ভয়াবহ ডেঙ্গুজ্বরে আতংকিত হবেন না,সতর্ক হোন -মাহবুব হোসেন পিয়াল

প্রকাশিত

মাহবুব হোসেন পিয়াল-   

সরকারি হিসেবেই চলতি বছর সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৯ হাজার ৫১৩ জন, মারা গেছেন ১৪ জন৷ তবে বিভিন্ন গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এই রোগে এখন পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা অর্ধশত ছাড়িয়েছে৷

দেশে বর্তমানে ডেঙ্গু জ্বর মহামারী আকার ধারন করছে। তবে এ জ্বরে আতঙ্কিত না হয়ে প্রতিরোধের বিষয়ে সচেতন হওয়া জরুরি। কিছু কিছু বিষয় জানা থাকলে এ জ্বর প্রতিরোধ করা সম্ভব। আসুন জানি, ডেঙ্গু জ্বর সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য।

এডিস মশা দেখতে কেমন হয়?

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ম্যালেরিয়া ও ডেঙ্গু বিষয়ক কর্মসূচির ব্যবস্থাপক এম. এম. আখতারুজ্জামান জানান ডেঙ্গুর জীবাণু বহনকারী এডিস মশা খালি চোখে দেখে শনাক্ত করা সম্ভব।

“এই জাতীয় মশার দেহে সাদা কালো ডোরাকাটা দাগ থাকে, যে কারণে এটিকে টাইগার মশা বলা হয়।”

এই জাতীয় মশা মাঝারি আকারের হয়ে থাকে এবং এর অ্যান্টেনা বা শুঙ্গটি কিছুটা লোমশ দেখতে হয়।

“এডিস মশার অ্যান্টেনায় অনেকটা দাড়ির মত থাকে। পুরুষ মশার অ্যান্টেনা স্ত্রী মশার চেয়ে অপেক্ষাকৃত বেশি লোমশ দেখতে হয়।”

দেহের ডোরাকাটা দাগ এবং অ্যান্টেনা দেখে এডিস মশা চেনা সম্ভব বলে জানান মি. আখতারুজ্জামান।

আসলে ডেঙ্গু জ্বর কী?

সাধারনত ডেঙ্গুজ্বর একটি মশাবাহীত জ্বর যা এডিস মশার কামড় থেকে মানব দেহে সংক্রমণ ছড়া্য।এটি ডেঙ্গু ভাইরাস যা ব্রেকবোন ফিভার, ও ট্রপিক্যাল ডিজিজ নামেও পরিচিত। ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীকে যেকোন মশা কমড়ালে সেই মশার মাধ্যমে ডেঙ্গু জ্বর ছড়াতে পারে।

ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হলে কি করবেন ?

ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত বেশির ভাগ রোগী সাধারণত ৫ থেকে ১০ দিনের মধ্যে নিজে নিজেই ভালো হয়ে যায়, এমনকি কোনো চিকিৎসা না করালেও। তবে রোগীকে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়েই চলতে হবে, যাতে ডেঙ্গু জনিত কোনো মারাত্মক জটিলতা না হয়। ডেঙ্গু জ্বর আসলে একটা গোলমেলে রোগ, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই লক্ষণ অনুযায়ী চিকিৎসা দিতে হয়। সম্পূর্ণ ভালো না হওয়া পর্যন্ত বিশ্রামে থাকতে হবে। যথেষ্ট পরিমাণে পানি, শরবত, ডাবের পানি ও অন্যান্য তরল জাতীয় খাবার গ্রহণ করতে হবে। খেতে না পারলে দরকার হলে শিরাপথে স্যালাইন দেওয়া যেতে পারে। জ্বর কমানোর জন্য শুধুমাত্র প্যারাসিটামল জাতীয় ঔষধই যথেষ্ট।

এসপিরিন বা ডাইক্লোফেনাক জাতীয় ব্যথার ঔষধ কোনক্রমেই খাওয়া যাবে না। এতে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়বে। জ্বর কমানোর জন্য ভেজা কাপড় দিয়ে গা মোছাতে হবে।

ডেঙ্গু জ্বর থেকে বাচার উপায় জেনে রাখুন 

এডিস মশা বেশির ভাগ সময় দিনের বেলায় কামড়ায় ফলে দিনের বেলায়ই এ রোগে আক্রান্ত হওয়া সম্ভাবনা থাকে। বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা বৃষ্টির পরিষ্কার জল ৪/৫ দিন জমে থাকালে সেটাই এডিস মশা এর বংশ বিস্তারের স্থান।

 

 

এডিস মশা সাধারণত সকাল ও সন্ধ্যায় কামড়ায়। তবে অন্য সময়ও কামড়াতে পারে। তাই দিনের বেলা শরীর ভালোভাবে কাপড়ে ঢেকে বের হতে হবে, প্রয়োজনে মসকুইটো রিপেলেন্ট ব্যবহার করা যেতে পারে।

