পুলিশ স্টিকার’ লাগিয়ে ছিনতাই-অপহরণ

প্রকাশিত

গাড়িতে স্টিকার লাগিয়ে অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে। ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনারের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ব্যক্তিগত যানবাহনে ‘পুলিশ লেখা স্টিকার’ লাগিয়ে ছিনতাই, ডাকাতি, অপহরণ ও ইয়াবা পাচারসহ নানা অপরাধ করা হচ্ছে। এসব যানবাহন নিয়ে অপরাধীচক্র রাস্তায় দায়িত্বরত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখকে ফাঁকি দিয়ে বীরদর্পে অবৈধ মালামাল পারাপারসহ প্রতিনিয়ত সন্ত্রাসী কার্যকলাপ করেই আসছে। আর সন্ত্রাসীদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এক শ্রেণির পুলিশ সদস্যও ব্যক্তিগত মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকারসহ যানবাহনে স্টিকার লাগিয়ে আইন অমান্য করে যাচ্ছে। শুধু পুলিশ লেখা স্টিকারই নয়, সাংবাদিক ও আইনজীবীসহ নানা পেশার স্টিকারও দেখা যাচ্ছে।
জানা গেছে, এ ধরনের অপরাধ রোধে গত বছর ডিএমপির পক্ষ থেকে ব্যক্তিগত যানবাহনে পুলিশ, সাংবাদিক, আইনজীবীসহ বিভিন্ন পেশাগত পরিচয় সংবলিত স্টিকার ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল। একইসঙ্গে সন্দেহজনক যেকোনো গাড়ি তল্লশির নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে কোনো সাংবাদিক দায়িত্ব পালনকালে প্রতিষ্ঠানের নামে স্টিকার লাগালে সমস্যা নেই বলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া জানিয়েছিলেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ট্রাফিক পুলিশ সদস্য জানান, রাজধানীতে পুলিশ, সাংবাদিক লেখা স্টিকার লাগানো মোটরসাইকেল ও অন্যান্য যানবাহন উল্টো পথে বেশি চালাতে দেখা যায়। এসব সাংবাদিক-পুলিশ আসল না নকল বোঝা মুসকিল হয়ে পড়ে। অনেক সময় সন্দেহ থাকলেও নানা ঝামেলা এড়ানোর জন্য কোন প্রতিরোধ করা হতো না। তবে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দেশে নগরীর বেশ কিছু এলাকায় গত বছর প্রভাবশালী ব্যক্তিদের যানবাহন ও তার চালকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। আর যেসব যানবাহন উল্টো পথে চলাচল করে, তার একটি বড় অংশ সমাজের কর্তাব্যক্তিদের গাড়ি। এর আগে ওইসব গাড়ির মালিকদের ট্রাফিক আইন মানতে অনুরোধ করে ডিএমপির পক্ষ থেকে চিঠি দেওয়া হয়েছিল বলে জানা গেছে। এছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় মোটরসাইকেল ব্যবহার করে ছিনতাই, অপহরণ, মাদক ও অস্ত্র পাচারসহ নানা ধরনের অপরাধের ঘটনা ঘটানো হয়ে থাকে। আর এসব মোটরসাইকেল চালকগণ ট্রাফিক নিয়ম লঙ্ঘনও করে থাকে। এজন্য মাঝেমধ্যেই বড়ধরনের যানজট ও দুর্ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগীরা জানান, শুধু পুলিশ আর সাংবাদিকই নয়, এখন কমিউনিটি পুলিশের পরিচয় দিয়ে এক শ্রেণির সন্ত্রাসী মোটরসাইকেলসহ যানবাহনের পুলিশ লেখা স্টিকার লাগিয়ে ইয়াবাসহ মাদক, অস্ত্র পাচারসহ নানা ধরনের