হাজিরা দিয়েই বছর যাবে খালেদার

প্রকাশিত

এমনিতেই পুরান ঢাকার বকশীবাজারের অস্থায়ী এজলাসে বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দুটি মামলার শুনানি চলছে। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় সপ্তাহে অন্তত দুই দিন তাকে এই আদালতে হাজিরা দিতে হয়। তারপরও আরও ১৪টি মামলা শুনানির জন্য স্থানান্তর করা হয়েছে এই অস্থায়ী আদালতেই। আইনজ্ঞরা মনে করেন, বকশীবাজারের অস্থায়ী আদালতে এই মামলাগুলোর বিচারিক কার্যক্রম শুরু হলে কার্যত সপ্তাহজুড়েই মামলা ও বিচার সংক্রান্ত কাজে ব্যস্ত থাকতে হবে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীকে।মামলা স্থানান্তরে সরকারের কী উদ্দেশ্য রয়েছে তা দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে যাবে বলেও মন্তব্য করেন তারা। আদালত সূত্র জানায়, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মোট ৩৭টি মামলা ঝুলছে। এর মধ্যে ওয়ান-ইলেভেনে সেনাশাসিত সরকারের সময়ে দায়ের করা হয়েছে ৪টি মামলা। বাকিগুলো আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের দুই মেয়াদে করা। যে ১৪টি মামলা স্থানান্তর করা হচ্ছে তার মধ্যে ঢাকা মহানগর দায়রা আদালতে ৯টি, বিশেষ জজ আদালতে ৩টি ও ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে ২টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। বিএনপির নীতিনির্ধারকরা বলছেন, নির্বাচনকে সামনে রেখে খালেদা জিয়াকে আদালতে ব্যস্ত রেখে সরকার ‘অসৎ’ কোনো ফায়দা লুটতে চায়। বেগম জিয়াকে নির্বাচন ও রাজনীতিতে ‘অযোগ্য’ ঘোষণা করাই এর লক্ষ্য। তবে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এ অভিযোগ নাকচ করে বলেছেন, ‘খালেদা জিয়ার নিরাপত্তাজনিত কারণেই একই আদালতে মামলাগুলো স্থানান্তর করা হয়েছে।’  এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘সরকার কী কারণে মামলাগুলো অস্থায়ী আদালতে স্থানান্তর করেছে সেটা এখনই বোঝা যাবে না। যদি দেখা যায় আগামী দুই-তিন সপ্তাহ খুব ঘন ঘন মামলার শুনানির তারিখ পড়ছে তাহলে বুঝতে হবে, বিএনপির দাবিই (খালেদা জিয়াকে আদালতে ব্যস্ত রেখে সরকার ফায়দা লুটতে চাচ্ছে) সঠিক। আর যদি স্বাভাবিকভাবেই মামলার তারিখ নির্ধারণ হয় তাহলে কোনো সমস্যা থাকবে না। মামলা স্থানান্তরের আসল কারণ জানতে আরও দুই-তিন সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হবে।’

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘বিএনপি চেয়ারপারসনকে নির্বাচন ও রাজনীতি থেকে দূরে রাখার ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। এ কারণেই তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে প্রতি সপ্তাহেই অন্তত দুই-তিনবার আদালতে হাজিরার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। উদ্দেশ্য, নির্বাচন পর্যন্ত ম্যাডামকে আদালতে ব্যস্ত রেখে সাজা দেওয়া। কিন্তু অতীত ইতিহাসে রয়েছে, জাতীয় নেতাদের জেলে ঢুকিয়ে কোনো লাভ হয়নি। বেগম জিয়াকেও জেলে নিয়ে কোনো লাভ হবে না।’ তবে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, ‘নিরাপত্তার স্বার্থেই বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দায়ের করা ১৪টি মামলা বকশীবাজারের অস্থায়ী আদালতে স্থানান্তর করা হয়েছে। খালেদা জিয়ার ১৪টি মামলা কেন বকশীবাজারের অস্থায়ী আদালতে স্থানান্তর করা হয়েছে? অনেকে বলছেন এর সঙ্গে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে— এমন প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, মোটেও রাজনৈতিক কারণে করা হয়নি। আমরা দুই পক্ষেরই সিকিউরিটির ব্যাপারটি চিন্তা করে এটা করেছি।’

