আত্মবিশ্বাসেই এমন অবিশ্বাস্য জয়

প্রকাশিত

ব্যাটিং-বোলিং-ফিল্ডিং-অধিনায়কত্ব এবং দলীয় সাফল্যের আনন্দ তখনো উপচে পড়ছে সাকিব আল হাসানের অভিব্যক্তিতে। আমেরিকায় বাংলাদেশ দলের প্রথমবার মাঠে নেমে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে পিছিয়ে পড়েও নিজেদের অনভ্যস্ত ফরম্যাটে সিরিজ জয়ের উচ্ছ্বাস আপাত নিরাসক্ত অধিনায়কের পক্ষে আড়াল করা অসম্ভব যে! তাই আম্পায়াররা ম্যাচের সমাপ্তি টানতেই মাঠে দৌড়ে গেছেন স্মারক স্টাম্প তুলতে, দীর্ঘ পুরস্কার বিতরণীর পরও সংবাদ সম্মেলনে এসেছেন বিপুল উৎসাহে। সেখানে উপস্থিত ছিলেন কালের কণ্ঠ’র প্রতিনিধি

প্রশ্ন : পুরনো একটি প্রসঙ্গ দিয়েই শুরু করতে চাচ্ছি। ওয়ানডের পর টি-টোয়েন্টিতেও এমন জয়ের পর কি টেস্ট সিরিজ নিয়ে আক্ষেপ হয়? ওই সিরিজটা তো আরো ভালো হওয়ারই কথা ছিল।

সাকিব : খুব একটা আক্ষেপ নেই। তবে আমি বিশ্বাস করি, এ সিরিজটা যে মানসিকতা নিয়ে খেলেছি, টেস্টেও একই মানসিকতা নিয়ে খেললে আরো অনেক ভালো রেজাল্ট হতো। টেস্ট সিরিজ শুরুর আগেও কিন্তু আমাদের ইতিবাচক মানসিকতাই ছিল। টেস্ট সিরিজ জয়ের সম্ভাবনা নিয়েই আমরা কথা বলেছিলাম। আর ওই সিরিজটা খারাপ হওয়ার কারণ আমরা রান করতে পারিনি। দুই টেস্টেই যদি দুই ইনিংস মিলিয়েও পাঁচ শ কিংবা ছয় শ রান করতে পারতাম, তাহলে একটি টেস্ট হলেও জিততাম। তাতে সিরিজ ড্র হতো, যেটা অনেক ভালো রেজাল্টই হতো। তবে একটি সফরের তিনটির মধ্যে দুটি ট্রফি নিয়ে দেশে কখনো ফিরেছি বলে মনে হয় না। বিশেষ করে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন কোনো দলের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচ হারের পরও সিরিজ জেতার মধ্য দিয়ে দলের প্রত্যেকে যে মানসিকতা দেখিয়েছে, তা অবিশ্বাস্য।

প্রশ্ন : টেস্টে বিপর্যস্ত একটি দল কোন শক্তিতে এভাবে ঘুরে দাঁড়াল? খারাপ শুরুর পর তো বাংলাদেশকে বরাবর দেখা গেছে সিরিজের বাকি অংশে আরো মার খেতে।

সাকিব আল হাসান : মন-মানসিকতা। আমাদের বিশ্বাস। প্রথম টি-টোয়েন্টি হারার পরে আমরা সেন্ট কিটসে বসেই একটা মিটিং করেছি। সেখানে আমরা সবাই একটা ব্যাপারে একমত হয়েছিলাম যে আমরা ওদের চেয়ে টি-টোয়েন্টিতে ভালো দল। প্রথম ম্যাচের আগে এতটা আত্মবিশ্বাস ছিল না মনে। তবে ওই ম্যাচ হারলেও আমরা বুঝে গিয়েছিলাম যে ওয়েস্ট ইন্ডিজের এই দলটার চেয়ে আমরা ভালো। ওদের হারানো খুবই সম্ভব। সেই আত্মবিশ্বাসটা এখানে এসে কাজে লেগেছে। উইকেটটাও আমাদের কিছুটা সাহায্য করেছে। দর্শক সমর্থনও ভূমিকা রেখেছে। পুরোটা সময় তাদের সমর্থন আমাদের উৎসাহ জুগিয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি যেটা মনে হয়েছে, সবাই মন থেকে চাচ্ছিল যে আমরা যেন জিতি।

প্রশ্ন : দ্বিপক্ষীয় সিরিজে এমন উদ্‌যাপন আপনাদের করতে দেখা যায় না সাধারণত। এবারের আনন্দটা কি ক্রিকেটের নতুন ভুবনে সাফল্যের কারণেই?

