ঘরে বউ আছে বাইরে কোন গার্লফ্রেন্ড নেই, এ যেন লজ্জাকর ব্যাপার !

প্রকাশিত

Sharing is caring!

তুহিন সারোয়ার-

বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে পরকীয়া হয়ে দাঁড়িয়েছে এখন একটা ফ্যাশন। ঘরে বউ আছে কিন্তু বাইরে কোন গার্লফ্রেন্ড নেই, এ যেন লজ্জাকর একটা ব্যাপার। যার যত গার্লফ্রেন্ড, বন্ধু মহলে তার তত পরিচিতি ও সম্মান। গার্লফ্রেন্ড থাকাটাই যেন পৌরুষত্বের পরিচয়। বন্ধু-বান্ধব, পাড়া-প্রতিবেশী তো দূরের কথা, ঘরের বাবা-মা, বিবাহিত স্ত্রী এমনকি নিজ সন্তানদের কাছেও এই কথা আর গোপন নয়। কারণ একটাই, ঘরে শান্তি নেই।

আগে এমন একটি সময় ছিল, যখন দেবর-ভাবীর মুখরোচক গল্প কিংবা রহিমের বউয়ের সাথে পাশের বাড়ির করিমের মধুর পরকীয়ার কিচ্ছা, দৈনিক পত্রিকাগুলোর কাটতি বাড়াত। কিন্তু এখন আর পরকীয়ার কিচ্ছা মানুষকে আকর্ষণ করে না। এ যেন দৈনন্দিন জীবনের ডাল-ভাতের মতোই স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। আগে যা হতো গোপনে, আড়ালে-আবডালে, এখন তা ঘটছে প্রকাশ্যে। বর্তমান সমাজের পরকীয়া প্রেমের পথচলাটাও বেশ রোমাঞ্চকর। প্রথমে দেখা সাক্ষাৎ, এক ফালি মুচকি হাসি, নির্ভৃতে ফিসফাস। প্রথমে হাতে হাত, পরের ধাপে কাঁধে হাত। সাহস বাড়ার পর হাতের ভ্রমণ। তারপর ঠোঁট। প্রথমে সর্প ছোবল। তারপর কচ্ছপের কামড়। পরকীয়া প্রেম মানেই হাত আর ঠোঁটের নির্বিচার ব্যবহার। এতো হলো বাহিরের খেলা। আর ইন্ডোর গেমসে হৃদয়ের লাফালাফি, তিরবির করা। উত্তেজক অঙ্গ কল্পিত হয় ফরফর করে যে কল্পনের উত্তেজক ঢেউয়ে পরবর্তীতে নিশ্পাপ  সংসার দুমড়ে-মুচড়ে পড়ে।

তারাপদ রায়ের একটি রম্য রচনায়  শুনেছি ,প্রেমিকা তার প্রেমিককে বলছে ‘তুমি সত্যি বলো বিয়ের পরেও তুমি আমাকে একই রকম ভালবাসবে? তুমি কিযে বলো, তুমি কি জান না যে, বিবাহিত মহিলাদেরই আমি বেশি পছন্দ করি?

পরকীয়া প্রেম অবশ্য আধুনিক ব্যাপার নয়। যেদিন থেকে বিবাহ নামক প্রাচীন প্রতিষ্ঠানটির সূচনা হয়েছে তার পরদিন থেকে পরকীয়া শুরু। বিষয়টি মহাভারতের কৃষ্ণলীলার চেয়ে অনেক পুরনো। সংস্কৃত শ্লোকে নির্দেশ রয়েছে পরস্ত্রীকে মাতৃবৎ দেখার কিন্তু সামাজিক অনুশাসন বিশেষ করে পুরান সাহিত্য ও ধর্মগ্রন্থে পরকীয়াকে প্রায় মেনে নেয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে সমাজ যেন কিছুটা উদাসীন ছিল। প্রাতঃস্মরণীয় যে, পঞ্চসতিতার মধ্যে সীতা ছাড়া কেহই এক বল্লভ নয়। দ্রোপদীর পঞ্চস্বামী বরং তৎসহ শ্রীকৃষ্ণ: তারা এবং মন্দোদয়ী দু’জনেই দেবর বিবাহ করেছিলেন, ব্যাপারটা অকন্য অশাস্ত্রীয় ছিল না। অহল্যার ঘটনাটা খুবই গোলমেলে রীতিমত ব্যভিচার।

