গাজীপুরে মশার কয়েলের বিষাক্ত ধোঁয়ায় মানুষ মরে মশা মরে না !

প্রকাশিত

গাজীপুরে অনুমোদনহীন নকল ও নিম্নমানের মশার কয়েল নিয়ে চ্যানেল সিক্স এর ধারাবাহিক প্রতিবেদন-

লিখেছেন তুহিন সারোয়ার 

নিত্যপ্রয়োজনীয় একটি পণ্যের নাম ‘মশার কয়েল’। শহর থেকে শুরু করে গ্রামাঞ্চলে কয়েল ব্যবহার করে মানুষ। আর একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী তাদের ব্যবসায় অতি মুনাফা পেতে প্রকাশ্যে বিক্রি করছেন অনুমোদনহীন নকল ও নিম্নমানের মশার কয়েল। গাজীপুরে অনুমোদনহীন মশার কয়েলে সয়লাব হয়ে গেছে। বাজারে নিম্নমানের কয়েলের ব্যবসা ছড়িয়ে পড়লেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদারকি বা কোনো মনিটরিং করা হচ্ছে না। অন্যদিকে এসব কয়েল কোম্পানি ভুয়া পিএইচপি নম্বর ও বিএসটিআই’র লোগো ব্যবহার করে আকর্ষণীয় মোড়কে কয়েল বাজারে ছাড়া হচ্ছে। বিএসটিআইয়ের নকল ব্যান্ডের ট্রেডমার্ক দিয়ে কয়েল উৎপাদন করে দেশীয় কয়েলের প্যাকেট ব্যবহার করে তা বাজারজাত করে আসছে এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিদ্যমান বালাইনাশক অধ্যাদেশ (পেস্টিসাইড অর্ডিন্যান্স ১৯৭১ ও পেস্টিসাইড রুলস ১৯৮৫) অনুসারে, মশার কয়েল উৎপাদন, বাজারজাত ও সংরক্ষণে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অনুমোদন বাধ্যতামূলক। অধ্যাদেশ অনুযায়ী অধিদফতরের অনুমোদন পাওয়ার পর পাবলিক হেলথ প্রোডাক্ট (পিএইচপি) নম্বর ও বিএসটিআইয়ের অনুমোদন নিয়েই সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে বালাইনাশক পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাত করতে হবে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) মশার কয়েলে সর্বোচ্চ শূন্য দশমিক ৩ মাত্রার ‘অ্যাকটিভ ইনটিগ্রেডিয়েন্ট’ ব্যবহার নির্ধারণ করেছে। এই মাত্রা শুধুমাত্র মশা তাড়াতে কার্যকর, মারতে নয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অনুমোদনহীন ব্যবসায়ীমহল কর্তৃক প্রস্তুত ও বাজারজাতকৃত কয়েলে শুধু মশাই নয়, বিভিন্ন পোকামাকড়, তেলাপোকা এমনকি টিকটিকি পর্যন্ত মারা যায়! গাজীপুর মহানগরের টঙ্গী বাজার, চেরাগআলী, বোর্ডবাজার , সাইনবোডসহ কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ‘নাইট রোজ,ঝিলিক, ঝিলিক সুপার, সেরা, সেরা নিম, অতন্ত্র প্রহরী জাম্বো, অতন্ত্র প্রহরী মিনি, ফ্যামিলি, ওয়ান টেন, সান পাওয়ার, তুলসি পাতা, সাঝের তারা ও রকেটসহ অনুমোদনহীন কয়েলে বাজার সয়লাব। গাজীপুর মেট্রোপলিটন বাইপাস এলাকার বাসিন্দা একরাম বলেন, মশা নয় মানুষ মারার কয়েল। স্বল্প দামের কয়েলের ধোঁয়াতে ঘর অন্ধকার হয়ে যায়। যেন দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। মশাও মরে, সঙ্গে তেলাপোকাও। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডবিস্নউএইচও) মশা তাড়ানোর কয়েলে শূন্য দশমিক ১ থেকে শূন্য দশমিক ৩ মাত্রার ‘অ্যাকটিভ ইনগ্রেডিয়েন্ট’ নামক কীটনাশক ব্যবহার নির্ধারণ করেছে। এ মাত্রার কীটনাশক ব্যবহার হলে মশা পালিয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু চিন-থাইল্যান্ড থেকে আমদানিকৃত ও বাংলাদেশে প্রস্তুত কিছু উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ক্রেতা আকৃষ্ট করতে অতিমাত্রার কীটনাশক ব্যবহার করছে। এতে মশাসহ বিভিন্ন পোকামাকড়, তেলাপোকা এমনকি টিকটিকিও মারা যাচ্ছে। আর নিঃশ্বাসে বিষাক্ত ধোঁয়া গ্রহণে ধীরে ধীরে নানাবিধ রোগ বাসা বাঁধছে মানবদেহে।
মশার কয়েলে মাত্রাতিরিক্ত বিষাক্ত রাসায়নিক উপাদানের ব্যবহার করায় শিশুর বিকাশ কমে যেতে পারে। বড়দের স্মৃতিভ্রম, ঝাঁকুনি, মানসিক দৃঢ়তা, মাথাব্যথার মতো সমস্যা হতে পারে। বিষাক্ত উপাদান শরীরের ইমিউন সিস্টেমের ক্ষতি করে শরীরের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। এছাড়া থাইরয়েড সমস্যাসহ বিভিন্ন অন্তঃক্ষরা গ্রন্থির ক্ষতি করে। এছাড়া লিভার ও কিডনি বিকল হওয়া, অ্যালার্জিসহ নানাবিধ চর্মরোগ সৃষ্টি করতে পারে। ভোগড়া মধ্যপাড়া এলাকায় সেরা কয়েলের ডিপো ম্যানেজার রায়হান বলেন, সবধরনের প্রক্রিয়া শেষে সেরা কয়েলটি বাজারজাত করা হচ্ছে।  কয়েলে কোনো ধরনের মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার করা হয়নি। রোগতত্ত্ব, রোগ-নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান চ্যানেল সিক্সকে বলেন,  অনুমোদিত কিছু ক্ষুদ্র মশার কয়েল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানও মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক মেশানোর কারণে ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন ভোক্তারা। মানুষের শরীরে দানা বাঁধছে শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত রোগ হাঁপানি, এমনকি ফুসফুস ক্যানসার পর্যন্ত। বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মাত্রার চেয়ে বেশি পরিমাণ কীটনাশক বা কেমিক্যাল মেশানো হলে মশা তাড়ানোর কয়েল অনেক ক্ষেত্রেই ধীরে ধীরে মানবদেহে নানা রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে।এ ধরনের রাসায়নিকের যথেচ্ছ ব্যবহার সব বয়সী মানুষের জন্যই ক্ষতিকর। তবে শিশুদের ওপর এটি দ্রুত প্রভাব বিস্তার করে। প্রতিনিয়ত এ ধরনের রাসায়নিকের সংস্পর্শ তাৎক্ষণিকভাবে নয়, সুদূরপ্রসারী ক্ষতি করে। জটিল রোগ-ব্যাধি সৃষ্টি করে। বিশেষ করে শ্বাসতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত ও রক্তে বিষক্রিয়া হয়। এতে গর্ভের শিশুও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বালাইনাশক অধ্যাদেশ-(পেস্টিসাইড অর্ডিন্যান্স ১৯৭১ ও পেস্টিসাইড রুলস ১৯৮৫) অনুসারে মশার কয়েল উৎপাদন, বাজারজাত ও সংরক্ষণে কৃষি সমপ্রসারণ অধিদফতরের অনুমোদন বাধ্যতামূলক। অধ্যাদেশ অনুযায়ী, কয়েলের নমুনা পরীক্ষা করে কৃষি সমপ্রসারণ অধিদফতর ‘পাবলিক হেলথ প্রোডাক্ট’ (পিএইচপি) নম্বর অনুমোদন দেবে। এরপর পিএইচপি কাগজপত্র দেখে বিএসটিআইয়ের অনুমোদন মিললেই কেবল বালাইনাশক পণ্য হিসেবে মশার কয়েল উৎপাদন ও বাজারজাত করা যাবে। কিন্তু বাজারের অধিকাংশ মশার কয়েলের পিএইচপি নম্বর থাকলেও বিএসটিআইয়ের অনুমতি নেই। কোনোটিতে বিএসটিআইয়ের অনুমোদন থাকলেও পিএইচপি নম্বর নেই। আবার কোনো কোনোটির ক্ষেত্রে ভুয়া পিএইচপি নম্বরে অনুমোদন নেয়ার অভিযোগ রয়েছে।

