চলন্ত বাসে ধর্ষণের মামলা ঘিরে রাজনীতি, ক্ষোভ প্রতিবাদ অব্যাহত

প্রকাশিত

কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি-

 

 

কিশোরগঞ্জে চলন্ত বাসে নার্স শাহিনুর আক্তার তানিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলাটিকে রাজনৈতিকীকরণ করা হচ্ছে। এ মামলাকে কেন্দ্র করে প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে পুলিশকে ব্যবহার করছে স্থানীয় একটি চক্র। মামলায় স্বচ্ছ ভাবমূর্তির যুবক বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আবদুল্লাহ আল মামুনকে আসামি করায় এমন অভিযোগের বিষয়টি এখন সর্বত্র আলোচিত হচ্ছে। সোমবার রাতে ঢাকা থেকে বাড়ি ফেরার পথে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী ও বাজিতপুরের সীমানায় চলন্ত বাসে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হন ঢাকার ইবনে সিনা হাসপাতালের নার্স শাহিনুর আক্তার তানিয়া। স্বর্ণলতা পরিবহনের একটি বাসে এ ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর মঙ্গলবার সকালে একদল বিক্ষুব্ধ লোক বাজিতপুরের পিরিজপুর বাজারে স্বর্ণলতা পরিবহনের বাস, কাউন্টার ও কয়েকটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে। ওই দিন রাতে নিহত তানিয়ার বাবা কটিয়াদীর বাহেরচর গ্রামের গিয়াস উদ্দিন বাদী হয়ে বাজিতপুর থানায় ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় একটি মামলা করেন। মামলায় আসামি করা হয় বাসের চালক গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার সালুয়াটেকি গ্রামের নূরুজ্জামান (৩৯), হেলপার একই উপজেলার বীর উজলি গ্রামের লালন মিয়া (৩২), তাদের সহযোগী ভেঙ্গুরদি গ্রামের আল আমীন এবং বাজিতপুর উপজেলার পিরিজপুর বাজারের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আবদুল্লাহ আল মামুনসহ অজ্ঞাতনামা কয়েকজনকে। পুলিশ সোমবার রাতেই বাসচালক নূরুজ্জামান, হেলপার লালন, তাদের সহযোগী লোহাদি গ্রামের রফিকুল ইসলাম, কটিয়াদী উপজেলার ভোগপাড়া গ্রামের খোকন মিয়া ও বাজিতপুর উপজেলার নিলক্ষ্মী গ্রামের বকুল মিয়া ওরফে ল্যাংড়া বকুলকে গ্রেফতার করে। বুধবার বিকালে তাদের আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন করলে আদালত প্রত্যেকের আট দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে। এদিকে বাজিতপুরের পিরিজপুর বাজারের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আবদুল্লাহ আল মামুনকে এ মামলায় আসামি করায় জনমনে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। গতকাল পিরিজপুর বাজারসহ আশপাশের বিভিন্ন স্থান ঘুরে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক পরিলক্ষিত হয়েছে। এ বিষয়ে সহজে কেউ মুখ খুলতে চাইছেন না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে পিরিজপুর বাজারের এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘মামুনের মতো স্বচ্ছ ভাবমূর্তির যুবককে যেখানে এ মামলায় আসামি করা হয়েছে, সেখানে আমরা সাধারণ মানুষ কতটুকু নিরাপদ!’ তিনি বলেন, ‘আমরা একদিকে যেমন হতাশ, তেমনি আতঙ্কিতও।’ স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে আরও জানা গেছে, ব্যবসায়ী মামুন পিরিজপুর বাজারের ইজারাদার এবং পিরিজপুর দাখিল মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সভাপতি। তাদের পরিবারের বেশ সুনাম রয়েছে। মাদ্রাসা কমিটিতে পরাজিত অংশ এবং বৈধভাবে বাজারের ইজারা না পেয়ে একটি চক্র স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় মামুন ও তার পরিবারকে হেয় প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যেই তাকে এ মামলায় আসামি করেছে। এ ক্ষেত্রে পুলিশকে ব্যবহার করা হয়েছে বলেও স্থানীয়দের অভিযোগ। স্থানীয় অন্য একটি সূত্র জানায়, মঙ্গলবার গভীর রাত পর্যন্ত বাদী গিয়াস উদ্দিনকে থানায় বসিয়ে রাখা হয়। এ সময় মামুনকে আসামি করার জন্য বাদীকে বিভিন্নভাবে চাপ দেয় প্রভাবশালী চক্রটি। ভোররাতের দিকে বাদীকে ম্যানেজ করে মামুনকে আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করানো হয়। আর সে কারণেই বিলম্বে মামলাটি রেকর্ড করা হয়। এ ব্যাপারে ব্যবসায়ী মামুনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, সকালে বাজারে ভাঙচুর করার সময় তিনি নিজেই ওসিকে ফোন করে বিষয়টি অবহিত করেন। অথচ তাকেই মামলায় আসামি করা হয়েছে। প্রতিপক্ষের ঘোলা পানিতে মাছ শিকারই এর উদ্দেশ্য বলে তিনি অভিযোগ করেন। এ বিষয়ে মামলার বাদীর সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বলার সময় তাকে কথা বলতে না দিয়ে তার ছেলে বাদল ফোনটি নিয়ে নেন। পরে বাদল বলেন, মামুন স্বর্ণলতা বাস কাউন্টার পরিচালনা করেন। তাই তাকে আসামি করা হয়েছে। অথচ খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাস বা বাসের কাউন্টার পরিচালনার সঙ্গে মামুনের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। এ ব্যাপারে বাজিতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খলিলুর রহমান পাটোয়ারী বলেন, বাদীর কথামতোই এজাহার লেখা ও আসামি করা হয়েছে। পুলিশ সুপার মাশরুকুর রহমান খালেদ বলেন, সঠিকভাবেই মামলার তদন্তকাজ চলবে। অন্যায়ভাবে কেউ আসামি হয়ে থাকলে তাও তদন্ত করে বের করা হবে। শিগগিরই এ ঘটনার রহস্য উন্মোচিত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

