শাহরাস্তিতে তরুণী বধূর রহস্যজনক মৃত্যু আত্মহত্যা নাকি পরিকল্পিত হত্যাকান্ড

প্রকাশিত

বিশেষ প্রতিনিধি- শাহরাস্তিতে সৌদি প্রবাসী তৌকির আহমেদ রনির স্ত্রী জান্নাতুন নাঈম সুখী’র রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে। ঈদের আগেরদিন বিকেলে সংগঠিত এ ঘটনাকে ঘিরে নানা গালগল্প ও মুখরোচক কাহিনি ছড়ানো হচ্ছে বলে অভিযোগ নিহতের পরিবারের।
ঘটনার বিবরণে জানা যায়, উপজেলার ওয়ারুক পাটওয়ারী বাড়ির মৃত ইউসুফ পাটোয়ারির ছেলে তৌকির আহমেদ রনি প্রায় ৩ বছর পূর্বে প্রেম করে বিয়ে করেন একই ইউনিয়নের রাড়া গ্রামের মশিউর রহমানের মেয়ে জান্নাতুন নাঈম সুখীকে। বিয়ের দেড় মাস পরেই জীবিকার তাগিদে সৌদি চলে যায় তৌকির। মেধাবী জান্নাত বিয়ের পরেও চাঁদপুর সরকারী কলেজে সমাজকর্ম বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করছিলেন। পড়ালেখার প্রতি তার আগ্রহ ও একাগ্রতা দেখে সকলেই তার ভূয়সী প্রশংসা করতো। পড়াশুনা, স্বামী ও পরিবার নিয়ে সুখে থাকা সুখীর জীবনে কি এমন ঘটনা ঘটেছিলো যাতে জীবনের সমাপ্তি টানতে হয়েছে- এ প্রশ্ন পরিবার, স্বজন ও সহপাঠিদের।
★কি হয়েছিলো সেদিন?
১১ আগষ্ট রোজ রোববার বেলা সাড়ে ৫ টায় জান্নাতুন নাঈম সুখী গলায় ফাঁস দিয়ে আতœহত্যা করেন বলে দাবি করে নিহতের শ্বশুর বাড়ির লোকজন। তাদের মতে, বখাটের উৎপাতে নিজের জীবনকে বিসর্জন দেওয়াটাই শ্রেয় মনে করে আতœহত্যার মতো জঘন্য পথ বেছে নিয়েছে সুখী। এ ঘটনায় প্রতিবেশি হাসানকে আসামি করে মামলা দায়ের করেছেন সুখীর শ্বাশুড়ি পারুল বেগম। তবে এ নিয়ে এলাকাবাসীর মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া বিরাজ করছে।
শ্বাশুড়ি পারুল বেগমের সাথে কথা বলে জানা যায়, ঈদের আগের দিন রোববার (১১ আগস্ট) দুপুর ১ ঘটিকায় আমি ও আমার জা আকলিমা হাজীগঞ্জ বাজারে ঈদের কেনাকাটা করতে যাই। পুত্রবধু জান্নাত উন্মুক্ত গোসলখানায় গোসল করতে যান। তখন প্রতিবেশি বখাটে ছেলে হাসান (২১) দেয়ালের ফাঁক দিয়ে জান্নাতের গোসলের দৃশ্য দেখে। পরবর্তীতে হাসান সুখীকে কুপ্রস্তাব দেয় বিধায় সুখী বিষয়টি তার প্রবাসী স্বামী রনিকে মুঠোফোনে জানায়। রনি খারাপ ভাষায় তাকে গালমন্দ করলে সুখী ফাঁসি দিয়ে আতœহত্যা করে। আমার ছেলে ফোন দিয়ে সুখীকে না পেয়ে আমার জা আকলিমার নাম্বারে ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করে আমরা কোথায় আছি? তাৎক্ষনিক সে আমাকে বাসায় কাউকে পাঠিয়ে দেখতে বলে বাসায় সুখীর কি হয়েছে? আমি আমার এলাকার সোহেল পাটোয়ারী (৩২) নামের ছেলেকে ফোন দিয়ে আমার বাসায় যেতে বলি। সে তার স্ত্রী আঁখি আক্তারকে (২২) আমার বাসায় পাঠালে আঁখি আমার পুত্রবধুর লাশ সিলিংয়ের সাথে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখে চিৎকার দিয়ে অজ্ঞান হয়ে যান। পরবর্তীতে এলাকার মানুষজন ফাঁস অবস্থা থেকে নামিয়ে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান। আমি হাজীগঞ্জ হতে পথিমধ্যেই হাসপাতালে গিয়ে আমার পুত্রবধূকে মৃত দেখতে পাই।
