বড় সাংবাদিক এবং বড় পত্রিকার প্রচার সংখ্যা নিয়ে আষাঢ়ে গল্প !

প্রকাশিত

তুহিন সারোয়ার,চ্যানেল সিক্স-

আষাঢ়ে গল্প, ছেলেবেলায় স্কুলে প্রবাদ প্রবচনে আমরা সবাই পড়েছিলাম । তখন অর্থ বুঝতে না পারলেও বড় হবার পর সাংবাদিক হয়ে কত আষাঢ়ে গল্প শুনেছি এবং চাক্ষুক দেখেছি আষাঢ়ে গল্পকারদের । বিশেষ করে সাংবাদিকতায় তো বহু আষাঢ়ে গল্পকার রয়েছেন।  যাদের গল্প শুনলে আকাশ থেকে পড়বেন না মঙ্গল গ্রহে চলে যাবেন সিদ্ধান্ত নিতে কষ্ট হবে। আমার এক  সিনিয়র কলিগ ছিলেন কথায় কথায় হাতি ঘোড়া মারতেন। মন্ত্রীদের সঙ্গে আড্ডা দেয়ার গল্প অফিসে প্রায়ই শোনাতেন। তার গল্পশুনে মনে হতো ‘ইস্ মন্ত্রীদের সঙ্গে তার এত ভাব অথচ ১৫০০শ টাকার মাসিক বেতনে বেচারা কত কষ্ট করে সাংবাদিকতার চাকরি করছেন। অন্য কিছু করলেই তো পারেন।’তিনি মাঝে-মধ্যে গল্প শোনাতেন কোন ব্যাংকের কোন এমডি তার সরাসরি ক্লাসমেট, কে ডিনারে রোজ দাওয়াত করেন। লোন পাওয়া কোনো ব্যাপার না। ফোন করলে ব্যাংকের লোক বাসায় এসে লোন দিয়ে যাবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর তার কত কাছের। তার এসব ‘আষাঢ়ে গল্প’আমরা বেশ উপভোগ করতাম।

কদিন হলো সাংবাদিক বন্ধুদের ফেসবুক ওয়ালে একটি তালিকা দেখে আমার আষাঢ়ে গল্পের কথা মনে পড়ে গেল। তালিকাটি হলো চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের দৈনিক পত্রিকার প্রচার সংখ্যা ও ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়ন সংক্রান্ত। গত ১৬ সেপ্টেম্বর তালিকাটি প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে ফেসবুকের দেয়ালে দেয়ালে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সাংবাদিকরা নানা মন্তব্য করছেন, সমালোচনা করছেন। এই তালিকা প্রকাশের পর অনেক সাংবাদিক যে ক্ষুদ্ধ সেটা তাদের মন্তব্য থেকে বোঝা যাচ্ছে। কেউ বলছেন, মিথ্যাচারের একটা শেষ আছে,  কেউ বলছেন পত্রিকা অফিসগুলোতে দুদকের তদন্ত করা উচিত, কেউ বলছেন, যে পত্রিকার প্রচার সংখ্যা  এক লাখ ৬০ হাজারের ওপরে এবং অষ্টম ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়িত হয়েছে সেই পত্রিকার সাংবাদিকরা তিন মাস ধরে বেতন পাচ্ছেন না। অনেকেই তো বলেছেন, এসব মিথ্যাচারের কারণে সাংবাদিকদের পাবলিক আর বিশ্বাস করেনা, পরিচয় দিতে ঘেন্না হয়।

এমন অনেক কড়া আর তেঁতো মন্তব্য পাওয়া যাবে ওই পোস্টের নিচে। যা পড়ে আপনি সাংবাদিক হিসেবে বিব্রত হবেন।

 

 

আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, আমি সর্বশেষ যে পত্রিকায় কাজ করতাম সেখানে আমার কোনো নিয়োগপত্র ছিল না। আমার পরিচয় পত্রে লেখা ছিল সিনিয়র রিপোর্টার। বেতন বাড়তে বাড়তে হয়েছিল ১৮ শ টাকা। তালিকায় দেখলাম ওই পত্রিকার প্রচার সংখ্যা এক লাখের ওপরে। ৯০০ টাকা কলাম ইঞ্চি সরকারি বিজ্ঞাপন ছাপছে তারা। আর দেখা গেল পত্রিকাটি অষ্টম ওয়েজ বোর্ড পুরোপুরি বাস্তবায়ন করেছে। পত্রিকাটি কাকে কত বেতন দেয় সেটা ঈদের সময় বোনাস তুলতে গেলে হিসাব বিভাগের তালিকা দেখে বোঝা যেতো। সে প্রসঙ্গে যাবো না। তবে ওই পত্রিকায় কাজ করার সময় তো প্রেসেও কয়েকবার গিয়েছি, পত্রিকা উৎপাদন আর সার্কুলেশন বিভাগের দায়িত্বে যিনি ছিলেন তিনিও তো আমাকে জানিয়েছিলেন, পত্রিকা ছাপা হয় বড় জোর ৫ থেকে ৬ হাজার। এবার বোঝেন আষাঢ়ে গল্প কাকে বলে।

তালিকার দিকে যদি তাকান তাহলে দেখতে পাবেন, বাংলাদেশ প্রতিদিন ছাপা হচ্ছে ৫লাখ ৫৩ হাজার ৩০০ কপি, প্রথম আলো ৫ লাখ ১ হাজার ৮০০ কপি। এগুলোর প্রচার সংখ্যা নিয়ে তেমন প্রশ্ন হয়তো অনেকেই করেন না। কিন্তু তালিকার একটু নিচের দিকে তাকান, ভোরের কাগজ এক লাখ ৬১ হাজার ১৬০ কপি, জনকণ্ঠ দুই লাখ ৭৫ হাজার, সমকাল ২ লাখ ৭১ হাজার, আমাদের সময় ২ লাখ ৭০ হাজার, মানবকন্ঠ ১ লাখ ৬১ হাজার ১৫০ কপি। এরা সবাই অস্টম ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়ন করেছে।

ভোরের পাতা পত্রিকার সার্কুলেশন দেখানো হয়েছে এক লাখ ৫১ হাজার ২১০ কপি। পত্রিকাটি আপনার চোখে পড়ে কিনা আমি জানি না।

আষাঢ়ে গল্পের শুরুটা কিন্তু এখানেই। এতো পত্রিকার সার্কুলেশন? এত পাঠক। এত জনপ্রিয় প্রিন্ট মাধ্যম? এসব পত্রিকা কর্তৃপক্ষ অষ্টম ওয়েজ বোর্ড  বাস্তবায়ন করেছে? তাহলে মাসের পর মাস আষাঢ়ে গল্পকাররা বেতন পাচ্ছেন না কেন? কেন সাংবাদিকদের অনেকেই প্রতিদিন ফোন করে জানান, ভাই আর পারছি না একটা অন্য কোনো জব দেখেন।

এই আষাঢ়ে গল্পের প্রণেতারা কিন্তু মহা সুখেই আছেন। শূন্য শুল্কে কাগজ পাচ্ছেন, সরকারি ৯০০ টাকা ইঞ্চিতে সরকারি বিজ্ঞাপন ছেপে বছরে কোটি কোটি টাকা পকেটে ভরছেন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সফর সঙ্গী হচ্ছেন। পাঁচ তারকা হোটেলে বহুজাতিক কোম্পানির টাকায় সেমিনার করছেন। প্রেসক্লাবে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার জন্য বক্তব্য দিচ্ছেন। বেতন চাইলে অনেককে চাকরিচ্যুত করা ও লাঞ্চিত করার অভিযোগও পাওয়া যায়।