অপরাধের ঘটনা ঘটিয়ে আসছে। আর তাদেরকে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা সহযোগিতা করে আসছেন। তাদের দাপটে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীসহ সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে চাঁদা আদায় করছে। এসব সন্ত্রাসীরা মোটরসাইকেলের সামনে পুলিশ লেখা স্টিকার লাগিয়ে বীরদর্পে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।
অপর একটি সূত্র জানায়, পুলিশ সপ্তাহসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের জন্য সাংবাদিক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ারসহ বিভিন্ন পেশার লোকজনকে দাওয়াত করে থাকে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স। আর ওইসব দাওয়াত কার্ড কতিপয় পুলিশ কর্মকর্তা ও সংবাদকর্মীর সঙ্গে সখ্যতা গড়ে এক ধরনের অপরাধীচক্র সংগ্রহ করেন। যার মধ্যে পুলিশ সপ্তাহের দাওয়াত কার্ডের খামের ভেতরে ‘পুলিশ সপ্তাহ’ লেখা স্টিকার থাকে। এরপর ওইসব দাওয়াত স্টিকার তাদের ব্যক্তিগত মোটর সাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহনে লাগিয়ে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় অপরাধের ঘটনা ঘটিয়ে আসছে। এছাড়া, মদ, গাঁজা, ইয়াবা, হেরোইন, অস্ত্রসহ অবৈধ মালামালবহন ছাড়াও, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাইসহ নানা অপকর্ম করছেন বলে জানা গেছে। রেন্ট-এ কার ব্যবসায়ী এক ব্যক্তি এবারের পুলিশ সপ্তাহের আগে ওই দাওয়াত কার্ড সংগ্রহের জন্য ব্যস্ত ছিলেন। আর ওই কার্ডের জন্য এতো ব্যস্ততা হওয়ার কারণ কি? জানতে চাইলে তিনি বলেন, ওই পুলিশ লেখা স্টিকার গাড়িতে থাকলে রাস্তায় সার্জেন্টরা ঝামেলা করে না। এজন্যই তিনি ওই কার্ড সংগ্রহের জন্য দৌঁড়ঝাপ করেছেন।
আর পুলিশ লেখা স্টিকার লেখা যানবাহনের অপরাধের ঘটনা বৃদ্ধির কারণে গত ২০১৬ সালের ৪ মে ঢাকা মহানগর পুলিশের মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া পুলিশ লেখা স্টিকার ব্যক্তি গাড়িতে ব্যবহার নিষেধাজ্ঞার কথা জানিয়ে বলেছিলেন, যানবাহনে পুলিশ, সাংবাদিক, চিকিৎসক, সিটি করপোরেশন, আইনজীবী ইত্যাদি লেখা দেখা যায়। এগুলো কেন? রাস্তায় আমরা সবাই ট্রাফিক আইন মেনে চললে আলাদা স্টিকার লাগানোর কোনো প্রয়োজন নেই। এভাবে কাগজে পেশাগত পরিচয় লিখে গাড়িতে লাগিয়ে চলাফেরা করে তল্লাশি এড়ানোর সুযোগ নিচ্ছে অপরাধীরা। পুলিশ লেখা স্টিকার লাগিয়ে যদি গাড়ি চলে তাহলে দেখা গেল যে ৯৯টা পুলিশের গাড়িতে স্টিকার লাগানো আছে, কিন্তু একজন সন্ত্রাসী সেই সুযোগ নিয়ে তার গাড়িতে পুলিশের স্টিকার লাগিয়ে তল্লাশির বাইরে থেকে অপরাধ সংঘটিত করছে। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, রাহাজানি, জঙ্গি, বোমাবাজি, অস্ত্রবাজির মত ঘটনাও ঘটাতে পারে। সেজন্য আমরা ট্রাফিক পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছি কোনোভাবেই ‘আলগা পুলিশ’ লেখা স্টিকার, ডিএমপি অথবা আইনজীবী, সাংবাদিকসহ এসব স্টিকার দিয়ে কোনো গাড়ি চলাচল করতে পারবে না। এছাড়া জরুরি সার্ভিসে থাকা পরিবহনের গাড়িগুলোতে যেসব সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয়, অনেকেই আবার তা তাদের ব্যক্তিগত গাড়িতে ব্যবহার করছে।