বিভিন্ন সংগঠনের মানববন্ধন : তানিয়াকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠেছে কিশোরগঞ্জ। গতকাল বিভিন্ন সংগঠন শহরে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে। বেলা ১১টা থেকে ১২টা পর্যন্ত এ কর্মসূচি পালিত হয়। শহরের রুঙমহল চত্বরে বাম গণতান্ত্রিক জোট মানববন্ধন করে। এতে বক্তারা এ বর্বর হত্যাকান্ডে র দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। এতে বক্তব্য দেন জেলা সিপিবির সভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এনামুল হক, আবুল হাসেম মাস্টার, আবদুর রহমান রুমী, অ্যাডভোকেট হাসান ইমাম রঞ্জু, জেলা বাসদের সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট শফীকুল ইসলাম, অ্যাডভোকেট মাসুদ আহমেদ, জেলা বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা নজরুল ইসলাম শাহজাহান প্রমুখ। এ ছাড়া জেলা নার্সেস অ্যাসোসিয়েশন ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের সামনে ঘণ্টাব্যাপী মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে। তারা সবাইকে রাজপথে নেমে প্রতিবাদ করার আহ্বান জানান। এতে বক্তব্য দেন কিশোরগঞ্জ পৌরসভার মেয়র মাহমুদ পারভেজ, জেলা বিএমএ সাধারণ সম্পাদক ডা. আবদুল ওয়াহাব বাদল, জেলা নার্সেস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আবদুস সালাম ভূঁইয়া, সাধারণ সম্পাদক ওমর ফারুক প্রমুখ। শহরের কালীবাড়ি সড়কে মানববন্ধন করে মহিলা পরিষদসহ বিভিন্ন সংগঠন। পৃথক মানববন্ধন থেকে বক্তারা নারীদের নিরাপত্তা জোরদার করা এবং ধর্ষণ ও হত্যাকান্ডে র মতো অপরাধের ক্ষেত্রে দ্রুত বিচারের দাবি জানান।