অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে আজ অগ্নিপরীক্ষা ইংল্যান্ডের

প্রকাশিত

Sharing is caring!

ইংল্যান্ডের এজবাস্টনে বিশ্বকাপ ক্রিকেটের দ্বিতীয়  সেমিফাইনালে আজ মুখোমুখি হবে দুই চিরপ্রতিদ্ব›দ্বী অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ড। ওয়ানডে বিশ্বকাপের শেষ নয় আসরে অস্ট্রেলিয়া পাঁচবার জিতেছে। অন্য দিকে ১৯৯২ আসরের সেমিফাইনালের পর থেকে প্রতিযোগিতায় আর কোনো নকআউট ম্যাচে জিততে পারেনি ইংল্যান্ড। তাই অগ্নি পরীক্ষার এ ম্যাচে দীর্ঘ চার বছরের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে ইংলিশদের।
২০১৫ সালের বিশ্বকাপের প্রথম রাউন্ড থেকে দুর্ভাগ্যজনক ভাবে বিদায় নিতে হয়েছিল ইংল্যান্ডকে। এমন হতাশাজনক ঘটনাটি দলের ওয়ানডে ম্যাচের ধরন নিয়ে নতুন করে চিন্তাভাবনা করতে বাধ্য করেছিল ইংল্যান্ডকে। যাতে তারা সফলও হয়েছে। মূলত এরপর ওয়ানডেতে নিজস্ব ঘরানার ক্রিকেট খেলতে শুরু করে ইংলিশরা। এরপর অস্ট্রেলিয়ার ট্রেভর বেলিস কোচের দায়িত্ব নিয়ে প্রথমবারের মত ইংল্যান্ডকে বিশ্বকাপের শিরোপা এনে দিতে শুরু থেকেই ছক কষা শুরু করেন। এতে দলের পরিবর্তনটাও এসেছে চোখে পড়ার মত। ইয়োইন মরগানের দারুন নেতৃত্বে ওয়ানডে র‌্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ স্থান দখল করে ইংল্যান্ড। দুই ওপেনার জেসন রয় ও জনি বেয়ারস্টোর দারুণ নৈপুন্যে বড় রান সংগ্রহকে আবর্তন করেই ইংলিশরা এগিয়ে গেছে। এখন তাদের চাওয়া সেমিফাইনাল নয় শিরোপা। ইংল্যান্ড ফাইনালে উঠতে পারলে বিনা মূল্যে বৃটেনে ম্যাচটি সম্প্রচার করবে বলে ঘোষণা দিয়েছে স্বাগতিক স্যাটেলাইট সম্প্রচারক স্কাই স্পোর্টস। অন্যতম ফেভারিট হিসেবে টুর্নামেন্ট শুরু করে দুই দলই। পয়েন্ট তালিকার দুই নম্বারে আছে অজিরা। তিন নম্বারে অবস্থান করছে ইংলিশরা।
এবারের বিশ্বকাপে উদ্বোধনী ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার মুখোমুখি হয় ইংল্যান্ড। সেই ম্যাচে প্রোটিয়াদের ১০৪ রানের বিশাল ব্যবধানে হারিয়ে দুর্দান্তভাবে আসর শুরু করে স্বাগতিক ইংল্যান্ড। তবে দ্বিতীয় ম্যাচে ঘটে ছন্দপতন। পাকিস্তানের কাছে ১৫ রানে হেরে যায় ইংলিশরা। তবে ছন্দে ফিরতে বেশি সময় নেয় দলটি। তৃতীয় ম্যাচে বাংলাদেশকে উড়িয়ে দেয় ১০৬ রানের ব্যবধানে।
এরপর ওয়েস্ট ইন্ডিজকে আট উইকেটে হারিয়ে পয়েন্ট টেবিলে সুবিধাজনক অবস্থায় চলে যায় ইয়োন মরগানের দল। আফগানিস্তানের বিপক্ষে ১৫০ রানের ব্যবধানে সহজ পায় তারা। নিজেদের ষষ্ঠ ম্যাচে এসে আন্ডারডগ শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ২০ রানে হেরে বসে ইংল্যান্ড। আর তাতেই টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল স্বাগতিকদের। এরপর  অজিদের কাছেও হার মানে তারা। তবে পরের দুই ম্যাচে ভারতকে ৩০ রানে ও নিউজিল্যান্ডকে ১১৯ রানে হারিয়ে লিগ টেবিলে তৃতীয় স্থানে থেকে সেমিফাইনাল নিশ্চিত করে ইংল্যান্ড।
