এখন অনেক রাত ………..! সম্পাদকীয়

প্রকাশিত

রফিকুল ইসলাম প্রিন্স-

আমি দুর্বল প্রকৃতির মানুষ।সকালবেলা ফেসবুক অন করে যে খবরটি দেখেছি। মৃত্যুর খবর! চোখের সামনে কাগজের রঙিন লেখা! আমি আমাকে কিছুতে বিশ্বাস করাতে পারছি না।কাগজের হেডলাইনটা দেখে চোখ দিয়ে অশ্রুঝরে পড়লো! চোখ সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছি। পারিনি।চোখ সরিয়ে নিলেই কী প্রিয় মানুষের মৃত্যুর সংবাদ মিথ্যে হবে? ফিরে পাবো কী গানের সম্রাট বাচ্চুকে?একটু একটু কষ্ট হচ্ছে তা কিন্তু নয়।আমার পুরো শরীর জুড়ে কষ্টের অশ্রু বের হচ্ছে।খবরটা আমাকে কাঁদিয়ে তুলল।আসলে যার হারায় সে বুঝে হারানো ব্যথা কত কষ্টের!

১৯৬২ সালের ১৬ আগস্ট তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের চট্টগ্রাম শহরে এক বনেদী মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন আইয়ুব বাচ্চু।সঙ্গীতজগতে তাঁর যাত্রা শুরু হয় ফিলিংসের মাধ্যমে ১৯৭৮ সালে। সঙ্গীত চর্চার জন্য অনেক কষ্ট করতে হয় তাকে।ছোটবেলা থেকেই সংসারে থেকেও বোহেমিয়ান বাচ্চু। বাউন্ডুলে স্বভাবের জন্য সংসারের কিছুই যেন স্পর্শ করতে পারছে না তাকে।সংসারের সবাই যখন নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার লড়াইয়ে ছুটছে তখন সে অন্যপথে হাঁটছে। তার মনে বাজে যেন অন্য সুর।সাধারণ বাচ্চু হয়ে পড়ে থাকার জন্য যেন তার জন্ম হয়নি।অন্যকিছু অপেক্ষা করছে তার জন্য। কিন্তু পথ যে সোজা নয়।এই পথ অনেক কঠিন। জোয়ারের বিপরীত। পারব কী আমি?এমন প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।

সাহস থাকলে কে বাঁধা দেয়?তার সাহস আর সামর্থ্য চুপচাপ বসে কোন এক কোণায় ঘুমিয়ে রাখেনি। জাগিয়ে তুলেছে আত্মবিশ্বাস। জীবনের দুর্গম পথটিই বেছে নিয়েছে। যদিও প্রথমে সংসারের সবার কাছে গোল্লায় গেছে তোর জীবন এমনটি শুনতে হয়েছে।তিনি অতিষ্ঠ হননি।

আরো পড়ুন :  সিরিয়া নিয়ে শান্তি আলোচনা শুরু

পপ গানের সম্রাট আজম খানের ভক্ত ছিলেন।একদিন টিভিতে গানের একটি প্রোগ্রাম আজম খানের। মুগ্ধ হয়ে শুনলেন পপ সম্রাটের গান। পাশে ঝাঁকড়া চুলে বোতাম খোলা শার্টে একজন গিটার বাজাচ্ছেন অসাধারণ দক্ষতায়। বাংলাদেশের সেরা অন্যতম গিটারিস্ট ‘নয়ন মুন্সি’।নয়ন বাংলাদেশের গিটার জগতে এক স্মরণীয় নাম।এই প্রথম পরিচয় গিটারে দক্ষ হাতের জাদুগরী খেলা।সে সময়কার অনেক পরিচিত গান, যেমন- এই নীল মনিহার, মন শুধু মন ছুঁয়েছে, মেলায় যাই রে, আবার এলো যে সন্ধ্যা প্রভৃতি কালজয়ী গানের গিটারিস্ট তিনি। তার এই প্রাণবন্ত বাজনা শুনে বাচ্চু ঠিক করে ফেলল, জীবনে আর কিছু চান না, শুধু এমন অসাধারণভাবে গিটার বাজাতে চান। সেই থেকেই গিটারের পিছে ছুটা।যা আজ তাকে অনন্যা উচ্চতায় আচ্ছন্ন করেছে।

আমি মাঝেমাঝে ঢাকা থেকে বিভিন্ন জেলাতে যায়।দরকারে ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ যাচ্ছি। বেশিরভাগ সময় ট্রেন রাস্তায় জ্যাম পড়তে হয়।রাস্তার ক্লান্তি কমাতে পাইভেটক্রার ব্যবহার করি।এসি ছেড়ে বসে লেখালেখি করা যায় আরামছে।সায়দাবাদ দিয়ে না গিয়ে গুলিস্তান হয়ে মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার দিয়ে সো সো টান।যাত্রা নামার পর তখন হঠাৎ রাস্তায় গাড়ির জ্যাম। একটু এগিয়ে দেখলাম ধনিয়া বালুর মাঠে বিশাল মঞ্চ। মঞ্চ থেকে সুরে সুরে গান কানে বাজছে। একজন কে জিজ্ঞাস করলাম। ভাই এখানে কি হচ্ছে?
উত্তরে লোকটি বলল জনপ্রিয় সঙ্গীত শিল্পী আইয়ুব বাচ্চু এসেছে। ড্রাইভার আইয়ুব বাচ্চু কে স্যার? তুমি তাকে চিন না!সে আমাদের দেশে সবচেয়ে জনপ্রিয় শিল্পী। একাধারে গায়ক, লিডগিটারিস্ট, গীতিকার, সুরকার, প্লেব্যাক শিল্পী। এল আর বি ব্যান্ড দলের লিড গিটারিস্ট এবং ভোকাল বাচ্চু বাংলাদেশের ব্যান্ড জগতের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সম্মানিত ব্যক্তিত্বদের একজন।রক ঘরানার কন্ঠের অধিকারী হলেও আধুনিক গান, ক্লাসিকাল সঙ্গীত এবং লোকগীতি দিয়েও শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছেন। তুমি একটু আগে যে গানটি শুনেছিলে সে গানটি বাচ্চুর।স্যার তাহলে আমি তো প্রতিদিনই উনার গান শুনি।আজকে পরিচয় জানলাম।স্যার চলেন সরাসরি আজ তার গান শুনবো। আমি এমন মানুষটির গান না শুনে যেতে পারি না।
রাস্তায় গাড়ী দাড় করিয়ে পুরো অনুষ্ঠান উপভোগ করলাম।

আরো পড়ুন :  Armed robbers steal millions from Ritz Paris hotel

প্রিয় মানুষ মারা গেছে বিশ্বাস করা কঠিন। ব্যস্ততার জীবন ছেড়ে চলে যাবে।তাজা মানুষটি মুহূর্তে মৃত!দুহাত আর মুখ সবসময় যার সচল সে আজ নিথর। মুখে কথা নেই।সুরে গান নেই। হাত উঁচিয়ে ভক্তকে ইশারা করবে না।জীবনে আর ব্যস্ততা থাকবে না।রাস্তার পাশে গাড়ী থামিয়ে গানের মঞ্চ দেখতে আসবে কিন্তু প্রিয় আইয়ুব বাচ্চু কে পাবেনা।পুরোপুরি লাশ হয়ে সবাইকে শোক সাগরে বাসিয়ে আপন ঠিকায় খুঁজে নিলেন। ওপারে ভালো থাকুন।

64Shares