গাজীপুরে মিনারেল ওয়াটারের নামে চলছে জেনারেল ওয়াটারের প্রতারনা

প্রকাশিত

তুহিন সারোয়ার-পানির অপর নাম জীবন হলেও তা দূষিত হওয়ার কারনে মরণকে ডেকে আনছে। গাজীপুর জুড়ে ফিল্টারিং বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের নামে জারের ভেতরে সাধারন দূষিত পানির ব্যবসা চলছে জমজমাট। কিছু অসৎ ব্যবসায়ীরা প্রতারণার মাধ্যমে মোটা অংকের টাকা কামিয়ে নিলেও সাধারণ মানুষের ভাগ্যে জুটছে রোগ-বালাই। এতে করে জনস্বাস্থ্য হয়ে পড়ছে বিপর্যস্ত ও হুমকির সম্মুখীন। জনবল স্বল্পতার দোহাই দিয়ে তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিএসটিআই কর্তৃপক্ষ। হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া গাজীপুরে সব প্রতিষ্ঠানেই ফিল্টার পানি নাম দিয়ে নোংরা পরিবেশে জার ভর্তি করছে সাধারন দূষিত পানিতে। কোনো কেনো স্থানে আবর্জনার ভাগারের ওপরেই পাইপ দিয়ে অবৈধ লাইনের পানি জারে সংগ্রহ করা হচ্ছে। সেই পানিই জারের মুখ প্লাস্টিকের আবরণে আটকে রিক্সা, ভ্যান ও পিকআপ দিয়ে গাজীপুরে বিভিন্ন ব্যবস্যা প্রতিষ্ঠান, দোকান, হোটেল, সরকারী-বেসরকারী অফিস আদালতসহ বিভিন্ন বাসাবাড়িতে সরবরাহ করা হচ্ছে। বিশেষ করে ফুটপাতের চায়ের দোকান, হোটেলসহ অন্যান্য ছোট খাটো দোকানে এর সরবরাহের পরিমাণ বেশি। সরবরাহকৃত এসব পানির প্রতি জারের মূল্য নেয়া হচ্ছে ৪০ থেকে ৫০ টাকা করে। এই পানি পান করে বিভিন্ন পানি বাহিত সংক্রামক ব্যধিতে আক্রান্ত হচ্ছে সাধারণ নিম্ম আয়ের মানুষ। ফলে শিল্প নগরী খ্যাত টঙ্গী ও গাজীপুরে স্বাস্থ্য সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করছে। এতে করে তারা আক্রান্ত হচ্ছে, জন্ডিস, ডায়রিয়া আমাশয়, চর্মরোগ ও কিডনির মত মারাত্মক রোগে। ড্রিংকিং ওয়াটার পণ্যের গুণ-গতমান যাচাই বাচাই ব্যতীত ও বিএসটিআই লাইসেন্স গ্রহণ না করেই অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা পরিবেশে অবৈধভাবে বিএসটিআই মানচিহ্ন ব্যবহার করে এবং অতিবেগুনি রশ্মি ব্যবহার করে পানি জীবাণুমুক্ত না করে ক্রেতা সাধারণনের সাথে প্রতারণা করে আসছে এসব ব্যবসায়ীরা প্রতিনিয়ত।
জানা যায়, শুধুমাত্র টঙ্গীতেই দৈনিক বিক্রি হচ্ছে ৫ হাজারেরও বেশী জারের দুষিত পানি। বিএসটিআই’র  লাইসেন্সে পানি উৎপাদন ও বাজারজাত করণের যেসব হাইজেনিক কন্ডিশন রয়েছে তা বেশির ভাগ বৈধ পানি কারখানার মালিকরাও মানেন না। অল্প পুঁজিতে বেশি লাভের আশায় বেশকিছু ওয়ান লাইন ফিল্টারের হাউজ হোল্ড টাইপ প্লান্ট বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে। অধিকাংশ কারখানার অবকাঠামো অত্যন্ত দুর্বল। রাস্তার পাশে নোংরা এবং ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় তা গড়ে উঠছে। অধিকাংশ কারখানায আধুনিক প্রযুক্তির মাইক্রো বায়োলজিক্যাল ল্যাবরেটরি, ওজন টেকনোলজি অথবা আল্ট্রাভাযােলেটসহ অপরিহার্য যন্ত্রপাতির ব্যবহার নেই। এছাড়াও ওইসব কারখানায় নেই নিজস্ব কেমিস্ট। উৎপাদিত প্রতি ব্যাচ পানির ল্যাবরেটরি রিপোর্ট সংরক্ষণ করা দূরের কথা, তা তৈরিও করা হয়না কখনো। নকল বিএসটিআই এর সীল মনোগ্রাম ও ব্যাচ নম্বর ছাপিয়ে লেভেল লাগিয়ে নির্বিঘে মানহীন পানি বাজারজাত করা হচ্ছে প্রতিদিন। পানি ফিল্টারিং করে তা বাজারজাত করতে বিএসটিআই’র পক্ষ থেকে কিছু বাধ্য বাধকতা মেনে চলতে হয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে। বিএসটিআই’র অধ্যাদেশানুযায়ী ৩৭ (১৯৮৫) এর ২৪ ধারা অনুযায়ী পানিসহ যে কোনো পণ্য বাজারজাত করার আগে বিএসটিআই’র অনুমোদন (সি.