হজ্বযাত্রীদের ভ্রমন উপযোগী ঐতিহাসিক স্থানসমূহ

প্রকাশিত

মাসুম হাসান, সৌদিআরব থেকে-

মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ ইসলাম ধর্ম প্রবর্তন এবং নবী রাসূল প্রেরণের মূল তীর্থভূমি। তন্মধ্যে সারা মুসলিম দুনিয়ায় সৌদিআরব একাধিক কারণে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে কেননা এই পুণ্যভূমিতেই রচিত হয়েছে ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ নানা ইতিহাস। আর এসব কারণেই এই দেশটিতে রয়েছে ইসলামী ইতিহাসের উল্লেখযোগ্য কতিপয় নিদর্শন যেগুলো ধর্মীয় পরিভ্রমণের উপযোগী বলে সারা পৃথিবীর ভ্রমনপিপাসু মানুষের কাছে বিশেষভাবে আকর্ষণীয়। সৌদিআরবের মক্কা, তায়েফ ও জেদ্দা নগরী ঘুরে তেমন কিছু নিদর্শনই নিম্নে তুলে ধরা হলো। হজ্বযাত্রী হিসাবে যারা সৌদিআরব আসেন তারা প্রত্যেকেই সাধারণত এসব স্থান পরিদর্শন করতে পারেন।

মক্কানগরী

জাবালে নূর বা হেরা পর্বত

মক্কার মসজিদুল হারাম এলাকার কাছে জাবালে নূর বা হেরা পর্বত অবস্থিত। এই পর্বতে ওঠা-নামা বেশ কষ্টসাধ্য বিষয়। অথচ নবী করিম (সা.) এই পর্বতে ওঠা-নামা করেছেন নিয়মিত। তাকে খাবার দিতে হজরত খাদিজা (রা.) নিয়মিত এখানে যাতায়াত করতেন।

হেরা পর্বত

জাবালে নূরের শীর্ষে আরোহণ করতে সময় লাগে সোয়া ঘণ্টার মতো, আর নামতে সময় লাগে আধা ঘণ্টা। শেষ নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এই গুহায় বসে ধ্যান করতেন এবং পবিত্র কোরআন শরিফের প্রথম আয়াত এখানে অবতীর্ণ হয়।

জাবালে সাওর বা সাওর গুহা
আরবি ভাষায় জাবাল মানে পাহাড়, সাওর অর্থ গুহা। হিজরতের সময় মক্কা থেকে মদিনায় যাওয়ার পথে শত্রুর হাত থেকে বাঁচতে হজরত আবু বকর (রা.)-কে নিয়ে সাওর পর্বতের গুহায় আশ্রয় নিয়েছিলেন হজরত মুহাম্মদ (সা.)। তিন দিন তিন রাত তারা এই গুহায় কাটিয়েছেন। শত্রুরা খুঁজতে খুঁজতে চলে গিয়েছিল গুহার খুব কাছে। কিন্তু গুহামুখে মাকড়সার জাল দেখে ফিরে যায় তারা। এটি কাবা শরিফ থেকে তিন মাইল দূরে অবস্থিত।

আরাফা ময়দান
প্রথম মানব হযরত আদম(আ.)কে নামানো হয়েছিল শ্রীলংকার সিংহলে আর বিবি হাওয়া(আ.)কে নামানো হয়েছিল সৌদিআরবের জেদ্দায়। বেহেশত থেকে বিতারনের পর দুনিয়ার বুকে হজরত আদম (আ.) ও হজরত হাওয়া (আ.)-এর পুনঃমিলনের স্থান হলো আরাফা ময়দান।
পবিত্র মক্কা শরীফ থেকে ১৮ কি.মি. দক্ষিণ পূর্ব কোণে আরাফা। হজরত ইবরাহিম (আ.) সহ বহু নবী-রাসূল ও তাদের অনুসারীরা এ ময়দানে এসে আল্লাহর নিকট কান্নাকাটি করেছেন। আরাফা ময়দান পূর্ব-পশ্চিমে প্রস্থে ৪ মাইল এবং দৈর্ঘ্যে ৭-৮ মাইল। এ বিরাট ময়দান সারি সারি নিম গাছে ঢাকা ।

মসজিদে নামিরা
আরাফা ময়দানের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় বস্তু মসজিদে নামিরা। হিজরি দ্বিতীয় শতাব্দীর মধ্যভাগে এটি নির্মিত হয়। আরাফার পশ্চিম সীমানার উপরে এটি অবস্থিত। আরাফার দিনে সম্ভবত রাসূল (সা.) এখানে দাঁড়িয়েই নামাজের ইমামতি করেন। মসজিদটি কয়েকবার পুনঃনির্মাণ এবং বর্ধিত করা হয়। মসজিদটির আয়তন ১১০,০০০ বর্গমিটার। এই মসজিদে রয়েছে ছয়টি মিনার, দশটি ডোম এবং দশটি প্রধান ফটক। এর নির্মাণ শৈলী বড়ই চমৎকার।

