এবারের বন্যায় ৩ হাজারের বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ

প্রকাশিত
বিশেষ প্রতিনিধিঃ বন্যায় দেশের প্রায় ২৪ জেলায় বিভিন্ন পর্যায়ের কমপক্ষে তিন হাজারের বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রায় সবই পানিবন্দি এবং ক্লাস বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এরমধ্যে কোনটি আংশিক আবার কোনটি পুরোপুরি ক্ষতি হয়েছে। আর ১১৯টি প্রতিষ্ঠান আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। আর যেগুলোতে পানি ঢুকেছিল, সেসব প্রতিষ্ঠানের বেঞ্চ নষ্ট পাকা/আধাপাকা ঘরে দেয়ালের আস্তরণ, চুনকাম ও আসবাবপত্র, বই-খাতাসহ স্কুলের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নষ্ট গেছে। অনেক স্থানে স্কুলের মেঝে দেবে এবং মাঠ ও ঘরের মাটি ধসে গেছে। এর বাইরে নষ্ট হয়ে গেছে কোনো কোনো স্কুলের প্রবেশপথের রাস্তাও। এ অবস্থায় বন্যাপ্রবণ অঞ্চলের শিশুদের লেখাপড়া দারুণভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাউশি ও প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রাথমিক বিদ্যালয়, নিম্ন মাধ্যমিক, মাধ্যমিক হাইস্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা আছে। এই সংখ্যা ১ হাজার ৫৫৭টি। সরকারি হিসেবে, নিম্ন মাধ্যমিক, মাধ্যমিক হাইস্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩২ কোটি ৬ লাখ ৫৯ হাজার টাকা। অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রাথমিক পর্যায়ের বিদ্যালয় রয়েছে ১ হাজার ২২৭টি। তবে এ পর্যায়ের ক্ষতির পরিমাণ এখনও পর্যন্ত নিরুপন করতে পারেনি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ নিয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস কাজ করছে। খুব শিগগিরই এ ক্ষতির পরিমাণ নিরূপন করা হবে। তবে বেসরকারি তথ্যমতে, এসব প্রতিষ্ঠানের ক্ষতির পরিমাণ ২৫ কোটি ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর সূত্র জানায়, প্রাথমিকের ক্ষতিগ্রস্ত ১ হাজার ২২৭টি বিদ্যালয়ই পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে কুড়িগ্রামের ১২ উপজেলায় ৫৪০টি, সিরাজগঞ্জের চার উপজেলায় ৭৩টি, বগুড়ার তিন উপজেলায় ৮৩টি, লালমনিরহাটের আট উপজলোয় ৫৪টি, গাইবান্ধার নয় উপজেলায় ২৫৪টি, নীলফামারীর তিন উপজেলায় ১৯টি, রংপুরের দুই উপজেলায় নয়টি, রাঙ্গামাটির সাত উপজেলায় ৩১টি, কক্সবাজারের দুই উপজেলায় ১১৫টি, ফেনীর তিন উপজেলায় ১২টি, সুনামগঞ্জের এক উপজেলায় ছয়টি, বরগুনার এক উপজেলায় দুটি এবং কুমিল্লার এক উপজেলার দুটি বিদ্যালয় রয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) হিসাব অনুযায়ী, মাউশির ৯টি অঞ্চলের মধ্যে মোট ৬টি অঞ্চলের ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তথ্য পাওয়া গেছে।
এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানের ময়মনসিংহে। এই সংখ্যা ৫৭০টি। এ অঞ্চলে ক্ষতির পরিমাণ ১০ কোটি টাকা। রাজশাহীতে ১৩৬টি, ক্ষতি  ১ কোটি ২২ লাখ ৫৫ হাজার টাকা। ঢাকায় ৬৫টি, ক্ষতি ১৩ কোটি ৯০ লাখ টাকা। চট্টগ্রামে ৩৬টি, ক্ষতি ৭৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা। সিলেট অঞ্চলে ২৫২টি, ক্ষতি ১০ কোটি ৮১ লাখ ২০ হাজার টাকা। রংপুরে ৫২৯টি, ক্ষতি ৯ কোটি ৯লাখ ৫০ হাজার টাকা। এর মধ্যে গাইবান্ধায় ৬৫টি, লালমনিরহাটে ৮০টি, কুড়িগ্রামে ১২৭টি, রংপুরে পাঁচটি, সিরাজগঞ্জে ২৭টি, জামালপুরে ১৩২টি, নেত্রকোনায় ৫১টি, সুনামগঞ্জে ২২টি, নীলফামারীতে ৬৩টি, নওগাঁয় ৩৮টি, বগুড়ায় ৩৯টি, রাঙ্গামাটিতে ৬৭টি, কক্সবাজারে ৮১টি, ফেনীর ৪২টি এবং বরগুনার ২১টি মাধ্যমিক স্কুল, কলেজ ও মাদরাসা আংশিক ও পুরোপরি প্লাবিত হয়েছে। বন্যার পানির কারণে এসব প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে তৃতীয় সাময়িক পরীক্ষা চলছে। আর মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজগুলোর ক্লাস বন্ধ রয়েছে।
চলতি বন্যায় ক্ষতির পরিমাণের যে তথ্য নিরূপন করা হয়েছে, এটি আরও যাচাই-বাছাই করা হবে বলে মাউশি ও প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এ ছাড়াও ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। কারণ এখনও বন্যায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা করছে আবহাওয়া অধিদফতর। এর আগে ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয় থেকে শিক্ষা ও প্রাথমিক গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে বলা হয়েছে, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষয়ক্ষতির হিসেব পাঠাতে বলেছে। আর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে শিক্ষা প্রকৌশল বিভাগ জেলার সকল নির্বাহী প্রকৌশলীদের চিঠি দিয়ে বন্যায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষয়ক্ষতির সঠিক হিসাব শিক্ষা প্রকৌশল দফতরে পাঠাতে বলা হয়েছে।