এম লাইসেন্স) নেয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বিএসটিআই’র নির্দেশ অনুযায়ী বিক্রিজাত পানি হতে হবে আর্সেনিক পদার্থ মুক্ত। প্রতি লিটার পানিতে থাকতে হবে পিএইচ ৬ দশমিক ৪ থেকে ৭ দশমিক ৪, টিডিএস ২৬০ মিলিগ্রাম, ক্যাডমিয়াম দশমিক ০০৩ মিলিগ্রাম, লেড দশমিক ০১ মিলিগ্রাম, ক্লোরাইড ২৫০ মিলিগ্রাম, নাইট্রেড ৩ দশমিক ৫ মিলিগ্রাম। কিন্তু নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই অবৈধ পানি ব্যবসায়ীরা স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব ও টাকার জোড়ে তাদের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। ভোক্তা অধিকার কয়েকটি সংগঠনের তথ্য থেকে জানা গেছে, মিনারেল ওয়াটারের নামে বাজারে যেসব পানি বিক্রি হচ্ছে এসব পানিতে লেড, ক্যাডমিয়াম, কলিফরম ও জিংক উপাদানের অস্তিত্ব রয়েছে। এসব পদার্থ মানব দেহের জন্য ক্ষতিকর। বোতল জার ও প্লাস্টিক প্যাকেটের পানিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নির্ধারিত আয়রন, পিএইচ, ক্লোরিন, ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম নেই বললেই চলে। কথিত এসব মিনারেল ওয়াটার যথাযথ ভাবে ফিলট্রেশনও ছাকন প্রক্রিয়া করা হচ্ছে না বলেও ভোক্তা অধিকার সংগঠনের তথ্যে জানা গেছে। বিএসটিআই অনুমোদন না নিয়ে বোতলে বিএসটিআই সীল লাগিয়ে বাজারে পানি বিক্রি করার প্রসঙ্গে টঙ্গী সাতাইশ রোড়ে মাটিয়া পাড়া এলাকায় ওয়াটার কিং ড্রিকিং ওয়াটারের মালিক বাবুল মিয়া বলেন, অনুমোদন ছাড়া আমরা বিএসটিআই এর সীল লাগিয়ে ব্যবসা করছি এটা অন্যায়। প্রফেসর ডা. বিল্লাল আলম চ্যানেল সিক্সকে বলেন, জারের এসব মানহীন ভেজাল পানিতে আয়রন, পিএইচ ক্লোরিন, ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম থাকে না। তাই ওই পানি পানে বিভিন্ন পানি বাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। যদি কোন মানুষ ক্যাডমিয়ামযুক্ত নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের পানি নিয়মিত পান করে এবং তা অভ্যাসে পরিণত হয় তাহলে তার শরীরে পুষ্টির অসমতা দেখা দিতে পারে। এ প্রক্রিয়ায় হতে পারে ক্যান্সারও। কোমলমতি শিশুদের জন্য এ পানি আরো ভয়াবহতার রূপ নিতে পারে।
এব্যাপারে প্রশাসনের একাধিক ব্যাক্তির সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা বলেন, আমাদের কাছে এধরনের কোন তথ্য নেই। তাছাড়া এবিষয়গুলো দেখার জন্য মন্ত্রণালয়ের আলাদা একটি দপ্তর “বিএসটিআই” অথবা “স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়” রয়েছে। এটি আমাদের দেখার বা জানার কথা নয়। তারপরও আমাদের কাছে কোন অভিযোগ এলে আমরা অবশ্যই এব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত আছি।

104Shares
আরো পড়ুন :  স্বর্ণের ওই মাত্রায় হেরফের হয়নি : অর্থ প্রতিমন্ত্রী