মাদ্রাসা ছাত্রীকে ধর্ষণের পর হাসপাতালে হত্যার চেষ্টা!

প্রকাশিত

নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি-

নারায়ণগঞ্জে ৮ বছর বয়সী মাদ্রাসা ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে একটি মসজিদের ইমামের বিরুদ্ধে। ধর্ষণের পর ওই মাদ্রাসা ছাত্রীকে শহরের ১০০ শয্যা বিশিষ্ট নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তবে সেখানেও তাকে ও তার বাবার খোঁজ করে মেরে ফেলার চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।

এক পর্যায়ে ওই ছাত্রীর বাবা বাধ্য হয়ে ভয়ে বোরকা পরে র‌্যাব কার্যালয়ে অভিযোগ দেয়। এ খবরে র‌্যাব-১১ এর অভিযানে ওই অভিযুক্ত ইমামসহ আরও পাঁচ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

বুধবার নারায়ণগঞ্জের আদমজীতে অবস্থিত র‌্যাব-১১ এ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয়।

র‌্যাব-১১ এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আলেপ উদ্দিন জানান, মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১০টায় বোরকা পরিহিত অবস্থায় এক ব্যক্তি র‌্যাব অফিসে এসে এই মর্মে একটি অভিযোগ দেয় যে, তার মেয়ে বর্তমানে ভিক্টোরিয়া জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রয়েছে এবং মসজিদের ইমাম কর্তৃক ধর্ষণ করা হয়েছে। ধর্ষণের পর ইমামের অনুসারীরা তার মেয়েকে ও বাবাকে মেরে ফেলার জন্য বার বার হাসপাতালে গিয়ে খুঁজছে। এ ঘটনা শোনার পর তাৎক্ষণিকভাবে র‌্যাব-১১ এর একটি দল ভিক্টোরিয়া জেনারেল হাসপাতালে ছুটে যায়। ভিকটিম ও তার পরিবারের সাথে কথা বলে ঘটনার সত্যতা পেয়ে হাসপাতালে তাদের নিরাপত্তায় নিরাপত্তা চৌকি স্থাপন করে।

এরপর র‌্যাব ঘটনার স্থল পরিদর্শন ও ধর্ষককে গ্রেফতারের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখে। পরে বুধবার সকাল ৬টায় নারায়ণগঞ্জ জেলার ফতুল্লা থানাধীন উত্তর চাষাঢ়া চাঁদমারীস্থ এলাকা হতে ধর্ষক মো. ফজলুর রহমান ওরফে রফিকুল ইসলামকে (৪৫) গ্রেফতার করা হয়।

গ্রেফতারকৃত আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ ও প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা যায়, নির্যাতনের শিকার শিশুটির বয়স ৮ বছর। সে মাদ্রাসায় দ্বিতীয় শ্রেণিতে অধ্যয়নরত। শিশুটি রাতের বেলায় বিভিন্ন প্রকার দুঃস্বপ্ন দেখে কান্নাকাটি করত। বিভিন্ন প্রকার কবিরাজি চিকিৎসা করে ভালো না হওয়ায় ভিকটিমের বাবা জানতে পারে যে, অভিযুক্ত মো. ফজলুর রহমান রফিকুল ইসলাম দীর্ঘদিন যাবৎ ঝাড়ফুঁক ও পানিপরা দেয়। এরই প্রেক্ষিতে ভিকটিমের বাবা ভিকটিমকে এর আগে ২ থেকে ৩ বার ধর্ষক ফজলুর রহমানের কাছে ঝাড়ফুঁক পরিয়ে নেয়। তারপরও তেমন উপকার না হওয়ায় ধর্ষক ফজলুর রহমান ভিকটিমের বাসায় গিয়ে ‘বাড়ি বন্দী’ নামক চিকিৎসা করে নিয়ে আসে।