অন্যদিকে দারুণ ধারাবাহিকতায় টুর্নামেন্ট শুরু করে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়া। প্রথম ম্যাচেই আন্ডারডগ আফগানিস্তানের বিপক্ষে জয় পায় অজিরা। ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ১৫ রানে হারিয়ে জয়ের ধারা অব্যাহত রাখে দলটি। তবে নিজেদের তৃতীয় ম্যাচে ভারতের কাছে ৩৬ রানে হার মানে অজিরা। পরের ম্যাচেই পাকিস্তানকে ৪১ রানে হারিয়ে জয়ের ধারায় ফেরে দলটি। শ্রীলঙ্কাকে ৮৭ রানে উড়িয়ে দেয় অস্ট্রেলিয়া। বাংলাদেশের বিপক্ষে ৪৮ রানের জয় নিয়ে ছন্দ ধরে রাখে অ্যারনফিঞ্চের দল। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইংল্যান্ডকে ৬৪ রানের বড় ব্যবধানে হারিয়ে সেমিফাইনাল নিশ্চিত করে অজিরা। সেমিফাইনালের পথে নিউজিল্যান্ডকে ৮৭ রানে হারালেও লিগ পর্বের শেষ ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে ১০ রানে হেরে যায় অস্ট্রেলিয়া। ফলে ১৪ পয়েন্ট নিয়ে পয়েন্ট টেবিলের দ্বিতীয় স্থানে থেকে লিগ পর্ব শেষ করে অজিরা।
রেকর্ড অনুযায়ী বিশ্বকাপে সর্বশেষ সাত আসরের কোন সেমিফাইনালেই হারেনি অস্ট্রেলিয়া। তবে ২০ বছর আগে এজবাস্টনে দক্ষিন আফ্রিকার সঙ্গে টাই করেছিল তারা। যদিও রান রেটে এগিয়ে থাকার কারণে ওই ম্যাচ থেকে ফাইনালের টিকিট পায় অস্ট্রেলিয়া। এবারো মানসিকভাবে এগিয়ে রয়েছে অস্ট্রেলিয়া। কারণ চলমান টুর্নামেন্টের গ্রুপ পর্বে গত মাসে লর্ডসে তারা এ্যাশেজ প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ডকে ৬৪ রানে অজিরা। দুই পেসার বাঁ-হাতি জেসন বেহরেনডর্ফ ও মিচেল স্টার্কের ভাগাভাগি করে ৯ উইকেট শিকারের পর অধিনায়ক এ্যারন ফিঞ্চ ইংলিশ বোলারদের চোখ রাঙ্গানিকে উপেক্ষা করে ব্যাট হাতে তুলে নিয়েছেন শতক।
ম্যাচটিতে অবশ্য ইংলিশ দলের হয়ে খেলতে পারেননি তাদের সৌভাগ্যবান’ ক্রিকেটার জেসন রয়। হ্যামস্ট্রিং ইনজুরির কারণে বিশ্রামে থাকতে হয়েছে তাকে। তবে সুস্থ হয়ে তার ফেরার পরই বদলে যায় ইংল্যান্ড দলের চেহারা। পরের দুই ম্যাচে ভারত ও নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে দুটি গুরুত্বপুর্ন জয় এনে দিয়েছেন তিনি। যার সুবাদে শেষ চার নিশ্চিত হয় স্বাগতিক দলের। পক্ষান্তরে ২০০১ এ্যাশেজ টেস্টের পর এজবাস্টনে কোন ফরমেটের ক্রিকেটেই জয় নেই অস্ট্রেলিয়ার।