শাহরাস্তি থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মোজাম্মেল জান্নাতের মৃতদেহ উদ্ধার করে। চাঁদপুর মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে গত সোমবার ঈদের দিন বাদ আসর জানাযা শেষে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
★লাশ নামানো নিয়ে পরস্পর বিরোধী বক্তব্য ঃ
সুখী মৃত্যুর ঘটনা গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা বলে ছড়ানো হলেও তার ঝুলন্ত লাশ কারা নামিয়ে হাসপাতাল নিয়েছিলো এ নিয়ে পরস্পর বিরোধী বক্তব্য পাওয়া গেছে। স্বামী পরিবারের পক্ষ হতে প্রথম দিন জানানো হয়, কে বা কারা তাকে ফাঁস হতে নামিয়েছে তা তারাও জানেন না। শুক্রবার বিকেলে পুনরায় ওই বাড়িতে গেলে সুখীর শাশুড়ি পারুল বেগম জানান, তার জা’র মেয়ে সুরভী ঝুলন্ত দেহের উপরের উড়না কেটে সুখীকে নামায়। ঘটনার সময় উপস্থিত প্রতিবেশি সোহেল পাটোয়ারী (৩২) বলেন, ঘটনার দিন অভিযুক্ত হাসান সহ আমি ঈদগাহ পরিষ্কার করতে ছিলাম। হাসান পাটোয়ারী বাড়ীতে পানি খাওয়ার জন্য কলপাড়ে গিয়ে ফেরত আসেন এবং আমার সন্তানকে পানি আনার জন্য পুনরায় জগ নিয়ে পাঠায়। আমিসহ হাসান পানি খেয়ে আবার কাজে মনোযোগ দেই। কাজ শেষে তিনি বাড়ী চলে যান। কিন্তু হাসান ঈদগাহে অবস্থান করে আরও কিছু বন্ধুসহ। পরবর্তীতে বিকাল সাড়ে ৫ টায় সুখীর চাচী শাশুড়ী আকলিমা বেগম যখন তাকে ফোন দিয়ে তাদের বাসায় যেতে বলেন, তখন সে তার স্ত্রী আঁখি (২২) কে পাঠালে আখি সুখীর ঝুলন্ত লাশ দেখতে পায়। ঘটনার আকস্মিকতায় আমি এসে সুখীকে ফ্লোরে শয়ন অবস্থায় পেলে তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাই। আমি সহ তানভী ও ফাতেমা নামক আরও দুজন মহিলা আমার সাথে সিএনজি যোগে হাসপাতালে যান। পরবর্তীতে ভয় পেয়ে আমরা লাশ ফেলে চলে আসি।
পানি খাওয়ার সময় হাসানের কাছে সেই সময় কোনো মোবাইল ছিলো না বলে তিনি দাবি করেন। ভিডিও ক্লিপের যে ঘটনার কথা আমরা শুনেছি তা বানোয়াট।
কাছের হাসপাতালে দ্রুত না নিয়ে দূরবর্তী হাসপাতালে কেন সুখীকে নিতে গেলেন? সোহেলকে এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি এটির সদুত্তর দিতে পারেন নি।
সুখীর মা শাহনাজ পারভীন আক্ষেপ করে বলেন, আমার মেয়েটা দুনিয়া হতে চলে গেছে, অথচ তার মৃত্যুর সময়কালীন ঘটনাটা পর্যন্ত আমরা জানতে পারছি না। তার ঝুলন্ত লাশ বের করা কিংবা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার লোকগুলো কে?
