না.গঞ্জে ৩৬৫ দিনে ৫৫৮ লাশ

প্রকাশিত

নারায়ণগঞ্জ সংবাদদাতা : সোনালী আঁশ পাটের জন্য একসময় সারাবিশ্বে নারায়ণগঞ্জ প্রাচ্যের ড্যান্ডি হিসেবে সুপরিচিত ছিলো। কালের বিবর্তনে নারায়ণগঞ্জকে মানুষ ভিন্ন আঙ্গিকে চিনছে। গুম, খুন এবং সন্ত্রাসের বিস্তারের কারণে নারায়ণগঞ্জের ইতিবাচক অর্জনগুলো সেভাবে সামনে আসছেনা।
 ২০১২ সালে চঞ্চল হত্যা, ২০১৩ সালে ত্বকী হত্যা এরপর ২০১৪ সালে সাত খুন, ২০১৫ সালে পাঁচ খুন, ২০১৬ সালে পাইকপাড়ায় তিন জঙ্গীর হত্যার ঘটনায় দেশজুড়ে নেতিবাচক পরিচিতি পায় প্রাচ্যের ড্যান্ডি নারায়ণগঞ্জ।
কখনও শীতলক্ষ্যার কালো জলে ভেসে ওঠা লাশ, কখনও বা অজ্ঞাত পরিচয়ে গুলিবিদ্ধ কিংবা থেঁতলানো লাশের সন্ধান মিলেছে। মায়ের হাতে সন্তান খুন কখনও বা মায়ের লাশের পাশে সন্ধান মিলে দেড় বছরের জীবন্ত শিশুর। টাকার জন্য রাতের আঁধারে বন্ধুর হাতে চার টুকরো হতে হয় বন্ধুকে।
এসব ঘটনা  ২০১৮ সালে ৩৬৫ দিনে আলোচনায় রেখেছে নারায়ণগঞ্জকে। শুধুমাত্র গণমাধ্যমে আসা গেলো বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর ১২ মাসে নারায়ণগঞ্জে হত্যা, ধর্ষণের পর হত্যা,আত্মহত্যা, বন্দুকযুদ্ধ, এবং সড়ক দূর্ঘটনা সহ বিভিন্ন ঘটনায় লাশের সন্ধান পাওয়া গেছে ৫৫৮ টি লাশ। লাশ হওয়া এসব মানুষের লোকহর্ষক ঘটনার পেছনের বিষয় সামনে আসায় আতঁকে উঠেছে পুরোদেশ।
গেলো বছরের শুরুতে জানুয়ারি  মাসে সিদ্ধিরগঞ্জের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী রোকসানা আক্তার (১০) কে ধর্ষণের পর হত্যা, রাজনৈতিক সংঘর্ষে যুবলীগ নেতা খুনসহ নানা ঘটনায় লাশ পাওয়া গেছে ৪২ লাশের। ফেব্রুয়ারিতে ২ তারিখে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্রী মোনালিসাকে। ২৬ ফেব্রুয়ারি সোনারগাঁয়ের ত্রিপদী এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয় ১০ জন। এর মধ্যে একই পরিবারের চার জনের মৃত্যু হয়।
মোটেও ব্যতিক্রম ছিলোনা মার্চ মাসও। প্রথম সপ্তাহেই লাশের সন্ধান মিলে ১৪ টি। এমাসের ২৮ মার্চের ঘটনায় স্তব্ধ হয়ে উঠে নারায়ণগঞ্জ। ২৮ মার্চ বিকেলে সদর উপজেলার ফতুল্লার কোতালেরবাগ বৌ বাজার এলাকায় একটি বসতঘর থেকে রিমা আক্তারের (২২) লাশ উদ্ধার করা হয়।  এসময় মায়ের সঙ্গে দেড় বছরের শিশু বিছানায় খেলা করতে দেখা যায়। আর এ ঘটনা শুধু নারায়ণগঞ্জ নয় সারাদেশ জুড়ে আলোচিত হয় নারায়ণগঞ্জ। সবমিলিয়ে ফেব্রæয়ারিতে লাশের সংখ্যা দাঁড়ায় ৪২ টি।
