নেতৃত্ব সংকটের সম্ভাবনা নেই। আওয়ামীলীগের যুব ও ছাত্র সংগঠনে ইতিমধ্যে গ্রহণযোগ্য বেশ কয়েকজন নতুন নেতৃত্ব তৈরি হয়েছে। সরাসরি ছাত্রলীগ থেকে আসা জাহাঙ্গীর আলম ২০১৩ সালের সিটি নির্বাচনে মেয়র পদের শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ছিলেন। তিনি এবার সিটি করপোরেশনের মেয়রের চেয়ারটি দখল করতে সক্ষম হয়েছেন। অপরদিকে জেলা ও মহানগর যুবলীগের একাধিক যোগ্য নেতা তৈরি হয়েছেন। যারা সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় সরকারের যে কোন পর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব করতে সক্ষম। অথচ সদ্য অনুষ্ঠিত সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামীলীগের বিপক্ষে একমাত্র হাসান উদ্দিন সরকার ছাড়া অন্য কোন যোগ্য ও শক্তিশালী মেয়রপ্রার্থী ছিল না বিএনপির। বিপরীত দিকে আওয়াীলীগের যোগ্যপ্রার্থীর ছিল ছড়াছড়ি। তাদের মধ্যে মূল দল আওয়ামীলীগেই ছিল চার জন ও যুবলীগে ছিল দুই জন মেয়র পদ প্রার্থী। অপেক্ষমান ছিল আরো কয়েকজন। গাজীপুর মহানগর যুবদলের পর এবার স্বেচ্ছাসেবক দলের কমিটি নিয়ে জটিলতা।
এদিকে গাজীপুরে প্রায় ১৬ বছর পরে যুবদলের নতুন দুটি কমিটি জেলা ও মহানগর নিয়ে অপ্রীতিকর ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে অন্যান্য কমিটি গঠনের ব্যাপারে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে দলের হাইকমান্ড। এবার কমিটি গঠনে একই অঞ্চলের নেতাদের আধিক্য যাতে না থাকে এবং বিতর্কিতরা যাতে কমিটিতে স্থান না পান সে ব্যাপারে সজাগ দৃষ্টি রাখা হচ্ছে। যুবদলের পর এবার স্বেচ্ছাসেবক দলের কমিটি গঠন প্রক্রিয়া প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে জানা গেছে। তবে সদ্য ঘোষিত মহানগর যুবদল কমিটির মত জটিলতার কারণে সহসাই স্বেচ্ছাসেবক দলের কমিটি ঘোষণা হচ্ছে না বলে জানা গেছে। গাজীপুর মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি পদে সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী ও বিএনপি চেয়ারপার্সনের আইনজীবী প্যনেলের সদস্য গাজীপুর জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেড নজরুল ইসলাম খান বিকি ও কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সহ-ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক আরিফ হোসেন হাওলাদারের নাম শোনা যাচ্ছে। সাধারণ সম্পাদক পদে টঙ্গী থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক ও টঙ্গী অঞ্চল দলিল লেখক সমিতির সহ-সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম ভেন্ডার ও কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সদস্য হাসিবুল হাসান মুন্নার কথা শোনা যাচ্ছে।
সদ্য ঘোষিত মহানগর যুবদলের কমিটিতে টঙ্গী অঞ্চল থেকে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক করায় অন্যান্য অঞ্চলে বিরাজমান ক্ষোভ প্রশমনেরও উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। কমিটির অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে বাকি অঞ্চলের নেতাদের সমন্বয়ে পূরণ করা হচ্ছে। আগামীতে অন্যান্য কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে যাতে এধরণের বৈষম্য না হয় সে ব্যাপারের দলের হাইকমান্ড থেকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। স্বে^চ্ছাসেবক দলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী যথাক্রমে আরিফ হোসেন হাওলাদার ও জাহাঙ্গীর আলম ভেন্ডার টঙ্গীর বাসিন্দা হওয়ায় আঞ্চলিক বৈষম্য দূর করতে তাদের যে কোন একজন মহানগর কমিটি থেকে বাদ যাচ্ছেন। সে-ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক কেন্দ্রীয় সহ-ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক আরিফ হোসেন হাওলাদারকে কেন্দ্রীয় কমিটির একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পাদকীয় পদে ন্যাস্ত করে আঞ্চলিক বৈষম্য দূর করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে নাগরির পূবাইল অঞ্চলের অধিবাসী অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম খান বিকিকে সভাপতি ও টঙ্গীর অধিবাসী জাহাঙ্গীর আলম ভেন্ডারকেই সাধারণ সম্পাদক করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। দলটির নিভর্রযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, বিগত দিনে আন্দোলন সংগ্রামে সাহসি ভূমিকা রেখেছেন এবং একাধিক মামলা ও হামলার শিকার হয়েছেন, মিথ্যা মামলায় জেল খেটেছেন এমন নেতাদেরকেই কমিটিতে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে নজরুল ইসলাম খান বিকি, আরিফ হোসেন হাওলাদার ও জাহাঙ্গীর আলম ভেন্ডার বহু রাজনৈতিক মামলার আসামী হয়ে একাধিকবার জেল খেটেছেন।
গাজীপুর মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের কমিটির ব্যাপারে জানতে যোগাযোগ করা হলে দলটির কেন্দ্রীয় সভাপতিকে মোবাইলে পাওয়া যায়নি। কেন্দ্রীয় সিনিয়র সহ-সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান জানান, তারা শিগগির গাজীপুরে কমিটি দিতে যাচ্ছেন।