সাকিব : দেখেন, আমেরিকায় আমরা কবে আবার খেলতে আসব আমরা কেউ জানি না। এই দর্শকরাও কবে আবার এখানে খেলা দেখবেন, সেটাও অজানা। এই দর্শকদের বড় অংশই এসেছেন দূরের সব শহর থেকে। গতকাল (দ্বিতীয় টি-টোয়েন্টি) জেতায় তাঁদের অনেকেই থেকে গেছেন শেষ ম্যাচ দেখার জন্য। সে জন্যই জেতার পর তাঁদের ধন্যবাদ জানানো আমাদের দায়িত্ব ছিল।

আরো পড়ুন :  কমলগঞ্জে কৃতি শিক্ষার্থী সংবর্ধনা

প্রশ্ন : সব ফরম্যাটের ক্রিকেটই কি আপনি উপভোগ করছেন? প্রশ্ন আছে কিন্তু এটা নিয়ে।

সাকিব : তিন ফরম্যাটই উপভোগ করছি। উপভোগ না করার তো কোনো কারণ দেখি না। তিন ফরম্যাটেই ভিন্ন ভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ থাকে। এই মুহূর্তে তিনটি ফরম্যাটই আমি উপভোগ করছি। আর আমার মনে হয় প্রত্যেক খেলোয়াড়ই আগের চেয়ে এখন অনেক বেশি ক্ষুধার্ত, পেশাদার। তাদের চিন্তাধারাও আগের চেয়ে বেটার। তাতে আমাদের পারফরম্যান্সের গ্রাফটা ওপরের দিকে যাবে বলেই আমার বিশ্বাস। আর টেস্টে আমরা ঘরের মাঠে ভালো করছি। শুধু দেশের বাইরে কিছুটা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছি। এই সমস্যা বাংলাদেশের একার না। বিদেশে সব দেশই স্ট্রাগল করে। ইংল্যান্ডে ভারত কিংবা দক্ষিণ আফ্রিকার অবস্থা দেখেন শ্রীলঙ্কায়, ওদেরও অবস্থা ভালো না। তবে এবারের টি-টোয়েন্টিতে যে ফল হয়েছে, সেটা আমাদের জন্য একটা মাইলফলক হয়ে থাকার মতো ব্যাপার। এর আগে আমরা আয়ারল্যান্ড ছাড়া আর কোনো দলের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজ জিতিনি। সেখানে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে সিরিজ জয় আমাদের দারুণ আত্মবিশ্বাস দেবে। তাতে এখান থেকেই বড় একটা শুরু হতে পারে আমাদের, এই ফরম্যাটে।

প্রশ্ন : সাধারণত সফরের শেষ দিকে ক্লান্ত দেখায় বাংলাদেশ দলকে। সেখানে এবার সময় যত পেরিয়েছে, ততই চাঙ্গা মনে হয়েছে বাংলাদেশকে। এনার্জি লেভেলের এমন উত্থান কিভাবে সম্ভব হলো?

সাকিব : আমার এনার্জি লেভেল বেশি ছিল বলেই হয়তো (হাসি)! আসলে আমার মনে হয় এর অন্যতম কারণ দলে বেশ কয়েকজন তরুণ খেলোয়াড় এসেছে। আর বেশির ভাগ খেলোয়াড়েরই নৈপুণ্য দেখানোর তাড়না ছিল। এটাই সবচেয়ে বড় কারণ বলে মনে হয়। সবাই ফোকাসড থেকেছি। সাধারণত যেটা হয়, সিরিজের শেষ এক-দুটি ম্যাচে ঢিল দিত। কিংবা দেখা যেত টেস্ট ওয়ানডের প্রথমটায় ভালো করা খেলোয়াড়রা পরেরটায় একটু রিল্যাক্স করছে। এবার সেটা হয়নি। তরুণটা দলে ঢোকায় রিল্যাক্স করার সুযোগও নেই। পুরো দলকে চাঙ্গা মনে হওয়ার এটাই প্রধান কারণ।

প্রশ্ন : একাদশে যাঁরা থাকেন না, সাধারণত তাঁদের কাছ থেকে খুব বেশি কিছু মেলে না। তবে সেই ওয়ানডে সিরিজ থেকেই দেখা যাচ্ছে টুয়েলফথ ম্যানও জানবাজি রাখছেন…

