ভাইরালে জিরো হিরো

প্রকাশিত

এস কে দোয়েল-
বর্তমান সময়ে সবচেয়ে আলোচিত ও পরিচিত শব্দ হচ্ছে ‘ভাইরাল’। যারা ফেসবুকসহ বিভিন্ন সোস্যাল মিডিয়া তথা ভার্চুয়াল জগতে বাস করছেন। বিশ্বে প্রায় আটশো কোটি মানুষের মধ্যে দুইশো কোটির বেশি মানুষ এখন ফেসবুক ব্যবহার করছেন। সে হিসেবে বাংলাদেশের সতের কোটি জনসংখ্যার মধ্যে তিন কোটির বেশি মানুষ ফেসবুক ব্যবহারকারী। ইন্টারনেট ব্যবহারকারী রয়েছেন প্রায় দশ কোটি। দিনদিন এর সংখ্যা বাড়ছে। তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার যতো দ্রুত মানুষের হাতের নাগালে পৌছছে, ততো দ্রুত এর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। সে হিসেবে যেকোন ঘটনা দ্রুত ভাইরাল হলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। তবে ভাইরাল বিষয়ে প্রত্যেকের জ্ঞান ও সচেতন থাকা আবশ্যক। তা নাহলে যেকোন অসাবধানতা জীবনে ডেকে আনতে পারে অনাকাংখিত বিপদ।
এখন কথা হচ্ছে ‘ভাইরাল’ মূলত কী? ভাইরাল শব্দটি যদি নেটওয়ার্ক দিয়ে বুঝাই তাহলে এটি অতি দ্রুত প্রকাশ, প্রচার। দ্রুত বিস্তৃতি পাওয়া। যেমন পুকুরের নিস্তব্ধ পানিতে ঢিল ছুড়লে যেরুপ তাৎক্ষণিক অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে, ভাইরাল শব্দটিও তাই। আগে এটিকে ক্ষতিকর ভাইরাস বলা হতো। ভাইরাস যেমন শরীরে দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে, ছড়িয়ে পড়ে সারা শরীরে। অর্থাৎ দ্রুত ছড়ায়। এখন ইন্টারনেট যুগে কোন বিষয়, ঘটনা, ভিডিও-অডিও তা সোস্যাল মিডিয়ার সাহায্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়াটাই ভাইরাল।
ভাইরাল ভালো না খারাপ? এটার কারণে জিরো-হিরো কারণ কি হতে পারে? সবাই তো ভাইরাল করতে ব্যস্ত, আবার কেউ ভাইরাল হয়ে আলোচিত বা জনপ্রিয় হতে চান। আসলে ভাইরালের বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করলে এটাকে সমুদ্র গর্জনের মতো চরম ‘সতর্ক সংকেত’ হিসেবে আখ্যায়িত করা যেতে পারে। কারণ প্রত্যেকটি অসাবধানতা কর্মই ক্ষতি বা লজ্জার কারণ হয়ে উঠতে পারে। পথ চলতে গিয়ে যদি হোঁচট খাওয়া হয়, তখন মনে হয়-ইস: যদি দেখে চলতাম! ঠিক তাই ‘ভাইরাল’ শব্দটিও সাবধানতায় আপনাকে যেমন ক্ষতির দিক থেকে বাঁচাতে পারে, তেমনি অসাবধানতায় অনাকাংখিত ক্ষতির দিকে ধাবিত করতে পারে।
বনানীর ‘পাইপ বয়’ শিশু নাঈম ইসলামের কথা হয়তো মনে আছে সবার। বনানীর এফআর টাওয়ারে আগুন নেভানোর সময় ফায়ার সার্ভিসের ফুটো পাইপ চেপে ধরার চিত্র ফেসবুকে ভাইরাল হলে রাতারাতি জনপ্রিয় হয়ে উঠে গুলশান কড়াইল বস্তির ১০বছরের শিশু নাঈম। ফেসুবুকে পোষ্ট, শেয়ার ও প্রশংসার ঝড়ে রীতিমত হিরো। রচিত হয় বীরত্বগাঁথার গল্প। অথচ ছোট্ট একটি কাজ। সেটাই মানবিকতার দৃষ্টান্ত হয়ে উঠলো। এ ঘটনায় আমেরিকা প্রবাসী ওমর ফারুক সামি নাঈমের এই বীরত্বগাথায় ৫ হাজার ডলার পুরস্কার ঘোষণায় তিনিও ভাইরাল হয়ে প্রশংসার বানে ভাসলেন। অথচ এই ঘটনায় টিভি নাটকের স্কান্ডালবয় হালে টিভি উপস্থাপক শাহরিয়ার জয়ের সাক্ষাতকার চিত্রেই বদলে গেল দৃশ্যপট। তোতা পাখির বুলিতে “ এই পুরস্কারের অর্থ কী করা হবে-উত্তরে এতিমখানায় দান করার’ প্রাসঙ্গিক বিষয়টিই গোটা সোস্যাল মিডিয়ায় নিন্দার ঝড় তুলে। শেষ পর্যন্ত জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে উপস্থাপক জয় থানায় জিডি পর্যন্ত করেছিলেন।