জান্নাতুল মোয়াল্লা
জান্নাতুল মোয়াল্লা মসজিদুল হারামের পূর্ব দিকে অবস্থিত মক্কা শরিফের একটি বিখ্যাত কবরস্থান। এই কবরস্থানে কোনো কবর বাঁধানো নয়, নেই কোনো কবরে নামফলকও। এখানে অনেক সাহাবির কবর আছে। আছে নবী করিম (সা.)-এর স্ত্রীদের কবর। এই কবরস্থানে হাজী সাহেবরা জিয়ারতে এসে নিজেদের মতো করে মোনাজাত করে থাকেন। আগে হজ করতে এসে কেউ মারা গেলে এখানে কবর দেওয়া হতো। স্থান সংকুলান না হওয়ায় এখন ভিন্ন কবরস্থানে দাফন করা হয়।

মক্কা জাদুঘর
এই জাদুঘরে আছে সৌদি আরবের প্রাচীন সংস্কৃতি, পোশাক-পরিচ্ছদ, আসবাব, বাদ্যযন্ত্র। আছে আরবি বর্ণমালা বিবর্তনের নিদর্শন। এক কোনায় রয়েছে পানির কূপ, কূপ থেকে পানি তোলার যন্ত্রপাতি। পাশের কক্ষে আছে প্রাচীন ধাতব মুদ্রার সংগ্রহ। মুগ্ধ হওয়ার মতো বেশ কিছু আরবি ক্যালিগ্রাফি আছে একটি কক্ষে। রয়েছে হাতে লেখা পবিত্র কোরআন শরিফ। হজরত উসমান (রা.)-এর আমলের কোরআন শরিফও আছে এই জাদুঘরে। আরও আছে হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সম্পূর্ণ বংশলতিকা। আছে কুরাইশসহ আরবের বিখ্যাত গোত্র ও বংশের পরিচয়।কাবা শরিফের কাছে উমরা মসজিদে যাওয়ার পথে অবস্থিত মক্কা জাদুঘর। এই জাদুঘরে প্রবেশের জন্য কোনো ফি নেই।

প্রশান্তিময় তায়েফ নগরী
ইতিহাস-ঐতিহ্যের শহর তায়েফ নগরী মক্কা থেকে প্রায় ৯১ কিলোমিটার পূর্ব-পশ্চিমে। পথিমধ্যে পড়বে বিশাল উচ্চতার পাহাড়ের সারি যেসব জায়গায় পাথরের পাহাড় কেটে তৈরি করা হয়েছে প্রশস্ত সড়ক। আরো রয়েছে দীর্ঘতম উড়াল সড়ক। সত্যিই অবাক করার মতো দূরদর্শী পরিকল্পনা। কোথাও কোথাও দেখা যায়, কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে কোনো বসতি নেই। শুধুই ধু ধু মরুভূমি। প্রাণীকুলের মধ্যে উট আর দুম্বা। বৃক্ষ বলতে শুধুই বাবলা গাছ। চলতে চলতে একটা সময় আবহাওয়ার তারতম্যেই বুঝা যাবে আপনি তায়েফের কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন। এখনকার পাহাড়ি আঁকাবাঁকা সড়কটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ছয় হাজার ৬৯ ফুট উচ্চতায়। সড়কের পাশে রয়েছে নানা কারুকার্যময় স্থাপনা, উদ্যান, এমিউজমেন্ট পার্ক, কটেজ, রিসোর্ট ও শিষাবার। গাড়ির জানালা দিয়ে নিচে ও উপরে তাকালে বেশ রোমাঞ্চকর অনুভূতি। এটিকে তায়েফের রিং রোড বলা হয়ে থাকে। সড়ক দ্বীপে বানরের দল নিশ্চিন্ত মনে ঘুরে বেড়ায়। এই বানরগুলো এখানকার আদিম অধিবাসী ।

তায়েফের পথে বানর

চারপাশে নির্মল সবুজ আর ধুসর পথুরে পাহাড়ের অপার্থিব ঘোরের মাঝে মাত্র দেড় ঘণ্টার মধ্যেই তায়েফ শহরে পৌঁছানো যায়। কোলাহলহীন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন শহর। শহরের কেন্দ্রস্থলে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) মসজিদ। এটিই তায়েফের কেন্দ্রীয় মসজিদ যা অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন। এর পাশেই প্রসিদ্ধ সাহাবি হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) চিরশায়িত অছেন।

এছাড়াও তায়েফে আছে হজরত আলী রা: মসজিদ। এই মসজিদের প্যাঁচানো সিঁড়ির সুপ্রাচীন দেয়ালের কারুকার্য দেখে পর্যটকেরা অবাক না হয়ে পারে না। শত শত বছর আগের নীর্মাণশৈলী মনকে ভাবুক করে তোলে।

অনতিদূরেই রয়েছে মসজিদে আদম। আঙ্গুরের বাগানের পাশেই মসজিদটি। এরপর সেই কথিত বুড়ির বাড়ি। জায়গাটি পাথর দিয়ে ঘেরা।