জানা যায়, গত বছর রাজধানীর ওয়ারী এলাকায় এক পুলিশ কর্মকর্তার মোটরসাইকেল নিয়ে এক যুবকের বিরুদ্ধে ছিনতাই কাজে ব্যবহার করার অভিযোগ উঠে। পরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ‘পুলিশের স্টিকার’ লাগানো ওই মোটরসাইকেলসহ ছিনতাইকারী ইমদাদুল আলম সানিকে অস্ত্র ও ওয়াকিটকিসহ গত বছর ১৯ নভেম্বর রাতে গ্রেফতার করে পুলিশ। তার সঙ্গে আসিক মোস্তফা নামে তার এক সহযোগীকেও গ্রেফতার করা হয়। এরপর তাকে রিমান্ডে নিয়ে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করলে চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করে।
সূত্র জানায়, কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী থানার এসআই আসাদুজ্জামান তালুকদারের পরিবার রাজধানীর ওয়ারী ১৭/২/২ কেএম দাস লেনের বাড়ির একটি ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকেন। এজন্য তার মোটরসাইকেলটিও বাড়িটির গ্যারেজে রাখা ছিল। সেই বাড়িতে বসবাসকারী সানি ‘পুলিশ’ লেখা মোটরসাইকেলটি নিয়ে প্রায়ই ছিনতাইয়ের কাজে ব্যবহার করতো। সানির পরিবারের ৫ ভাইসহ প্রায় সবাইকে নিয়েই সেখানে থাকতো। তবে ওই বাড়িতে বসবাসকারী পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে চার ভাইয়ের বিরুদ্ধে ফ্ল্যাট দখল, ছিনতাই ও মাদক ব্যবসাসহ নানা অপকর্মের অভিযোগ রয়েছে। আর প্রত্যেকের বিরুদ্ধেই একাধিক মামলা রয়েছে।
মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানান, আগে অন্য একটি মোটরসাইকেল নিয়ে ছিনতাই করত সানি। কিন্তু ওই মোটরসাইকেলের কাগজপত্র ঠিক না থাকায় ২০১৭ সালের ১ আগস্ট ওয়ারী থানা পুলিশ সেটি আটক করে। এরপর এসআই আসাদকে না জানিয়ে তার মোটরসাইকেলটি নিয়ে বেরিয়ে পড়ত ছিনতাইকারী সানি। পরে ওয়ারী থানার মামলার বাদি সুকান্ত বিশ্বাস ২০১৭ সালের ১৯ নভেম্বর রাতে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জানতে পারেন যে, আরকে মিশন রোডের টিকাটুলি ফুটওভার ব্রিজের নিচে ডিবির ছদ্মবেশে দুজন ছিনতাইয়ে লিপ্ত। পরে সেখানে অভিযান চালিয়ে ওয়াকিটকি সেট, একটি সুইচ গিয়ার চাকু ও পুলিশের স্টিকার লাগানো মোটরসাইকেলসহ সানি ও আসিককে গ্রেফতার করে।
এ ব্যাপারে ঢাকা মহানগর পলিশের জনসংযোগ বিভাগের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার ইউসুফ আলী জানান, ব্যক্তিগত গাড়িতে পুলিশ লেখা ‘আলগা স্টিকার’ লাগানো অন্যায়, আর এজন্যই তা ব্যবহার করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আর এই নিষিদ্ধ আগেও ছিল এখনও তা বহাল রয়েছে বলে জানান তিনি।

7Shares
আরো পড়ুন :  বিকেলে মহাসমাবেশ :চট্টগ্রামে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নেতারা