দাম নেই চা পাতার, চাষীদের হতাশা

প্রকাশিত

* শ্রমিক মুজুরী ও  কীটনাশকের দামও উঠছে না

* পাতা নিচ্ছে না কারখানাগুলো, সিন্ডিকেটের অভিযোগ চাষীদের

* কম দামে পাতা বিক্রয়, ৩০-৪৫% কর্তনের অভিযোগ

* শ্রমিকদেরও কাটছে অভাব-অনটনে দিন

এস কে দোয়েল,তেঁতুলিয়া (পঞ্চগড়) প্রতিনিধিঃ দেশের উত্তরাঞ্চলের সীমান্তবর্তী উপজেলা তেঁতুলিয়ায় সবুজ চা চাষে বিপ্লব ঘটলেও সম্প্রতি সময়ে সবুজ চা পাতার দাম না থাকায় চরম বিপাকে পড়েছেন ক্ষুদ্র চা চাষীরা। গত কয়েক বছরে দীর্ঘমেয়াদী অর্থকরী ফসলের আশায় অনেকেই বাড়ির আঙিনা, ডাঙ্গা ও পতিত সমতল জমিতে লাগিয়েছিলেন সবুজ চা বাগান। এতে করে অর্থনীতির চাকা ঘুরলেও এখন চা পাতার দাম কমে যাওয়ায় ক্ষুদ্র এই চা চাষে দেখা দিচ্ছে অশনিসংকেত।

চা বাগানের মালিকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, চলতি বছর ধরে চা পাতার দাম হঠাৎ করে কমে যাওয়ায় কারখানাগুলোতে ন্যায্য দামে চা পাতা বিক্রয় করতে পারছেন না তারা। তাদের অভিযোগ, স্থানীয় কিছু অসাধু ব্যবসায়ীরা চা বাগান মালিকের যোগসাজসে কাঁচা চা পাতার মূল্য কমানোর। অন্যদিকে ভারতীয় চা পাতা আমদানির কারণেও চা পাতার দাম কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ জানা যায়। এতে করে ক্ষুদ্র চা চাষীরা পড়েছেন সংকটের মধ্যে।

দীর্ঘদিন ধরেই চা পাতার ন্যায্য মূল্য আদায়ের লক্ষে রাজপথে আন্দোলন করে আসছেন ক্ষুদ্র চা চাষীরা। সড়ক অবরোধ, সড়কে চা পাতা ফেলে করেছেন ক্ষোভ ও প্রতিবাদ। এ নিয়ে জেলা প্রশাসক সাবিনা ইয়াসমীন চা চাষী ও কারখানা মালিকদের নিয়ে বৈঠক করে কেজি প্রতি ২৪.৫০ টাকা নির্ধারণ করলেও তা বহাল থাকেনি। ফের দুদিন পরেই চা চাষীদের কারখানাগুলোতে বাধ্য হয়েই চা পাতা বিক্রি করতে হয়েছে ১০/১৫ টাকায়। এর মধ্যে কর্তন হচ্ছেন সর্বোচ্চ ৩৫-৪৫%। এতে করে লোকসানের মুখে পড়তে হচ্ছে চাষীদের।

 

 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চা শিল্পকে কেন্দ্র করে নতুন কয়েকটি চা কারখানা গড়ে উঠলেও প্রথম প্রথম কয়েকদিন পাতা নিলেও পরে সেগুলো পাতা নেওয়া বন্ধ করে দিচ্ছে। পাতা না নেওয়ার কারণ হিসেবে কারখানাগুলো বলছে, পাতা থেকে উৎপাদিত চা অকশন মার্কেটে দাম না পাওয়ায় পাতা নেয়া যাচ্ছে না। কয়েকদিন আগে কয়েকটি টি কোম্পানীকে পাতা না নিতে বিজ্ঞপ্তি হিসেবে মাইকে প্রচার করতে দেখা যায়।