বুড়ির বাড়ি

তার পাশেই বড় বড় দু’টি পাথর যেগুলো ছোট্ট পাথর দ্বারা আটকে আছে। হুজুর (সা:)-কে হত্যার উদ্দেশ্যে পাহাড় থেকে এই পাথরগুলো বুড়ি ফেলতে চেয়েছিল। কিন্তু আল্লাহ পাকের কুদরতের মাধ্যমে তা প্রতিহত হয়। ঐ পাথর আজো সেভাবেই রয়েছে।

আটকে থাকা পাথর

আবহাওয়া তাপমাত্রা মক্কায় যখন ৪০-৪২ তখন তায়েফে মাত্র ২৫-২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। মক্কা-মদিনার পর তায়েফ পবিত্রতার গুরুত্বের দিক থেকে তৃতীয়। এর মাটিতে নানান ধরনের ফসলসহ সুস্বাদু সব ফলের আবাদ হয়। বিভিন্ন ফুলের মধ্যে গোলাপও বেশ চাষাবাদ হয়। গোলাপজল তৈরিতে তায়েফের গোলাপের বেশ খ্যাতি রয়েছে।

এক ঝলকে জেদ্দা
জেদ্দা, সৌদি আরবের প্রধান শহরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষনীয়। দেশটির প্রাচীন রাজধানী এবং বাণিজ্যিক রাজধানী জেদ্দা। লোহিত সাগরের তীর ঘেসে এই শহরের অবস্থান।জেদ্দার মত আধুনিক ও মুক্ত আবহাওয়া সৌদি আরবের আর কোন শহরে দেখা যায় না। ভ্রমণকারীদের আকর্ষণের জন্য এই শহরে রয়েছে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ রেড সী আর্কিটেকচার, এর ব্যস্ত মার্কেট, ডাইভিং এর জন্য চমৎকার সমুদ্র সৈকত এবং পৃথিবী বিখ্যাত খাবার মেন্যু।

জেদ্দা সমুদ্র সৈকত:
ইংরেজিতে ‘রেড সি’ আর বাংলায় লোহিত সাগর নাম হলেও এই সাগরের সীমাহীন জলরাশি দেখতে নীল। আর তাই লোহিত সাগর রঙিন সাগরে পরিণত হয়। এ মনোরম দৃশ্য দেখতে হাজার হাজার দর্শনার্থী আসেন এখানে, ছবি তোলেন, পাড়ে বসে আড্ডা দেন।

রেড সি তে সূর্যাস্ত

পাড়ে গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থাও রয়েছে। সড়কের অপর পাশে হেলিপ্যাডসহ বহুতল অট্টালিকা রয়েছে। সপ্তাহের শত কর্মব্যস্ততার মাঝে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে মানুষ খোঁজে একটু বিনোদন। আর এ জন্যই হয়তো সুন্দর করে এ জায়গাটিকে সাজিয়েছে সৌদি সরকার। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মণ্ডিত লোহিত সাগরের তীরকে সাজানো হয়েছে আকর্ষণীয়ভাবে।

সাগরের তীরে বেড়ে ওঠা সারি সারি নারকেল, খেজুর আর বাহারী ফুলের সঙ্গে সবুজ ঘাসের সংমিশ্রণ দেখে কেউ মনে করবে না এটা মরুভূমির দেশ।

ফাতেমা মসজিদ
সমুদ্র সৈকতের কিছু অংশ আর রেড সি এর নীল সাদা ফেনিল জলের উপর কালের সাক্ষী হয়ে দাড়িয়ে আছে ফাতেমা মসজিদ। এই মসজিদে নামাজ আদায় করতে পারা সৈকতে বেড়াতে আসা পর্যটকদের জন্য এক বাড়তি পাওনা।

ফাতেমা মসজিদ

আল বালাদ – বিবি হাওয়া (আ:) এর কবর
জেদ্দা শহরের আল বালাদ এলাকায় বেশ কিছু প্রাচীন কবরস্থান আছে। এর মধ্যে একটি প্রাচীন কবরস্থানের একটি বিশেষ কবরের পাশে লেখা আছে ‘আমাদের সকলের মা হাওয়া’। তাঁর ভিতরে একটি কবর আছে এবং বিশ্বাস করা হয় যে এটি মুসলমানদের আদি মাতা হযরত হাওয়া (আঃ) এর কবর। একসময় এই কবরটি ১২০ মিটার লম্বা, ৩ মিটার চওড়া ও ৬ মিটার উঁচু ছিল। এ থেকেই তখনকার যুগের মানুষের দৈহিক আকৃতির বিশালত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়। কবরটি ক্ষতিগ্রস্ত হবার আগে এর আকার এরকমই ছিল। কিন্তু অনেক যুগ আগেই কবরটির অবস্থার অবনতি হতে থাকে, বিশেষ করে ওহাবিয় আমলে। ওহাবিয়রা মনে করত যে কবরের মত বিষয়কে যত্ন সহকারে সংরক্ষন করার কিছু নাই। তাই অবহলায় ও অযত্নে কবরটি কালের গহ্বরে হারিয়ে যায়।

‘আমাদের সকলের মা হাওয়া’