শুধু তাই নয়, গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে দক্ষিন আফ্রিকার কাছে বিষ্ময়করভাবে ১০ রানে হেরে গেছে তারা। স্টার্ককে মানিয়ে নেয়ার পথ খুঁজতে থাকা ইংল্যান্ডের লক্ষ্য থাকবে অসি টপ অর্ডারের রানের গতিকে প্রতিহত করা। বল টেম্পারিংয়ের অভিযোগে ১২ মাসের নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফিরেই ব্যাটিং তান্ডব শুরু করেছেন অসি ওপেনার ডেভিড ওয়ার্নার। টুর্নামেন্টে এ পর্যন্ত সংগ্রহ করেছেন ৬৩৮ রান। তারপরও ইংলিশ পেসার লিয়াম প্লাকেট মনে করেন ম্যাচে তারা আরো উজ্জিবীত থাকবেন। তিনি বলেন, চার বছর ধরে আমরা ভাল ক্রিকেট খেলছি। র‌্যাঙ্কিংয়ের এক নম্বরে উঠে এসেছি। নিজেদের দিনে আমরা যে কোন দলকেই হারাতে পারব বলে মনে করি।
এদিকে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সর্বশেষ ম্যাচে হ্যামস্ট্রিং ইনজুরিতে পড়েছেন উসমান খাজা। তার পরিবর্তিত হিসেবে পাঁচ বারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের একাদশে ডাক পেয়েছেন পিটার হ্যান্ডসকম্ব। এর মাধ্যমে বিশ্বকাপে সরাসরি অভিষেক ঘটতে যাচ্ছে তার। ব্যাটিং লাইন-আপ শক্তিশালী করতেই হ্যান্ডসকম্বকে ডাকা হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ান কোচ জাস্টিন ল্যাঙ্গার বলেন, আমি তোমাদের কাছে সত্যি কথাই বলতে চাই। অবশ্যই পিটার খেলছে এবং এটা শতভাগ সত্যি। এটা তার প্রাপ্য। প্রাথমিক দলে তার সুযোগ না পাওয়াটা ছিল দূর্ভাগ্য। এই মুহূর্তে দারুন ছন্দে আছে হ্যান্ডসকম্ব। অস্ট্রেলিয়া-এ দলের হয়েও সে ভাল খেলেছে। মিডল অর্ডারে তাকে পেয়ে দলের ভারসাম্য ফিরে এসেছে। ল্যাঙ্গার আরো নিশ্চিত করেছেন খাজার বদলী হিসেবে দলে এসেছেন ম্যাথু ওয়েড। তবে তার জন্য আইসিসির টেকনিক্যাল কমিটির অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া। ল্যাঙ্গার বলেন, ঘরোয়া আসরে ওয়েড দারুণভাবে নিজেকে প্রমান করে চলেছেন। যদি সে দলে সুযোগ পায় তবে অভিজ্ঞতার নিরিখে বলাই যায় তার ব্যপারে আমরা সবাই আত্মবিশ্বাসী।
এদিকে পিঠের ইনজুরিতে ভোগা মার্কোস স্টয়নিস অস্ট্রেলিয়াকে কিছুটা সুখবর দিয়েছেন। নেটে তিনি নিজেকে ফিট প্রমান করেছেন। খালি পায়ে পুরো মাঠ হাঁটেন ল্যাঙ্গার। বিষয়টি নিয়ে ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ল্যাঙ্গার বলেন, বিষয়টি চমৎকার। ম্যাথু হেইডেন ও আমি প্রতি টেস্ট ম্যাচের আগেই এটা করতাম। অনেকটা কুসংষ্কার থেকেই আমরা এটা করতাম। আসলে গত এক বছর আগে অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটের দিকে তাকালে দেখা যাবে কি ভয়ঙ্কর এক পরিস্থিতির মুখোমুখি আমরা হয়েছিলাম। এটা শুধুমাত্র আমাদের ক্রিকেটকে নয়, পুরো দেশকেই প্রভাবিত করেছিল। তবে কঠোর পরিশ্রম করে আমরা আবারো পুরানো জায়গায় ফিরে এসেছি। ভাল ক্রিকেট উপহার দেয়াই এখন আমাদের মূল লক্ষ্য।