এরপর ১৩ এপ্রিলের ঘটনা। আড়াইহাজার  উপজেলার উচিৎপুরা ইউনিয়নের বাড়ৈপাড়া  গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। দীর্ঘদিনে পরকীয়ার জের ঢাকতেই শুক্রবার  রাতে ঘাতক মা শেফালী তার প্রেমিক মোমেনকে নিয়ে ঘুমন্ত অবস্থায় তার দুই সন্তান হৃদয় ও শিহাবকে কাঁথায় পেঁচিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। কিন্তু অগ্নিদগ্ধ শিহাবকে বাঁচানো গেলেও হৃদয়কে (৯)কে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। এপ্রিলে ৫৫ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়।
মে মাসে পাওয়া যায় ৪৪ লাশ। জুনে সিদ্ধিরগঞ্জের মা ও দুই মেয়ে হত্যাকান্ডের ঘটনায় আবারো দেশজুড়ে আলোচনায় আসে নারায়ণগঞ্জ। ঈদের দিনও পাওয়া যায় লাশ। ১৬ জুন ঈদের দিন সিদ্ধিগঞ্জের আটি হাউজিংয়ের আলী মোহাম্মদের মাছের খামার থেকে মাহি নামে ১৫ মাস বয়সী এক শিশুর বস্তাবন্দী লাশ উদ্ধার  করে পুলিশ। ১৮ জুন আটি এলাকার একই খামারে ভাসতে থাকা একটি ব্যাগ থেকে হাত পা বাঁধা অবস্থায় শিশু মাহিদার (৭) লাশ উদ্ধার করা হয়। এর আগে  ১১ জুন বিকেলে সিদ্ধিরগঞ্জের ভাঙ্গারপুল এলাকার ডিএনডি ইরিগেশন খালের পাশ থেকে ড্রামের মধ্যে আঞ্জুবী আক্তারের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। হত্যাকান্ডের রহস্য উন্মোচন করতে সমর্থ হয় পুলিশ। জানা যায়, স্বামীর দ্বিতীয় সংসারের বিরোধের জের ধরে প্রথম স্ত্রী ও তার দুই মেয়েকে শ্বাসরোধে হত্যার পর তাদের হাত-পা বেঁধে লাশ বস্তায় ভরে পুকুরে আর মা আঞ্জুবী আক্তারকে ড্রামে ভরে ইরিগেশন খালে ফেলে দেয়া হয়েছিল। সবমিলিয়ে জুনে লাশের সংখ্যা দাঁড়ায়  ৩২টি।
জুলাইয়ে বন্ধুর হাতে বন্ধু হত্যাসহ পর পর কয়েকটি  ঘটনায়  গত দু’মাসে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে নারায়ণগঞ্জ। গত জানুয়ারী মাস থেকে আগষ্ট পর্যন্ত সর্বোচ্চ লাশের সন্ধান পাওয়া যায় এ মাসে। দুর্ঘটনায়, আত্মহত্যা,  হত্যা, অপমৃত্যু, বন্দুকযুদ্ধে এ মাসে লাশের সংখ্যা গিয়ে পৌঁছায় ৬৫ তে। এ মাসে একটি সেপটিক ট্যাংক থেকে প্রবীর ঘোষ নামে এক স্বর্ণব্যবসায়ী চার টুকরো লাশ উদ্ধার করা হয়।  ঘটনার জট  খুলতেই বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যেকর সব তথ্য। দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত বন্ধু পিন্টু দেবনাথের হাতেই খুন হয় প্রবীর ঘোষ। শুধু তাই নয়, বেরিয়ে আসে আরো এক হত্যার রহস্য। দুবছর আগে পিন্টু দেবনাথ ও শিলা রানী নামে এক নারীর যোগসাজশেই খুন হয় নিতাইগঞ্জের কাপড় ব্যবসায়ী স্বপন কুমার সাহা।
আগষ্টে বিভিন্ন ঘটনায় লাশের সন্ধান পাওয়া যায় ৪৩ লাশ। ৩১ আগষ্ট এর ঘটনা। মাসদাইরে পাওনা টাকা চাওয়ায় জ্যান্ত পুড়িয়ে দেয়া হত্যা করা হয় ঝুট ব্যবসায়ী সুমনকে।
