ডেঙ্গু পরিস্থিতিতে আগামী ৭ দিন চ্যালেঞ্জিং

প্রকাশিত

স্টাফ রিপোর্টার: ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মনোয়ারা বেগম নামে আরো একজনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়াও ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মারা গেছেন সুমন শেখ নামে এক কলেজছাত্র। আর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন আরো এক হাজার ৪৬০ জন। শুধু রাজধানীতেই নয়, সারাদেশেই ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। বর্তমানে সারা দেশের হাসপাতালে সাত হাজার আটশ ৬৪ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এমতাবস্থায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগামী সাত দিনকে চ্যালেঞ্জিং বলেছেন সরকারের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক সানিয়া তহমিনা।
শনিবার নিয়মিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে এ কথা বলেন তিনি। অধ্যাপক সানিয়া তহমিনা বলেন, আগামী সাতটা দিন আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জিং। আবহাওয়া আমাদের অনুকূলে নয়।
আমরা যদি এডিসের দুর্গে আঘাত হানতে না পারি, তাহলে পরিস্থিতি কী হবে বলা মুশকিল। এ ছাড়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদও বলেছেন, ডেঙ্গু পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে তা বুঝতে সপ্তাহ খানিক সময় লাগবে।
শনিবার বিকেলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে আয়োজিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে তিনি এ কথা বলেন। অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ বলেন, ডেঙ্গু পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে তা বুঝতে আমাদের আরও এক সপ্তাহ সময় লাগবে।
আমাদের এখন উচিত নিজেদের এডিস মশা থেকে দূরে রাখার সমস্ত পন্থা অবলম্বন করা। ডেঙ্গুর প্রকোপ কমাতে মশক নিরোধক আমদানির ওপরও জোর দিয়েছেন আবুল কালাম আজাদ, নিজেদের রক্ষা করার জন্য যেমন ফুল প্যান্ট, ফুল হাতা জামা পরিধান করা দরকার, তেমনি রিপেল্যান্ট দ্রুত আমদানি করা যায় কি না সে বিষয়েও জোর দেওয়া দরকার।
এদিকে আগের মাসের তুলনায় আক্রান্তের সংখ্যা দ্বিগুণ হলেও গত কয়েকদিনের বিচারে হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী ভর্তির হার কমেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমারজেন্সি অপারেশনস অ্যান্ড কন্ট্রোল রুমের তথ্য অনুযায়ী, গত দুদিন ধরে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ক্রমাগত কমছে। ১৭ অগাস্ট শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ৪৬০ জন ডেঙ্গু নিয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হন। শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত এই সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৭২১ জন; তার আগের ২৪ ঘণ্টায় ছিল ১ হাজার ৯৩৩ জন। অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে ১৭ অগাস্ট পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গু নিয়ে ভর্তি হয়েছেন ৫১ হাজার ৪৭৬ জন। অগাস্টের মাঝামাঝিতে পুরো জুলাই মাসের দ্বিগুণের বেশি রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে । এরপর অগাস্টে তা আরও বাড়ল। অগাস্ট ডেঙ্গুর মৌসুম হলেও মশা নিধনে নানা তৎপরতায় পরিস্থিতির উন্নতি আশা করছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ডা. আয়শা আক্তার। তিনি বলেন, মশক নিধন কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। এছাড়া মানুষের মধ্যে সচেতনতাও বেড়েছে। এসব কারণে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ধীরে ধীরে কমতে পারে বলে আমরা ধারণা করছি।
গত জুলাই মাসে ১৬ হাজার ২৫৩ জন রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। অগাস্ট মাসের প্রথম ১৬ দিনেই সেই সংখ্যা ৩৩ হাজার ১৫ জনে দাঁড়িয়েছে। সরকারি হিসেবে চলতি বছর এপ্রিলে ৫৮ জন, মে মাসে ১৯৩ জন, জুনে ১৮৮৪ জন ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। জুলাই মাসে তা এক লাফে ১৬ হাজার ২৫৩ জনে পৌঁছায়। অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত যে ১ হাজার ৪৬০ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, তার মধ্যে ঢাকায় ৬২১ জন এবং ঢাকার বাইরে ৮৩৯ জন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, শনিবার দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ৭ হাজার ৮৫৬ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি ছিলেন। তাদের মধ্যে ঢাকায় ৪ হাজার ৪৩ জন, ঢাকার বাইরে ৩ হাজার ৮১৩ জন। সরকার চলতি বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ৪০ জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করা হলেও ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতাল ও জেলার চিকিৎসকদের কাছ থেকে অন্তত ১৩৫ জনের তথ্য পেয়েছে সংবাদমাধ্যম। গত ২৪ ঘণ্টায় রাজধানীর বাইরে ঢাকা বিভাগের জেলাগুলোতেই সবচেয়ে বেশি- ২১৯ জন নতুন রোগী ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এছাড়া চট্টগ্রামে ১৭০ জন, খুলনা বিভাগে ১০৯ জন, রংপুর বিভাগে ৪৯ জন, রাজশাহী বিভাগে ১০৫ জন, বরিশাল বিভাগে ১৩৮ জন, সিলেট বিভাগে ১৩ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ৩৪ জন ভর্তি হয়েছেন ডেঙ্গু নিয়ে। গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকার হাসপাতালগুলো থেকে ৬০৫ জন এবং ঢাকার বাইরের হাসপাতালগুলো থেকে ৭১৯ জন রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন।
অপরদিকে দেশজুড়ে এডিস মশার বিস্তার ও ডেঙ্গু জ্বরের ভয়াবহতা মোকাবিলায় একজোট হয়েছে সরকারের ৯ প্রতিষ্ঠান। জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে একসঙ্গে কাজ করবে এসব প্রতিষ্ঠান।  রাজধানীর কাঁকরাইলে জাতীয় স্কাউট ভবনে আনুষ্ঠানিকভাবে একটি সমঝোতা স্মারক সই অনুষ্ঠানে এই তথ্য জানানো হয়। ‘পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ’ শ্লোগান নিয়ে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম। বাংলাদেশ স্কাউটস, ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-(ই-ক্যাব), ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন, স্বাস্থ্য অধিদফতর, স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর, আইসিটি বিভাগ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এটুআই প্রকল্প এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে এই সমঝোতা স্মারক সই হয়। চুক্তি অনুযায়ী সংক্রমিত রোগ প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ ও মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা হবে। পরে অনুষ্ঠানে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম রাজধানীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ওপরে জোর দিয়ে বলেন, বিশ্বের পরিস্কার শহরগুলোকে অনুসরণ করে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ উদ্যোগ সফল হলে ডেঙ্গু থেকে মুক্তি পাওয়া সহজ হবে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ দেশের যেকোনো দুর্যোগ মোকাবিলার মতো সক্ষমতা এখন বাংলাদেশের রয়েছে। তবে এখন সবচেয়ে বেশি জোর দিতে হবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উপরে। তিনি বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। শুধু রাজধানী কেন্দ্রীক নয় জেলা-উপজেলা পর্যায়েও সমন্বিতভাবে ডেঙ্গু মোকাবিলায় কাজ করতে হবে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, তার এলাকার প্রতিটি ওয়ার্ডকে দশভাগে ভাগ করে বাড়ি বাড়ি চিরুনী অভিযান পরিচালনা করা হবে। যেসব বাড়িতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া যাবে তা মার্ক করা হবে এবং বাড়ির মালিকদের সচেতন করা হবে। ফলোআপ করতে গিয়ে পুনরায় লার্ভা পাওয়া গেলে জরিমানা করা হবে।