নিহতের শ্বাশুরী ও চাচী শ্বাশুরী এ প্রতিবেদকের সাথে কথা বলার সময় বিভিন্ন লোকদের নিকট ফোন দিয়ে প্রতিবেদককে ভয় দেখানোর চেষ্টা করেন ও বিষয়টি লুকাতে অসংলগ্ন কথাবার্তা বলতে থাকেন।
★ভিকটিমের দেহে আঘাত ঃ
ভিকটিম আত্মহত্যা করেছে বলে স্বামী পরিবারের পক্ষ হতে বলা হলেও তার ঠোঁটে আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়। একটা মেয়ে নিজে আত্মহত্যা করলে তার মুখে আঘাতের দাগ কোত্থেকে আসবে এমন প্রশ্ন করে ঘটনাস্থলে চিৎকার করে কাঁদতে থাকে সুখীর সহপাঠিরা। এ প্রশ্নকে ঘিরে স্বজনদের অনেককে দাঁড়িয়ে অশ্রুপাত করতে দেখা যায়।
★সুখীর বান্ধবিরা জানান ঃ
সুখীর বান্ধবী শিখা জানান, সুখী মেয়েটি উন্মুক্তমনা ছিল। সব বিষয়ে সে সৃষ্টিশীল মানসিকতার অধিকারি ছিল। সব সময় সে আমাদেরকে কোন ঝামেলা হলে তা সমাধানের উপায় বুঝাতো। সেই মেয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করবে তা আমার বিশ্বাস হচ্ছে না।
সুখীর আরেকজন বান্ধবী নাম প্রকাশ না করা শর্তে বলেন, সুখীর ননদ ইতি আমাকে একটি মেসেজ দিয়েছে সুখী নাকি ধর্ষণ হয়েছে বিধায় গলায় ফাঁস দিয়ে আতœহত্যা করেছে। সে প্রেম পরবর্তী সকল কিছুতেই পরিবার থেকে চাপ পেয়েও নিজে কখনো ভেঙ্গে পড়ে নি, বরং ধৈর্য নিয়ে সে তার প্রেমে সফল হয়েছিল যা বিয়ের মাধ্যমে সমাপ্তি ঘটে। আর সেই প্রতিবাদী মেয়ে ধর্ষণের পর আতœহত্যা করবে তা আমি বিশ্বাস করতে পারছি না।
★ঘটনার নেপথ্যে…
সুখীর মৃত্যুর ঘটনায় ওয়ারুকে অবস্থিত হাসপাতালে দ্রুত তাকে চিকিৎসা না করিয়ে পার্শবর্তি উপজেলার হাসপাতালে নেওয়ার কারণ কি শুধু কালক্ষেপণ নাকি লোক দেখানো তা নিয়ে এলাকায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া বিরাজমান।
ঘটনার ২ দিন আগে রাত ১২ টায় জানালার পাশে অভিযুক্ত হাসান সুখীর নাম ধরে ডাকাডাকি করে। এতে শাশুড়ী পারুল বেগম শুনতে পেয়ে ধমক দিলে সে চলে যায়। এরপরও অভিভাবকহীন বাড়িতে সুখীকে একা রেখে যাওয়া ও ফ্রি স্টাইলে হাসানের এ বাড়িতে প্রবেশের বিষয়টি স্বামী পরিবারের দায়িত্বহীনতা বলে মনে করছেন এলাকার লোকজন।
ঘটনার দিন সুখীর আপন ছোট ভাই সুখীর শ্বশুরবাড়িতে বেলা ১২ টার দিকে প্রবেশ করতে চাইলে বখাটে হাসানসহ আরও ৩ জন ছেলে তাকে বাধা দেয়। হাসান কেনো সুখীর ভাইয়ের পথ রোধ করে তাকে বোনের বাড়ীতে যেতে দিলো না। সেদিনই সুখীর মৃত্যর ঘটনাটি রহস্যময় বলে দাবী তার পরিবারের।
তাছাড়া সুখীর ননদ ইতি হাজীগঞ্জে স্বামীর বাড়িতে থেকে ধর্ষণ শেষে মেয়েটি আতœহত্যা করেছে মর্মে বান্ধবীদের জানালো কিভাবে?