সেপ্টেম্বরের মাত্র ৩০ দিনে সন্ধান মিলে ৬৫ লাশের। তবে নৃশংসতা হার মানায় অক্টোবরের ঘটনা। মাত্র ৩১ দিনে ১৫টি হত্যাসহ ৫৮টি লাশের সন্ধান মিলে ঐ মাসে।  এর মধ্যে আলোচিত হত্যাকান্ড হল গত ২১ অক্টোবরের ঘটনা। আড়াইহাজার উপজেলার ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের সাতগ্রাম ইউনিয়নের পাচঁরুখী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে থেকে মুখ থেতলানো ও গুলিবিদ্ধ ৪ যুবকের লাশ উদ্ধার করা হয়।
ময়নাতদন্তে বেরিয়ে এসেছে ৩ জনের মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। আর একজনকে মাথায় আঘাত করে হত্যা নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে সবার মাথার পেছনে ভারী কিছু দিয়ে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে বলে জানিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. আসাদুজ্জামান।
কিন্তু কারা, কেন, কি কারণে তাদের খুন করেছে এ রহস্যে এখন পর্যন্ত উদঘাটন করতে পারেনি পুলিশ। তবে স্বজনদের দাবী ডিবি পরিচয়ে তুলে নিয়ে আসা হয়েছিলো তাঁদের। তারপরই তাঁদের খুন হতে হয়েছে।
আগের দিন রূপগঞ্জে  কথিত বন্দুকযুদ্ধে আবুল হোসেন নামের এক ব্যক্তি নিহত হয়। স্বজনরা বলছে, আবুল হোসেন ও আবুল কালাম দুই ভাইকে ১৮ অক্টোবর ধরে নিয়ে যায় পুলিশ। তার  দু’দিন পরই আবুল হোসেনের লাশ ঢাকা বাইপাস সড়কে উদ্ধার করা হয়। তবে পুলিশের দাবি, সে ডাকাত দলের সদস্য এবং ডাকাতির মালামাল ভাগাভাগি নিয়ে নিজেদের মধ্যে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়।
নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে লাশের সন্ধান মেলে ৬৪ লাশের। এর মধ্যে গত নভেম্বর ৩১ লাশ ও ডিসেম্বরে ৩৩ লাশ। দুই মাসে হত্যাকান্ডে ২২, সড়ক দূর্ঘটনায় ১৩, অগ্নিকান্ডের ঘটনায় মৃত্যু ৬, অপমৃত্যু ও আত্মহত্যার ঘটনায় ২০ লাশ, রহস্যজনক মৃত্যু ও বিদ্যুৎস্পৃষ্টে ৮ লাশ এবং পানিতে ডুবে ও বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয় ২ জনসহ  মৃত্যু হয় ৬৫ জনের।
নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান মাসুম বলেন, এতোসংখ্যক লাশ উদ্ধারের ঘটনা খুবই উদ্বেগজনক। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির জন্য রাজনৈতিক সন্ত্রাসীদের প্রশ্রয় দেয়া যাবেনা। সামাজিক অবক্ষয় রোধে আরো জোরালো ভূমিকা গড়ে তুলতে হবে। নতুন বছরে যাতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয় সেজন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরো তৎপর হতে হবে। ২০১৮ সাল নারায়ণগঞ্জবাসীর জন্য আর্শীবাদ বয়ে না আনলেও নতুন বছরে নারায়ণগঞ্জবাসীর প্রত্যাশা একটাই সেটা হল একটি নিরাপদ নারায়ণগঞ্জের।