শিক্ষা ও প্রাথমিক গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, ক্ষতিগ্রস্ত ভবন, আসবাবপত্র, ক্লাসরুম মেরামতের পাশাপাশি অতিরিক্ত ক্লাস নিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষতি পুষিয়ে দেয়া হবে। কিন্তু অতিরিক্ত ক্লাস কখন নেয়া হবে সে বিষয়ে কোনো নির্দেশনা দেয়া হয়নি। তবে মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে, স্থানীয় কর্মকর্তারা এ অতিরিক্ত ক্লাসের বিষয়ে নজরদারি করবেন। সূত্র জানায়, বিরাজমান বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে গত ১২ জুলাই দুর্যোগ ব্যবস্থপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত ‘আন্তঃমন্ত্রণালয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সমন্বয় কমিটি’র সভার সিন্ধান্ত অনুযায়ী, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালিকা তৈরি করে গতকাল বৃহস্পতিবার সংশ্লিষ্টদের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।
মাউশির প্রশাসন শাখার একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানের তালিকা আমরা পাঠিয়ে দিয়েছি। পাশাপাশি যেসব প্রতিষ্ঠানে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে- এমন ১১৯টি প্রতিষ্ঠানের তথ্য পাঠানো হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে বিভিন্ন জায়গা থেকে ত্রাণ ও সাহায্যে পৌঁছে দেওয়া হবে বলেও জানান ওই কর্মকর্তা।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ভৌত অবকাঠামো মেরামত করবে দু’টা দফতর। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে ক্ষতিগ্রস্ত ভবন নির্মাণ করবে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতর (ইইডি)। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর ক্ষতিগ্রস্ত ভবন মেরামত করবে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণ করলেও এগুলো মনিটরিং করে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর।
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলী দেওয়ান মোহাম্মদ হানজালা ভোরের ডাককে বলেন, বন্যায় কোন কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভৌত অবকাঠামো ক্ষতি হয়েছে, তার পরিসংখ্যান বের করতে দেশের সব নির্বাহী প্রকৌশলীদের চিঠি দেয়া হয়েছে। জেলাপর্যায়ে অবস্থানরত নির্বাহী প্রকৌশলীরা ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালিকা তৈরি করে আমাদের কাছে পাঠাবেন। পানি নেমে গেলে সেসব প্রতিষ্ঠানের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয় করে মেরামত কাজে হাত দেয়া হবে। তিনি আরও বলেন, মেরামত কাজের জন্য আমাদের কাছে পর্যাপ্ত তহবিল রয়েছে। পানি নেমে গেলেই সে অর্থ দিয়ে মেরামত কাজ শুরু করা হবে। পানি নামার এক সপ্তাহের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো পাঠদানের উপযোগী করা হবে। পাশাপাশি ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বেশি হলে ক্রমাগতভাবে ভৌত অবকাঠামোর উন্নয়ন করা হবে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক এ এফ এম মনজুর কাদির বলেন, বন্যায় সাধারণত চর এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এজন্য এসব এলাকায় স্থায়ী ভবন নির্মাণের পরিবর্তে সহজে স্থানান্তরযোগ্য ভবন তৈরি করা হবে। এসব ভবন নির্মাণে বেশি টাকা খরচ হবে না। তিনি বলেন, সার্বিক বন্যাপরিস্থিতি মাথায় রেখে আমরা প্রতি বছর পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিয়ে থাকি। পানিবন্দি এলাকায় অস্থায়ীভাবে ক্লাস-পরীক্ষা চালিয়ে নেয়া হচ্ছে। এজন্য আমাদের জরুরি তহবিলে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। যা দিয়ে এসব অস্থায়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরি করা হয়।
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. সৈয়দ মো. গোলাম ফারুক ভোরের ডাককে বলেন, সারা দেশে বন্যার কারণে নিম্ন মাধ্যমিক, মাধ্যমিক হাইস্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা মিলিয়ে মোট ১৫৫৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। প্রতিনিয়ত মাঠপর্যায় থেকে বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির আপডেট পাঠানো হচ্ছে। তিনি বলেন, গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত আমরা একটা ক্ষতির হিসেব নিরূপন করতে সক্ষম হয়েছি। তবে এই সংখ্যা আরও বাড়তে কিংবা কমতে পারে বলেও জানান মহাপরিচালক। তিনি আরও বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত ক্লাস নিয়ে শিক্ষার্থীদের পাঠদানের ক্ষতি পুষিয়ে দেয়ার জন্য শিক্ষা কর্মকর্তাদের মাধ্যমে শিক্ষকদের বলা হয়েছে।