ঘরের চারদিকে দরজা জানালায় নেট লাগাতে হবে। দিনে ঘুমালে মশারি টাঙিয়ে অথবা কয়েল জ্বালিয়ে ঘুমাতে হবে। শিশুদের মধ্যে যারা স্কুলে যায়, তাদের হাফপ্যান্ট না পরিয়ে ফুল প্যান্ট বা পায়জামা পরিয়ে স্কুলে পাঠাতে হবে। ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীকে অবশ্যই সব সময় মশারির মধ্যে রাখতে হবে, যাতে করে রোগীকে কোন মশা কামড়াতে না পারে।

মশক নিধনের জন্য স্প্রে, কয়েল, ম্যাট ব্যবহারের সাথে সাথে মশার কামড় থেকে বাঁচার জন্য দিনে ও রাতে মশারী ব্যবহার করতে হবে।

আজ যদি এই শহরের সবগুলি মশাকে মেরে ফেলতে পারেন তাহলে সাতদিন পর আর এই শহরে ডেংগি রোগী থাকবেনা৷ কারণ মশা ছাড়া ডেংগির আর কোন বাহক নেই। তাই মশা মারাই এর একমাত্র প্রতিরোধক। হয়ত পুরোটা সম্ভব না৷ কিন্তু অনেকখানিই তো সম্ভব।

সিটি করপোরেশন এর আশায় বসে থাকবেন না৷ নিজের ঘর নিজেই পরিষ্কার করুন। ঘরের কোথাও আবদ্ধ জল আছে কিনা দেখে নিন। থাকলে ধ্বংস করুন। বাড়ির সামনের রাস্তায়, কোনায় কানায় কোথাও খানাখন্দ আছে কিনা দেখুন৷ থাকলে ধ্বংস করুন। টায়ার, জেরিক্যান, খোলা পাত্র থাকলে নষ্ট করুন। ওসব জায়গায় পানি জমেই সেখানে এডিস মশা হয়।

এডিসের প্রজনন ক্ষমতা যত উচ্চই হোক প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস হলে তো নির্বংশ হতে সময় লাগবেনা। রিপেলেন্ট ব্যাবহার করুন। গায়ে মাখাও কিছু ওষুধও পাওয়া যায় সেগুলোও ব্যবহার করতে পারেন। দিনে রাতে মশারি খাটান। যতভাবে নিজেকে রক্ষা করা যায় করুন।

পাড়ায় মহল্লায় তরুন-তরুনীরা গ্রুপ করে মশার প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস করা কাজে নেমে পড়ুন। অনেক বড় একটা কাজ হবে। একটা ক্রাশ প্রোগ্রাম হাতে নিলে এক সপ্তাহের ভেতর ফল পাবেন। যারা করবেন তারাই এই সময়ের শ্রেষ্ঠ দেশপ্রেমিক।

সতর্ক হোন, আতংকিত হবেননা৷ আতংকিত হলে করনীয় কাজটি ভুল হয়ে যাবে। ডেংগির শারীরিক লক্ষণ নিয়ে মাথা ঘামাবেন না। লক্ষণ মিলিয়ে আসলে জ্বর আসেনা সব সময়। এই আউটব্রেকের মৌসুমে জ্বর এলেই, মানে জ্বরের প্রথম দিনেই ডাক্তারের কাছে যাবেন। সিবিসি ও ডেংগি এনএসওয়ান পরীক্ষা করবেন। Dengue NS1 ১-৩ দিনের ভেতর পজিটিভ থাকে। এর সেনসিটিভিটি ৬৬-৭০ ভাগ। তিরিশ ভাগ ডেংগি হবার পরও নেগেটিভ দেখাতে পারে৷ তাই চিকিৎসকের অব্জারভেশনকে গুরুত্ব দিন।

ডেংগি হলেই শিরায় স্যালাইন দিতেই হবে এমন নয়। মুখে আড়াই থেকে তিন লিটার পানি বা খাবার স্যালাইন খেতে পারলে শিরায় না দিলেও চলবে৷ শকের হিসাব আলাদা। বমি, পাতলা পায়খানা হলেও বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। চিকিৎসকের পরামর্শ মতে তখন শিরায় স্যালাইন নিতে হতে পারে।

ডেংগি হলেই হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে তাও না। প্রাইমারি কেয়ার সেন্টার বা আপনার নিয়মিত চিকিৎসকের চেম্বারে গেলেই চলবে। তিনি রক্তের রিপোর্ট, শারীরিক পরীক্ষা, ব্লাড প্রেসার, পালস ইত্যাদি পরীক্ষা করে তবেই সিদ্ধান্ত দেবেন ভর্তি হবেন কি হবেন না৷ নিজে নিজে হাসপাতালে গিয়ে ভর্তি হবার জন্য চেষ্টা করবেন না। হাসপাতালগুলি এমনিতেই ভারাক্রান্ত। সবার হয়ত দরকারও নেই তবু গিয়ে ভর্তি হয়েছে৷ ডাক্তার ভাইদের বলব ন্যাশনাল গাইডলাইন হাতের কাছে না থাকলে আজই সংগ্রহ করুন। স্ট্রিক্টলি ফলো করুন।

লেখক- মাহবুব হোসেন পিয়াল, সাংবাদিক,মানবাধিকারকর্মী ও শিশু সংগঠক,