ভাইরালের অন্যতম ক্ষতিকর দিক হচ্ছে ‘গুজব ছড়ানো’। যেকোন মিথ্যাচার কিছু প্রচার মানেই বিভ্রান্তি তৈরি করে। আতঙ্ক তৈরি করে। সম্প্রতি পদ্মা সেতু নির্মাণ কাজে ‘মানুষের মাথা লাগা’র গুজব ফেসবুকে ভাইরাল পোস্টে দেশজুড়ে তুমুল আতঙ্ক তৈরি করে। এই গুজবে শান্তির ঘুম হারাম করেছিল মানুষের। এ ঘটনায় সন্দেহজনকভাবে গণপিটুনীতে ঘটে অনাকাংখিত প্রাণহানি ও নির্যাতনের ঘটনা। ২০ জুলাই দুপুরে সাভারের হেমায়েতপুরের তেঁতুলঝোড়ায় এক শিশুকে বিস্কুত খাওয়ানোর চেষ্টা কালে ছেলেধরা গুজবে গণপিটুনীতে হত্যার শিকার হন সালমা বেগম (৪০) নামের নারী। একই দিনে বাড্ডা প্রাইমারী স্কুলে সন্তানের ভর্তির বিষয়ে খোঁজ নিতে গিয়ে ছেলেধরা গুজবে নির্মম গণপিটুনীতে প্রাণ হারান তাসলিমা বেগম রেনু (৪০) নামের আরেক নারী। এ গুজব ঘটনায় প্রাণ গেছে ১০জনের বেশি মানুষের, নির্যাতনের শিকার হয়েছেন প্রায় শতাধিক। এই ধরণের গুজব রটানো ভাইরাল পোস্ট ব্যক্তিকে যেমন আতঙ্কিত করে তুলে তেমনি রাষ্ট্রের ভাবমূতি ক্ষুন্ন করে।

তাহলে প্রযুক্তির ভাইরাল যুগে আপনি কতোটা নিরাপদ? না, আসলে কেউ নিরাপদ নয়। তবে সচেতনতাই রাখতে পারে নিরাপদ। এই প্রযুক্তির সময়ে আপনি কোথায় কি করছেন তা যেন প্রতিনিয়ত আপনাকে অদৃশ্য ক্যামেরায় বন্দী করে রাখছে। গোপনে কী পরিকল্পনা করছেন, কার সাথে কি শেয়ার করছেন, কিসের মাধ্যমে করছেন তার সবকিছুই যেন এখন প্রযুক্তির নখদর্পনে। আপনি যদি রাজনৈতিক দলের কোন নেতা হন, তাহলে আপনার বিপক্ষ শক্তি ছায়ার মতো লেগে থাকার বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। ক্ষমতায় আসার লক্ষে আন্দোলনের জোরদার, বিদেশীদের কাছে সহযোগিতা কামনা করে আপনার ফোনালাপ কোনভাবে ফাঁস বা ভাইরাল হয়ে পড়লে আপনাকে চরম বিপাকে পরার সম্ভাবনা থাকে। যেরুপ সম্প্রতি বরগুনায় রিফাত হত্যা। রিফাত হত্যার কিলিং মিশনে ফেসবুক মেসেঞ্জার গ্রুপ চ্যাটিংয়ে ‘জিরো জিরো সেভেন’ পরিকল্পনা করেছিল মূল হোতা নয়ন বন্ড। ফোনালাপ ফাঁসে এরকম অনেক রাজনৈতিক নেতা বিতর্ক সৃষ্টি করে অভিযুক্ত পর্যন্ত হয়েছিলেন। বিগত সময়ে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের সঙ্গে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর একজন এজেন্টের কথিত ফোনালাপের একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার খবর উঠেছিল। এরকম বিকল্প ধারা নেতা মাহি বি চৌধুরী, নাগরিক ঐক্য নেতা মাহমুদুর রহমান মান্না, বিএনপি নেতা আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ফোনালাপ ফাঁস হওয়ার খবর গণমাধ্যমে প্রকাশ হতে দেখা যায়। প্রযুক্তির নখদর্পনে ঘুষ নেওয়ার দৃশ্য, দুর্নীতির চিত্র, হুমকি প্রদর্শনের ঘটনা ভাইরাল হলে নেমে আসতে পারে অশান্তির খড়গ।