সুখীর ননদের স্বামী কাসেম বিষয়টি আত্মহত্যা বলে গনমাধ্যমে প্রচারে তথ্যদানে বেশ উৎসাহী পরিলক্ষিত হয়েছে এবং তিনিই সরাসরি গনমাধ্যমকর্মীদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছেন বলে ৩/৪ জন গণমাধ্যমকর্মী জানিয়েছেন।
নামপ্রকাশ না করার স্বার্থে বাড়ির লোকজন জানান, শাশুড়ী পারুল বেগম ও চাচী শাশুড়ী আকলিমা বেগমের নামে-বেনামে লোন উঠানো আছে। যার ফলে তাদের বাড়ীতে অনেক সংস্থার কর্মী প্রতিদিন আসা-যাওয়া করতো। পুরুষ শূণ্য বাড়িতে এতো মানুষের আনাগোনাটা কি খুব ভালো চোখে যায়। বিদেশে থাকা সন্তান ও স্বামীর অর্থ কি অপ্রতুল ছিলো তাদের জন্য। তারা কেনইবা এতে অর্থ লেনদেনে নিজেদেরকে জড়িয়েছেন।
★সুখীর মোবাইলে কি ছিল?
সুখীর মোবাইলে কি ছিল তা নিয়ে নানা প্রশ্নের জট ঘুরপাক খাচ্ছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তার এক সহপাঠিনি বলেন, লাশ বাড়িতে আনার পর আমরা কয়েকজন বন্ধু-বান্ধব তার বাসায় গিয়েছিলাম। লাশ গোসলের সময় তার ব্যবহৃত মোবাইলটা আমরা শ্বশুর বাড়ীর লোক হতে দেখতে চাইলে তারা গড়িমসি করতে থাকে। ঠিক ৩০ মিনিট পরে যখন তারা মোবাইলটি আমাদের হাতে দেন, তখন মোবাইলটি ভাঙ্গা দেখতে পাই। কি লুকানোর জন্য তার মোবাইলটি ভাঙ্গা হয়েছে?
সুখীর স্বামী তৌকির আহমেদ রনি মুঠোফোনে জানান, ঘটনার সময় আমি সুখীর ফোনে ভিডিও কল দিলে কেউ একজন হট্টগোল থাকা অবস্থায় রিসিভ করে। আমি ভিডিও কলে সব কিছু দেখছিলাম ও শুনছিলাম। তার মানে ফোনটি তখনও সচল ছিলো। তবে পরবর্তীতে কে বা কারা মোবাইল ভাঙ্গলো। ভাঙ্গা মোবাইলের রহস্য উদঘাটন করতে পারলে অবশ্যই আরও তথ্য বেরিয়ে আসবে।
★আমার মেয়ে আত্মহত্যা করতে পারে না
সুখীর মা শাহনাজ পারভীন জানান, আমার মেয়ের সাথে ঘটনার দিন বেলা ৩ টার সময় আমার শেষ কথা হয়। মেয়ে আমাকে গোসলে যাওয়ার কথা বলে ফোনটি রাখে। পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে ৪ টা ১০ মিনিট পর্যন্ত অনলাইনে কথোপকথন হয়। বিকেল সাড়ে ৫ টায় মেয়ের জামাই রনি আমাকে সুখীর মারা যাওয়ার খবর দিলে আমি তা বিশ্বাস করতে পারি নি। তবে আমি নিজে হাসপাতালে গিয়ে কাউকে লাশের সাথে পাই নি। পরবর্তীতে মেয়ের শাশুড়ী ও চাচী শাশুড়ীকে বাহিরে দেখতে পাই।
তিনি আরও বলেন, আমার ছেলেকে সেদিন হাসান ছেলেটি কেনো আটকায়। কেনইবা আমার শান্ত স্বভাবের মেয়ে আত্মহত্যা করতে গেলো। তা আমি নিজেও বুঝতেছি না।
আমার মেয়ে আতœহত্যা করতে পারে না। সেদিন কি হয়েছে আমি জানতে চাই। আমার মেয়ের মোবাইল কে ভেঙ্গেছে? আমি মেয়েকে ফেরত পাবো না, কিন্তু আর কারও মেয়ের সাথে যেনো এমন না হয় বলেই তিনি কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন।
শাহরাস্তি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোঃ শাহআলম জানান, এ ঘটনায় নিহত জান্নাতুল নাঈমের শাশুড়ি পারুল বেগম বখাটে হাসানকে অভিযুক্ত করে থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছে। অভিযুক্তকে ধরার জন্য অভিযান চলছে। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট পেলে আত্মহত্যা নাকি হত্যা তা নিশ্চিত হওয়া যাবে।