সাকিব : এটাই দলের ক্যারেক্টার শো করে। সবাই-ই দলের জন্য চিন্তা করা শুরু করেছে। এর অনেকটা কৃতিত্বই আমাদের নতুন কোচকে দিতে হবে। তিনি যেভাবে দলের সবাইকে একসঙ্গে নিয়ে কাজ করছেন, তাতে সবার মধ্যেই দলের জন্য কিছু একটা করার তাগিদ এসেছে। সেটা যে একাদশে নেই তার মধ্যেও দেখা যাচ্ছে।

আরো পড়ুন :  মাসের শেষে আরেকটি শৈত্যপ্রবাহ

প্রশ্ন : টি-টোয়েন্টিতে এখনো সেই পুরনো ঘাটতিটা রয়ে গেছে, বিশেষ করে পাওয়ার হিটিংয়ের। আপনার কি মনে হয় বাংলাদেশের পক্ষে ওয়েস্ট ইন্ডিজ কিংবা অস্ট্রেলিয়া ব্র্যান্ডের টি-টোয়েন্টি খেলা?

সাকিব : আসলে আমাদের তো সেরকম পাওয়ার হিটার নাই। আমাদের রাসেল কিংবা ডেভিড ওয়ার্নার নাই। তবে আমাদের যেটা আছে সেটা আমাদের মাথা। এটা কাজে লাগাতে পারলে আমরা অনেক দলের শক্তি কিংবা জোরের চেয়েও বেশি কার্যকর হতে পারি। মাথা ঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারি না বলেই আমরা ব্যর্থ হই। পুরো টি-টোয়েন্টি সিরিজে সবাইকে একটা কথাই বলেছি যে, ভাই, ওদের অনেক শক্তি আছে কিন্তু আমাদের মাথা আছে। এটা দিয়েই ওদের হারানো সম্ভব। যার যেটা শক্তির দিক, সে সেটা কাজে লাগিয়েই কিন্তু জেতে। এখন আমরা আমাদের সামর্থ্যের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিয়মিত করতে পারলেই ভালো দল হিসেবে গড়ে উঠব।

প্রশ্ন : দলের জুনিয়রদের নৈপুণ্য নিয়ে অনেক কথাবার্তা হয়। টি-টোয়েন্টি সিরিজে খুব বড় না হলেও প্রতি ম্যাচেই টুকটাক পারফরম্যান্স আছে তাঁদের। আপনার কি মনে হয় এ থেকে অনুপ্রাণিত হওয়ার উপাদান তাঁদের জন্য রয়েছে?

সাকিব : আমাদের চেষ্টা ছিল ওদের যতটুকু সম্ভব সুযোগ দেওয়া। আর নেতিবাচক চিন্তা যেন ওদের মাথায় না ঢোকে, সেটা নিশ্চিত করা। আমাদের কোচিং স্টাফরা সে কাজটা দারুণভাবে করছে। কোচিং স্টাফে আমাদের যে কজনই আছেন, তাঁদের কেউই কখনো কাউকে নেতিবাচক কিছু বলেন না। আউট হলেও সেরকম কিছু বলেন না। বড়জোর বলে যে, ঠিক আছে মারতে গিয়ে তুমি আউট হয়েছ। তবে পরেরবার নিশ্চিত করবে যেন বলটা মাঠে বাইরে যায়। কেউ বলে না যে ওই শটটা তুমি কেন খেললে? এই ইতিবাচক কথাগুলোই সাহস জোগাচ্ছে। এখন আমাদের সব ডিপার্টমেন্টেই কোচ আছে। ছোটখাটো বিষয় নিয়ে সবাই কাজ করছেন। এতে উন্নতিও চোখে পড়ছে।

সংখ্যায়

ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে এবারই প্রথম টি-টোয়েন্টি সিরিজ জিতল বাংলাদেশ। ক্যারিবীয়রা দুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। তাদের বিপক্ষে সিরিজ জয়টা অন্যতম সেরা অর্জন সাকিব আল হাসানের দলের।

 

১২

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ১২ বছর পূর্ণ হলো সাকিব আল হাসানের। ২০০৬ সালের ৬ আগস্ট হারারেতে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ওয়ানডে দিয়ে আন্তর্জাতিক প্রথম ম্যাচ খেলেছিলেন তিনি। গতকাল বাংলাদেশ সময় ৬ আগস্ট ১২ বছর পূর্ণ হলো তাঁর।

 

২২

৪.৪ ওভারে লিটন দাশ ও তামিম ইকবাল গড়েছিলেন ৬১ রানের উদ্বোধনী জুটি। দলীয় ৫০ রান হয়েছিল ২২ বলে। টি-টোয়েন্টিতে এটাই দ্রুততম পঞ্চাশের কীর্তি বাংলাদেশের।