চুয়াডাঙ্গার বিভিন্ন সড়কের ওপর গাছ, বিদ্যুৎ ও টেলিফোনের খুঁটি, বিপজ্জনক!

প্রকাশিত

সনজিত কর্মকার, চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি-
চুয়াডাঙ্গাঃ চুয়াডাঙ্গা জেলা শহরের বিভিন্ন মহাসড়কের ওপর বিশালাকার গাছ, বৈদ্যুতিক ও টেলিফোনের খুঁটি থাকায় যান চলাচলে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে যানবাহনের চালকদের। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে রাস্তা প্রশস্তকরণ করা হলেও মিলছে না কোনো সুফল। সেই সঙ্গে রয়েছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি ও রাস্তার টেকসই মান নিয়ে প্রশ্ন। রাস্তা প্রশস্ত হওয়ায় হালকা ও ভারি যানবাহনের চালকেরা একে অপরকে সাইড দিতে গিয়ে কোনো খুঁটি অথবা গাছের সঙ্গে মাঝেমধ্যেই দুর্ঘটনা শিকার হন। তারপরও রাস্তার ওপর থেকে বিপজ্জনক এ সমস্ত গাছ ও খুঁটি সরানোর উদ্যোগ নেই সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর।

সড়ক ও জনপথ বিভাগের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় বিদ্যুৎ বিভাগকে তাদের খুঁটি সরাতে বলা হলে পাল্টা জবাবে তারা ক্ষতিপূরণের দাবি জানায়। তবে এ বছরের মধ্যেই রাস্তা থেকে খুঁটি সরিয়ে নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন চুয়াডাঙ্গা ওজোপাডিকোর নির্বাহী প্রকৌশলী।

ভুক্তভোগীরা বলছেন, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিরা জনস্বার্থে এ কাজ করেননি। বরং তাঁরা প্রশস্তকরণের সময় দায়সারাভাবে কাজ শেষ করেছেন। এ কাজের মান নিয়েও বিভিন্ন সময় প্রশ্ন উঠেছে। সড়ক নির্মাণ বা প্রশস্তকরণের ক্ষেত্রে সঠিক পরিকল্পনা ও সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সমন্বয়হীনতায় এখন দুর্ভোগের মূল কারণ।

এ বিষয়ে চুয়াডাঙ্গার সড়ক বিভাগ, জেলা পরিষদ, পৌরসভা, বিদ্যুৎ বিভাগ ও বিটিআরসির সঙ্গে কথা বলে ভিন্ন ভিন্ন মতামত পাওয়া যায়।

সরেজমিনে দেখা গেছে, চুয়াডাঙ্গা জেলা শহরের শহীদ হাসান চত্বর থেকে আন্তজেলা বাস টামির্নাল পর্যন্ত প্রশস্তকরণ রাস্তার ওপর ও কোল ঘেঁষে বিভিন্ন প্রজাতির অর্ধশতাধিক গাছ রয়েছে। এর মধ্যে রেলবাজারে দুটি ও সদর উপজেলা খাদ্য গুদামের পাশের তিনটি চটকা গাছ রয়েছে প্রশস্তকরণ রাস্তার মাঝখানে। এ ছাড়াও টার্মিনাল-সংলগ্ন সড়কে আরও দুটি গাছ রয়েছে রাস্তার ওপর। মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ আঞ্চলিক এ মহাসড়টির ওপরও কোল ঘেঁষে অন্তত ৪০টি বৈদ্যুতিক খুঁটি রয়েছে। তিনটি জেলার মধ্যকার সংযোগ স্থাপনকারী ব্যস্ততম এ সড়কটিতে নতুন করে আরও ৩০টিরও বেশি বিশালাকার খুঁটি পোতা হয়েছে। একই অবস্থা চুয়াডাঙ্গা শহীদ হাসান চত্বর থেকে কোর্টমোড় হয়ে পুলিশ লাইনস দামুড়হুদা-দর্শনা সড়কের। এ সড়কে তেমন কোনো গাছ না থাকলেও শতাধিক বৈদ্যুতিক খুঁটি ও বেশ কিছু টেলিফোন-সংযোগের খুঁটি রয়েছে প্রশস্ত সড়কের ওপর। এ সড়কগুলোতে ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটতেই থাকে। সড়কগুলোকে আগের অবস্থার চেয়ে দুই গুণ চওড়া করা হলেও সেই আগের মতোই চলতে দেখা যায় যানবাহনগুলোকে। রাস্তা প্রশস্তকরণের সময় এসব গাছ ও খুঁটি রেখেই কাজ শেষ করেছেন ঠিকাদারেরা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাস্তার মধ্যে বৈদ্যুতিক খুঁটি ও গাছ রেখে কাজ করায় টেকসই উন্নয়ন নিয়ে সংশয় আছে। এখনি রাস্তা থেকে এগুলো সরিয়ে না নিলে ওই খুঁটি ও গাছের গোড়া থেকে রাস্তা নষ্ট হওয়া শুররু হবে। যা একসময় রাস্তাটিকে চলাচলের অনুপযোগী করে তুলবে।