আরো পড়ুন :  সাভারে আ’লীগের দু’গ্রুপের সংঘর্ষ, আটক ৩

গত বৃহস্পতিবার এই ১৪টি মামলা স্থানান্তর করে প্রজ্ঞাপনও জারি করেছে আইন মন্ত্রণালয়। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, স্থান সংকুলান না হওয়া ও নিরাপত্তার কারণে খালেদা জিয়ার মামলাগুলো স্থানান্তর করা হচ্ছে। মামলাগুলোর মধ্যে রয়েছে— দারুস সালামের নাশকতার আট মামলা, গ্যাটকো দুর্নীতি মামলা, নাইকো দুর্নীতি মামলা, বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি দুর্নীতি মামলা, যাত্রাবাড়ী থানার বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা ও মানহানির দুই মামলা।

আদালতের নথি সূত্রে জানা গেছে, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলার ৫টি, রাষ্ট্রদ্রোহ, হত্যা (হুকুমের আসামি), ইতিহাস বিকৃতি করা, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কটূক্তি, ভুয়া জন্মদিন পালনসহ বিভিন্ন অভিযোগে দেশের আদালতে ৩২টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ, বিশেষ জজ ও মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে রয়েছে ১৮টি মামলা। যার মধ্যে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা আগে থেকেই বকশীবাজারের অস্থায়ী আদালতে পাঠানো হয়। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়ার পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন চলছে। আর জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় আগামীকাল বুধবার ও বৃহস্পতিবারও যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের জন্য দিন ধার্য রয়েছে। যুক্তি উপস্থাপন শেষ হলেই এই মামলার রায় ঘোষণার জন্য দিন ঠিক করবেন বিচারক।

খালেদা জিয়ার অন্যতম আইনজীবী ও বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখতেই মামলাগুলো অস্থায়ী আদালতে স্থানান্তর করা হয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে হয়রানি করাই সরকারের আসল উদ্দেশ্য। তিনি বলেন, আইন সবার জন্য সমান হলেও খালেদা জিয়ার মামলাগুলোকে সরকার রাজনৈতিকভাবে দেখছে। অস্থায়ী আদালতে সব মামলার শুনানি শুরু হলে সারা সপ্তাহই সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীকে মামলা ও বিচারসংক্রান্ত কাজে ব্যস্ত থাকতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

আরো পড়ুন :  খোলামেলা পোশাকের কারণে রোষের মুখে মালয়েশিয়ার এয়ারলাইনস

স্থানান্তরিত ১৪ মামলা

গ্যাটকো দুর্নীতি মামলা : গ্যাটকো দুর্নীতি মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ ২০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের শুনানির জন্য আগামী ২১ জানুয়ারি দিন ধার্য রয়েছে। ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৩ এর বিচারক আবু সৈয়দ দিলদারের আদালতে মামলাটির অভিযোগ গঠন শুনানির দিন ধার্য রয়েছে।

নাইকো দুর্নীতি মামলা : নাইকো দুর্নীতি মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের শুনানির জন্য ১৫ জানুয়ারি দিন ধার্য রয়েছে। ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৯ এর বিচারক মাহমুদুল হাসানের আদালতে মামলাটি বিচারাধীন।

খনি দুর্নীতি মামলা : বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি দুর্নীতি মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াসহ ১১ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের শুনানির জন্য আগামী ১৮ ফেব্রুয়ারি দিন ধার্য রয়েছে। ঢাকার ২ নম্বর বিশেষ জজ আদালতের বিচারক হোসনে আরা বেগমের আদালতে মামলাটি বিচারাধীন।

মর নাশকতার আট মামলা : ২০১৫ সালের প্রথম দিকে বিএনপির হরতাল-অবরোধ চলাকালে রাজধানীর দারুস সালাম থানায় নাশকতার অভিযোগে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলাগুলো হয়েছে। মামলায় খালেদাকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তারা। ঢাকা মহানগর দায়রা জজ কামরুল হোসেন মোল্লার আদালতে আগামী ৫ ফেব্রুয়ারি মামলাগুলোর অভিযোগ গঠন, শুনানির দিন ধার্য রয়েছে।

যাত্রাবাড়ী থানার বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা : ২০১৫ সালের ২৩ জানুয়ারি রাতে যাত্রাবাড়ীর কাঠেরপুল এলাকায় গ্লোরি পরিবহনের একটি বাসে পেট্রলবোমা ছোড়ার ঘটনায় রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানায় বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে অভিযুক্ত করে মামলা দায়ের করে পুলিশ। এরপর খালেদাসহ ৩৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিল করে পুলিশ। ঢাকার প্রথম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে ২৫ জানুয়ারি এ মামলায় অভিযোগ গঠন, শুনানির দিন ধার্য রয়েছে।

মানহানির দুই মামলা : মানহানির দুই মামলায় ঢাকা মহানগর হাকিম খুরশীদ আলমের আদালতে আগামী ২১ জানুয়ারি শুনানির দিন ধার্য রয়েছে

Shares