কারখানায় পাতা না নেওয়া, তার মধ্যে পাতার নি¤œ দাম হিসেব মিলিয়ে চা চাষীদের সার, কীটনাশক ও পাতা কাটার শ্রমিকদের মুজুরীর খরচও উঠছেনা এরকম অভিযোগ বহু চা চাষীর। দর্জিপাড়া গ্রামের আব্দুল করিম, শোয়েব, কামাল, সালাম, কালাম ও আমির আলী, কানকাটা গ্রামের আনোয়ার হোসেন, শাহজাহান আলী, শালবাহান এলাকার হবিবর রহমান হবি ও জামাল উদ্দিনের সাথে কথা বললে তারা জানান, বাগানের চা পাতা বিক্রি করতে পারছি না। কারখানাগুলো পাতা নিচ্ছে না। নিলেও কম দাম, তারমধ্যে পার্সেন্টিজ হিসেবে ৪০-৪৫% পর্যন্ত কেটে নিচ্ছে। এরকম চলতে থাকলে কী করবো বুঝতে পারছি না।

সাহেবজোত এলাকার নজরুল ইসলাম জানান, প্রথম দিকে চা পাতা ভালোভাবে বিক্রি করতে পারলেও এখন দিনের পর দিন কারখানাগুলোতে ঘুরে চা পাতা দিতে পারছি না। ফলে প্রতি মাসে ৩৫-৪০ হাজার টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। আবার সঠিক সময়ে পাতা কাটা না হলে বাগানও নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

এদিকে চা শ্রমিকদেরও জীবনেও দেখা দিয়েছে অভাব-অনটন। চা পাতার দাম না থাকায় অনেক চা বাগানের মালিক শ্রমিকও নিচ্ছেন না ঠিক মত। নিলেও বেতন দিতে পারছেন না। চা শিল্পকে ঘিরে অনেক দিন মুজুরদের কর্মসংস্থান হলেও এখন অনেকেই দিন কাটাচ্ছেন অভাবের মধ্যে। দর্জিপাড়া এলাকার কয়েকজন চা শ্রমিকদের সাথে কথা হলে তারা জানান, আমরা চা বাগানে পাতা কাটি। কেজিতে ৩টাকা দেন মালিকরা। বর্তমানে চা পাতার দাম না থাকা এবং কারখানাগুলো পাতা না নেওয়ায় মালিকরা আমাদের ডাকছেন না। তাই বেকার অবস্থায় কষ্টে দিন যাপন করছি।

চা শিল্পকে ঘিরে অনেকে নতুন চা বাগান করলেও বর্তমান চা পাতার দাম না থাকায় চরম হতাশ হয়েছেন অনেক নতুন চা চাষীরাও। অনেকেই জমি ১৫-৫০ বছরের লিজ নিয়ে নিচু জমি ভরাট করে চা বাগান লাগিয়ে চরম হতাশায় ভুগছেন। অনেকেই চা বাগান উপরে দিয়ে অন্য কোন ফসল ফলানোর চিন্তা করছেন।

কৃষি সম্প্রসারনের তথ্যমতে, তেঁতুলিয়ায় মোট জমি ১৮ হাজার হেক্টর। এর মধ্যে ১৪ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে আবাদ হচ্ছে এই সবুজ চা। দীর্ঘমেয়াদী এ শিল্পকে ঘিরে গড়ে উঠেছে ৮টি টি-এস্টেট, ১৫টি মাঝারি ও ৩০০টি নিবন্ধিত বাগান। চা-কে কেন্দ্র করে এখানে গড়ে উঠেছে ১১টির বেশি চা কারখানা। বেশ কয়েক বছরে চা চাষ করেই ক্ষুদ্র চা চাষীদের স্বাবলম্বী হলেও বর্তমানে চা পাতার দাম না থাকায় চরম হতাশায় ক্ষুদ্র চাষীরা।

এ বিষয়ে নর্দান বাংলাদেশ প্রকল্প ও বাংলাদেশ চা বোর্ডের জেলা প্রকল্প পরিচালক ড.মোহাম্মদ শামীম আল মামুন সংবাদমাধ্যমকে জানান, এ নিয়ে চা বোর্ডের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় কারখানার মালিক ও বাগানের মালিকদের নিয়ে আলোচনা সভা করে ১৬.৫০ টাকা ও ভেজা পাতা ১০ শতাংশ কম নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু কারখানা মালিকরা সেটি বাস্তবায়ন করেনি। কারখানা মালিকদের অজুহাত চা চাষীরা যে পরিমান পাতা সরবরাহ করছে, তা অকশন মার্কেটে দাম না পাওয়ায় অনাগ্রহ সৃষ্টি করেছে। তবে এ সমস্যা অল্পদিনের মধ্যে কেটে যাবে বলে তিনি জানান।