কী পরিকল্পনায় রাস্তার ওপর গাছ ও কোল ঘেঁষে বৈদ্যুতিক খুঁটি পোতা হয়েছে, এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চুয়াডাঙ্গা সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আদম আলী দৈনিক জাগরণকে জানান, আমরা যেখানেই নতুন বা পুরাতন রাস্তা তৈরি বা প্রশস্ত করি, তার একটা পরিকল্পনা থাকে। কিন্তু, বিদ্যুৎ বিভাগ আমাদের সঙ্গে কোনো প্রকার যোগাযোগ না করে রাস্তার কোল ঘেঁষে খুঁটি স্থাপন করে। পরবর্তীতে রাস্তা প্রশস্তকরণ করতে গেলে এই খুঁটিগুলো প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। সরানোর কথা বললে তারা আমাদের কাছে লক্ষ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করে। তখন বাধ্য হয়ে সরকারের টাকা সরকারকেই দিতে হয়। আসলে এটা অন্যায়। সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও সমন্বয়হীনতার কারণে সরকারের প্রচুর টাকা অপচয় হয় এই খাতে।

চুয়াডাঙ্গার বিভিন্ন সড়ক প্রশস্তকরণ করার পরও তার সুফল পাচ্ছে না জনগণ এ কথা স্বীকার তরে তিনি আরো জানান, সড়কের মাঝে বৈদ্যুতিক খুঁটি ও গাছ থাকার কারণে প্রশস্তকরণ করেও কোনো সুফল পাচ্ছে না জনগণ। একাধিকবার জেলা উন্নয়ন ও সমন্বয় কমিটির সভায় বিষয়টি উপস্থাপন করা হলে পরবর্তী নির্দেশনা অনুযায়ী তা আর বাস্তবায়ন হয় না। গাছগুলো সরানোর জন্য জেলা পরিষদকে আমরা অনেক বার চিঠি দিয়েছি। বন বিভাগের মাধ্যমে গাছগুলোর পরিসংখ্যান করে তা কাটতে বা সরাতে খরচের হিসাবও জমা দেয়া হয়েছে। যা আজও অনুমোদন হয়নি।

চুয়াডাঙ্গা জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কামরুল আরিফ দৈনিক জাগরণকে জানান, গাছগুলো রাস্তা থেকে সরানো হোক, এটা আমরা সবাই চাই। এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসন, জেলা পরিষদ, সড়ক বিভাগ সকলে আগ্রহী। সবাই জানে আরএস রেকর্ড অনুযায়ী গাছগুলোর মালিক জেলা পরিষদ। কিন্তু, হাল রেকর্ডে অন্য ডিপার্টমেন্টের নাম চলে এসেছে। যে কারণে নিরঙ্কুশভাবে গাছগুলো জেলা পরিষদের মালিকানা দাবি করা যাচ্ছে না। সব মিলিয়ে একটু দীর্ঘায়িত হচ্ছে। তবে এগুলো সরাতে শিগগিরই উদ্যোগ নেওয়া হবে।

চুয়াডাঙ্গা পৌর মেয়র ওবাইদুর রহমান চৌধুরী জিপু জানান, পৌরসভার অভ্যন্তরে থাকা সব সড়ক প্রশস্তকরণ করা হয়েছে। কিন্তু, সড়কের মধ্যে বৈদ্যুতিক খুঁটি ও গাছ থাকায় প্রশস্ত রাস্তার পুরো সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে না। এ ব্যাপারে একাধিকবার বিদ্যুৎ বিভাগ, সড়ক বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে মৌখিকভাবে বলেছি। তারা কোনো উদ্যোগ নেয়নি। অপরিকল্পিতভাবে পোতা বৈদ্যুতিক খুঁটির কারণে বিভিন্ন সময় পৌরসভার প্রকল্পের মাধ্যমে রাস্তা-ড্রেন নির্মাণ করতে গিয়েও আমাদের সমস্যায় পড়তে হয়।

চুয়াডাঙ্গা ওজোপাডিকোর নির্বাহী প্রকৌশলী সবুক্ত গীন দৈনিক জাগরণকে জানান, বৈদ্যুতিক খুঁটির জন্য যদি জনগণ প্রশস্তকরণ সড়কের কোনো সুফল না পেয়ে থাকেন, তবে আমাদের প্রজেক্টের মাধ্যমে খুঁটিগুলো সরিয়ে নেওয়া হবে। ইতিমধ্যে যে সমস্ত খুঁটি রাস্তার ওপর বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা সরাতে সড়ক ও জনপথ আমাদের কাছে আবেদন করেছে। সে মোতাবেক আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি। এ বছরের মধ্যেই রাস্তা থেকে খুঁটি সরানোর কাজ শুরু হবে। এক বছরের মধ্যে সব সড়ক থেকে বৈদ্যুতিক খুঁটি সরিয়ে নেওয়া হবে।

বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন্স কোম্পানি লিমিটেডের (বিটিসিএল) চুয়াডাঙ্গা জেলা অফিসের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী জিল্লুর রহমান জানান, আমরা রাস্তার ওপরে থাকা খুঁটিগুলোর তালিকা করছি। বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ সাপেক্ষে ঈদের পরই তা সরিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু হবে।