ঘটনার আগের দিন মাগরিবের সময় ভিকটিমের বাবা ধর্ষক ফজলুর রহমানকে ফোন দিয়ে মেয়ের চিকিৎসার ব্যাপারে যেতে চাইলে সে পরের দিন ফজরের আযানের সাথে সাথে মসজিদে আসতে বলে। কথা অনুযায়ী পরের দিন সকালে ভিকটিমের বাবা মেয়ে শিশুটিকে নিয়ে মসজিদে চলে আসে। ফজরের নামাজের পর ধর্ষক শিশুটি তার বাবাকে নিয়ে মসজিদের ৩য় তলায় ইমামের বেড রুমে নিয়ে যায়। এরপর হালকা ঝাড়ফুঁক করে পরিকল্পিতভাবে ভিকটিমের বাবাকে ভোর ৫টার দিকে এক প্যাকেট আগর বাতি ও একটি মোমবাতি আনার জন্য বাহিরে পাঠিয়ে দেয়। ওই সময় দোকানপাট খোলা না থাকায় শিশুটির বাবা কোনো ভাবেই মোমবাতি ও আগরবাতি কিনতে পারছিলেন না। এর মধ্যে সময় ক্ষেপণ করার জন্য ধর্ষক ফজলুর রহমান শিশুটির বাবাকে ফোন করে একটি পান আনতে বলে ও মসজিদের মোয়াজ্জিনকে ফোন করে নিচের গেটে তালা মারতে বলে।

পরে ভিকটিমের বাবা ফিরে আসতে ৪০ থেকে ৪৫ মিনিট সময় নেয়। এর মাঝে শিশুটির হাত বেঁধে ও মুখে টেপ মেরে নির্মমভাবে পাশবিক নির্যাতন-ধর্ষণ করে। পরে প্রমাণ মুছে ফেলার জন্য মসজিদের ছাদে নিয়ে ওই শিশুকে পানি দিয়ে পরিষ্কার করে দেয়। এরপরে শিশুটির গলায় ছুরি ধরে তার বাবা মাকে না বলার হুমকি দেয় এবং বললে জবাই করে ফেলবে বলে হুঁশিয়ার করে।

এদিকে শিশুটি অসুস্থ হয়ে গেলে তাড়াহুড়া করে তার বাবাকে বুঝিয়ে দিয়ে বিদায় করে দেয়। পরে বাসায় গিয়ে তার বাবা মাকে সবকিছু খুলে বললে এবং ধীরে ধীরে তার শারিরীক অবস্থার অবনতি হওয়া শুরু করলে ভুক্তভোগী পরিবারটি শিশুকে নিয়ে মসজিদে এসে বিচার দিলে মসজিদ কমিটির কিছু সংখ্যক লোক ও আশেপাশের ধর্ষকের কিছু ভক্ত মিলে সেখানেও শিশু ও পরিবারটিকে মারাত্মকভাবে হেনস্থা করে।

ধর্ষক ফজলুর রহমান তার অনুসারীদের দিয়ে এমন একটি পরিস্থিতির সৃষ্টি করে যে, ভুক্তভোগী পরিবারটি যেন থানা বা হাসপাতালে যেতে না পারে। এরপর শিশুটির অবস্থা আরও খারাপ হলে শিশুটিকে নিয়ে শিশুটির পরিবারটি নারায়ণগঞ্জের ভিক্টোরিয়া হাসপাতালে ভর্তি করে। ধর্ষক ফজলুর রহমান ও তার অনুসারীরা শিশুটিকে হত্যা ও অপহরণ করার উদ্দেশে কয়েক দফায় চেষ্টা চালায়।

ধর্ষকের অনুসারীরা হাসপাতালে এমন একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি করে যে শিশুটিকে হাসপাতালে লুকিয়ে রেখে শিশুটির বাবা মাকে দীর্ঘ সময় ধরে হাসপাতালের টয়লেট ও বেডের নিচে লুকিয়ে থাকতে হয়েছে। এরই এক পর্যায়ে শিশুটির বাবা হাসপাতালের নার্স এর বোরকা পড়ে র‌্যাব অফিসে এসে অভিযোগ দেয়।

শিশুটিকে হত্যা করার উদ্দেশে অপহরণের চেষ্টা ও পরিকল্পনার সাথে যুক্ত থাকার অপরাধে ধর্ষকের অনুসারী মো. রমজান আলী, মো. গিয়াস উদ্দিন, হাবিব এ এলাহী হবি, মো. মোতাহার হোসেন ও মো. শরিফ হোসেনকে ফতুল্লার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে গ্রেফতার করা হয়।