গণমাধ্যমে পরকীয়ার এই চাঞ্চল্যেকর বিব্রতকর এবং বেসামাল সংবাদ শিরোনামগুলো নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনই পরকীয়ার বলি হয়েছিল মীরপুরের আয়েশা আক্তারের দুই অবুঝ সন্তান, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রটোকল অফিসার মিসেস আয়শা আফসারী ও তার স্বামী জহরুল হক। পরকীয়ার কারণে নিয়তির নির্মম শিকার হয়েছিলেন নাট্যাভিনেত্রী ও বিটিভি’র উপস্থাপিকা তনিমা আবিদ আইরিন। মডেল তারকা তিন্নিও রেহাই পাননি পরকীয়া প্রেমের বিষাক্ত থাবা থেকে। পরকীয়ার দংশন যে কত বিষাক্ত মানুষ তা বুখে না- ‘কভু আশীবিষে, বুঝিবে সে কিসে, দংশিনে যারে’? এই দংশনে বিষাক্ত এবং বিকলাঙ্গ হয়েছে ঢাবি’র পরিসংখ্যান বিভাগের এক শিক্ষকের এবং খুলনা ভার্সিটির প্রফেসর সাইফুলের পরিবার। বলির পাঁঠার তালিকায় যুক্ত হয়েছে-বা এতিম হয়েছে-পবন-পায়েল, তানহা, রজনী আক্তার, আবু রায়হান এবং আরও নাম না জানা অনেক শিশু। গত কয়েক বছরে এই পরকীয়ার জন্য কতজন …নিজের সন্তানকে ফ্রিজে রেখে দিয়েছে, বস্তায় ভরে রেখেছে, বালিশ চাপায় মেরেছে তার কোন ইয়ত্তা নেই। এই শিশুরা কী জানত ওদের মা-বাবার ভুল পথে চলার কারণে পরমাত্মীয়দের সকল আদর, ভালবাসা, স্নেহ-মায়া মমতা ছেড়ে এই দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে হবে? ওরা কী জানত ওদের মমতাময়ী মা, পরম আত্মীয় বাবা ওদের ছোট্ট কচি প্রাণ কেড়ে নিবে? গুটি কতক নষ্ট নর-নারীর কারণে সমাজ হয়ে উঠছে বিষাক্ত। এদের সংখ্যা অসংখ্য, অগণিত। শুধু নাম দিয়ে এদের শ্রেণী বিন্যাশ করা যাবে না। তাই নয়, পরকীয়ার টানে লাল টুকটুকে সন্তান ফেলে, জীবন সঙ্গীর সকল

আমেরিকায় আর্নল্ড শোয়ার্জনেগার, নিউট গিংরিচ, বিল ক্লিন্টন  কিংবা বাংলাদেশে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ কিংবা হুমায়ূন আহমেদ যখন পরকীয়া করতে চেয়েছে, তারা সেটা করতে পেরেছে, কারণ নারীরাও তাদের মতো যশস্বী কিংবা ‘হাই স্ট্যাটাসের’ কেউকেটাদের সাথে সম্পর্ক করতে প্রলুব্ধ হয়েছে। নারীর আগ্রহ, অনুগ্রহ কিংবা চাহিদা ছাড়া পুরুষের পক্ষে পরকীয়া করা সম্ভব নয়, এটা বলাই বাহুল্য। সন্দেহ এবং সরলতা ও যে অনেক সময় পরকীয়ার আশ্রয় হিসাবে কাজ করে তা এই গল্পে জানা যায়। একজন কর্মচারী যিনি ভীরু এবং স্বামী হিসাবে ভালো মানুষ ক্লান্তিবোধ করছেন অফিসে বসে। বসের অনুপস্থিতিতে অফিস ছুটির আগে বাসায় ফেরার ভয়  পাচ্ছেন, তথাপি সহকর্মীর পরামর্শে সংশয়াকুলচিত্তে কর্মচারীটি গৃহপানে রওনা হলেন। তার আধা ঘণ্টা পরেই ভয়ে দৌঁড়ে এসে অফিসের সহকর্মীকে বললেন, ‘‘আজ চাকরি খোয়াতাম। সহকর্মীর জবাব। জানালার ফাঁক দিয়ে ঘরের মধ্যে উঁকি দিয়ে দেখি বড় সাহেব বিছানায় শোয়ে বউয়ের সাথে হাসাহাসি করছে। ভাগ্যিস বস আমাকে দেখেনি।’’

তবে সেই সব পরকীয়া খেলোয়াড় যারা বিশ্বপ্রেমিক, যারা বিপরীত লিঙ্গের প্রাণী দেখলেই গদগদ হয়ে প্রেমে পড়েন তাদের প্রতি অনুরোধ নিজের লাইফপার্টনারের সাথে মাঝেমধ্যে দু’একটা রসিকতা করবেন, নাড়িকে নারীর টানেই রাখবেন পরকীয়ার টানে না ঢলে, বন্ধন সুদৃঢ় রাখার সকল রসদ সরবরাহ নিশ্চিতে রাখবেন। রাষ্ট্র নিশ্চিত করবে ‘শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিকতা বিষয়ক শিক্ষা, গণমাধ্যমে সুষ্ঠু প্রচারযোগ্য অনুষ্ঠান ও পারিবারিক মূল্যবোধ তৈরির ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ। অন্যথায় পাশ্চাত্যের মতো আমাদের দেশেও পারিবারিক সম্পর্ক ভাঙনে ষোলকলা পূর্ণ হবে ।

লেখক- তুহিন সারোয়ার, সাংবাদিক, রম্য লেখক 

বাংলাদেশ কন্ট্রিবিউটর,হিন্দুস্তান টাইমস-( ইন্ডিয়া)

চেয়ারম্যান-চ্যানেল সিক্স 

সম্পাদক- দৈনিক এই দেশ