শপিং মলে ঝিলিক দেওয়া লেহেঙ্গার চেয়ে এবার আদর বেশি ফুটপাতের সুতির স্কার্টের

প্রকাশিত

বাপ্পাদিত্য রায়চৌধুরী, কলকাতা: আমাদের এবার পুজোর জামা হবে না? মাকে প্রশ্ন করেছিল ক্লাস সিক্সের তিতলি। মা বলেছিল, এবার আর বাড়ির পাশের বাজারে গিয়ে অরুণকাকুর দোকান থেকে জামা কিনবে না। বাবা নাকি বলেছে, তাদের এবার হাতিবাগানে নিয়ে যাবে। সেখানে নাকি শ’য়ে শ’য়ে দোকান। প্রচুর জিনিস। এত জামাকাপড়, সেসব ঠেলে-সরিয়ে নাকি রাস্তা পেরতে হয়। অবশেষে তারা আজ এসেছে হাতিবাগানে। মনে মনে হাতিবাগানের বাজারটা যেমন ভেবেছিল তিতলি, সেটা তার চেয়ে অনেক বড় এবং ভালোও। কত রং-বেরঙের ফ্রক। এমনকী তার ছোট্ট চেহারার সঙ্গে মানাসই চুড়িদারও আছে। পথ চলতে গেলে কাপড়জামায় মাথা ঠেকে যায়। ভিড়ের ঠেলায় গায়ের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে মানুষ। দোকানদাররা কত হাঁকডাক করে। সবাই নাকি এখানে সস্তায় জিনিস বেচে। আর আছে বড় বড় দোকান। তার দরজা খুললেই ভিতর থেকে ঠান্ডা হাওয়া বেরিয়ে আসে। তিতলির বাবা অবশ্য সেই দরজা ঠেলে ভিতরে নিয়ে যায়নি। তিতলিও বায়না করেনি। ওই দোকানগুলোর কাচের জানালাতেও কত রকমের ড্রেস। ঝিলিক দেওয়া সেসব জামা নিশ্চয়ই খুব দামি! তবে ওই দামি জামা না পাওয়ায় এতটুকু মন খারাপ হয়নি তিতলির। বরং, তারা অনেক হইচই করে বাজার করেছে। মা দু’টো তাঁতের শাড়ি কিনেছে একটা দোকান থেকে। তার জন্য কেনা হয়েছে চুড়ি, হার। গন্ধে মাত করে দেয়, এমন ঘুগনি রাস্তার ধারের দোকান থেকে কিনে খেয়েছে তারা। আর খেয়েছে চাউমিন। শুধু পুজোর আগে বাজার করতে এসে পুজোর আনন্দের চেয়েও বেশি খুশি হয়েছে তিতলি। মনে মনে ঠিক করে নিয়েছে, আসছে বছরও সে বায়না করবে হাতিবাগানে আসার জন্য। তার মতো কত তিতলি যে এদিন এমন আনন্দ পেয়েছে, তার সীমা নেই!
ভিড় এড়াতে শ্রাবণ মাসের ঘোর বর্ষায় পুজোর বাজার শুরু করে দেন অনেকেই। তবে পুজোর বাজারে পাক ধরে মহালয়ার মাস খানেক আগে। শপিং মলগুলি সেজে থাকে ক্রেতা ধরার জন্য। পুজো যত এগিয়ে আসে, ততই ভিড় বাড়ে সেসব দোকানে। বেচা-কেনা তুঙ্গে ওঠে ছুটির দিনগুলিতে। কয়েক হাজার টাকার কেনাকাটার দাম মুহূর্তে চুকিয়ে দেয় ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড। শপিং মলের কিছু দোকান বাদ দিলে, সেখানে দর কষাকষির জায়গা নেই। থরে থরে সাজানো পোশাক থেকে যে যেমন পারেন হুড়মুড়িয়ে তুলে নেন। কিন্তু এরপরও আক্ষেপের অন্ত নেই মলের দোকানিদের। কেন আক্ষেপ?
কথা হচ্ছিল নিউ মার্কেটের মুঘল লাইফস্টাইলের কর্ণধার জাফর আলি আহমেদ রাইয়ের সঙ্গে। বললেন, শহরে নিউ মার্কেটের বাইরে একাধিক শপিং মলে তাঁর দোকান ছিল। সেখানে পাঁচ বছরের চুক্তিতে দোকান ভাড়া নিয়ে ব্যবসা চালাতেন তিনি। চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে যে টাকা ভাড়া চাইছে মল কর্তৃপক্ষ, তা তাঁর পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়। তাই সেসব দোকান ছেড়ে দিয়েছেন। তিনি একা নন, তাঁর মতো সঙ্কটে পড়েছেন এমন অনেকেই। সেখানে এখন জায়গা দখল করেছে বহুজাতিক বিপণী। কিন্তু তারাও কি খুব সুখে আছে, প্রশ্ন জাফর আলির। ই-কমার্সে কেনাকাটা যেভাবে গিলে খাচ্ছে ব্যবসা, তাতে শপিং মলের অস্তিত্বই এখন প্রশ্নের মুখে, বলছেন তাঁরা।
সন্দেহ যে একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার নয়, সেই ইঙ্গিত দিয়েছে একটি সমীক্ষা। একটি সর্বভারতীয় বণিকসভার করা সমীক্ষা বলছে, আগামী এক বছরের মধ্যে এদেশে প্রায় ১২ কোটি মানুষ অনলাইনে কেনাকাটা করবেন। গত বছর সেই সংখ্যা ছিল ১০ কোটি ৮০ লক্ষ। আর এভাবেই ধীরে ধীরে ধস নামতে পারে ঝাঁ-চকচকে মলের মৌরসিপাট্টায়। মলের ৬০ ভাগ অংশ অদূর ভবিষ্যতে ফাঁকা গেলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই, বলছে ওই সমীক্ষা।
তবু পুজো বা উৎসবের মুখে ক্লান্তি নেই শপিং মলগুলিতে। মানুষের ভিড়েরও অন্ত নেই সেখানে। কিন্তু স্লগ ওভারে এগিয়ে গিয়েছে ফুটপাতই, বলছে কেনাকাটার ধুম। যেখানে প্লাস্টিকের ছাউনি দিয়ে দোকানের মাথা ঢেকে, অথবা টিন ঘেরা দোকানে রাতদিন এক করে ফেলছেন দোকানি, পার্বণের শেষে এসে এবার তাঁরাই চ্যাম্পিয়ন। তাঁরা অনায়াসে সহ্য করছেন ধৈর্যের বাঁধভাঙা দর-কষাকষি। নগদে, ঘামে, কাপড়ের মাড়ে, প্লাস্টিকের মোড়কে আর ক্রেতা ধরার অমোঘ আহ্বানে রাজপথের দু’ধারে শেষ হাসি হাসছেন ফুটপাতের দোকানিরাই। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত দোকানের জানালায় আটকে থাকা চুমকিশোভিত লেহেঙ্গা’র থেকে বেশি কদর পাচ্ছে রাস্তার হ্যাঙ্গারে ঝুলে থাকা ২৫০ টাকার সুতির স্কার্ট। খুশিতে হাসছে তিতলিরা। নতুন জামার গন্ধে আগমনি নিবিড় হচ্ছে ক্রমশ।