আরো পড়ুন :  মাগুরায় এক ব্যক্তির গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাজারে যেসব কয়েল পাওয়া যায়, তাতে কতটুকু মাত্রায় ইনগ্রিডিয়েন্ট ব্যবহার করা হয়, তা এখন আমাদের দেখার বিষয়। এসব কয়েল সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিয়মিত মনিটরিংয়ের মাধ্যমে মান যাচাই করা প্রয়োজন। এছাড়া দেশের বাইরে থেকে মশার কয়েল আমদানির ক্ষেত্রে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা গঠনে গুরুত্বারোপ করা দরকার। আমাদের দেশে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য মশার কয়েল প্রস্তুতকারক কোম্পানি রয়েছে, যারা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন নামে ভোক্তাদের ঘরে জায়গা করে নিয়েছে এবং তারা যথাযথ মান নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়া দিয়ে অনুমোদন পেয়েছে। এখানে চাইলেই অনুমোদন পাওয়া কোম্পানিগুলো রাসায়নিক মিশ্রণ বাড়াতে পারে না, যা দ্রুত মশা মেরে ফেলবে কিন্তু স্বাস্থ্যের জন্য তা মারাত্মক ক্ষতিকর। ঠিক এ সুযোগ নিয়ে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অতিরিক্ত রাসায়নিক মিশ্রণের মাধ্যমে উৎপাদন ও বাজারজাত করে চলেছে বিষাক্ত মশার কয়েল। অতিরিক্ত মিশ্রণ থাকায় এর তাৎক্ষণিক কার্যক্ষমতা অল্প সময়েই ভোক্তাদের মনে জায়গা করে নিয়েছে যার মরণ ফাঁদে নিজেরাই আটকে দিচ্ছে স্বাভাবিক জীবন গতি ।

আরো পড়ুন :  ঝিনাইদহে এক রশিতে দুলাভাই-শ্যালিকার লাশ

২য় প্রতিবেদনে – মশার কয়েলের নাম শুনে মানুষ ভয় পায়, মশা না

104Shares