ভাইরাল অনেক বড় বড় অপরাধ ঘটনা প্রকাশ করে আইন প্রশাসনকে সহযোগিতা করতে পারে। ২০১৫ সালের ৮ জুলাই সিলেটের সবজি বিক্রেতা শিশু রাজন হত্যার ঘটনা হয়তো অনেকের মনে আছে। তাকে বেঁধে বেধম নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হয়। পরে নির্যাতনের ভিডিওটি সোস্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হলে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করলে ৮ নভেম্বর রাজন হত্যা মামলায় আসামি কামরুলসহ চারজনকে মৃত্যুদন্ডাদেশ প্রদান করেন নিম্ন আদালত। ২০১২ সালে ৯ই ডিসেম্বর বিরোধীদল বিএনপির অবরোধ কর্মসূচি চলার সময় ঢাকার ভিক্টোরিয়ার পার্কের সামনে দিনে দুপুরে খুন হন দর্জি দোকানী বিশ্বজিৎ দাস। ২০১৬ সালে ৩ অক্টোবর ‘প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হয়ে সিলেটের কলেজছাত্রী খাদিজা বেগম নার্গিসকে কুপিয়ে হত্যা চেষ্টা চালান সে সময়ের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বদরুল আলমের নামের এক ছাত্রনেতা। মোবাইলে তোলা ছবি ফেসবুকে ভাইরাল হলে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়। পরে গণমাধ্যম জুড়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এ ঘটনার মামলায় বদরুলের যাবজ্জীবন কারাদন্ড প্রদান করেন আদালত। এরকম অসংখ্য অপরাধমূলক ঘটনা প্রতিনিয়ত সোস্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে তা গণমাধ্যম ও আইনপ্রশাসনকে সহযোগিতা করছে।

তাই প্রযুক্তির উৎকর্ষে ভার্চুয়াল জগত ফেসবুকসহ যেকোন সোস্যাল মিডিয়ায় মতামত প্রকাশে স্বাধীনতা থাকলেও আছে অনেক জটিলতা। কারণ স্বাধীন মতামত প্রকাশ করতে গিয়ে কেউ হিরো হয়েছেন আবার কেউ নির্যাতনের শিকার হয়ে লাঞ্চনার শিকার হয়েছেন। ছোট্ট একটা “ভুল”ই এই ন্যাক্কারজনক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। অনেক অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ে রয়েছে, যেটা ভাইরাল করতে গিয়ে প্রশংসার বদলে নিন্দার পাত্র হতে হয়। ফেসবুকে ইচ্ছাকৃত হোক আর অনিচ্ছাকৃতভাবে হোক, আপনার টাইমলাইনে কোন পর্ণ ভিডিও শেয়ার করলেন, নিজের মতামত প্রকাশ করতে গিয়ে ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত করলেন, কারোর প্রতি ঘৃণা-বিদ্বেষে বশবর্তী হয়ে কুটুক্তি করলেন, কারো গোপন ভিডিও ছড়িয়ে দিলেন, কোন কিছু না জেনেই হুজুগে গুজব ছড়িয়ে দিলেন এবং ফেসবুক মেসেঞ্জারে বন্ধুতা মনে করে রোমান্টিক গল্প জুড়তে গিয়ে বিভিন্ন অশ্লীল ভিডিও শেয়ার করলেন। এসব কর্মের জন্য আপনাকে যেকোন সময় বিপদে পড়ার আশঙ্কা থাকে। কারণ আপনি যা ছড়িয়ে দিলেন, অন্যরা তা শেয়ার, কমেন্ট করে সেটিকে বিস্তৃতি ঘটিয়ে ভাইরাল করে ফেললো। এইসব কর্মের জন্য আপনি যেমন বিকৃত মনোভাবাপন্ন ব্যক্তিতে পরিচিত হতে পারেন, তেমনি সাইবার ক্রাইমে অভিযুক্তও হতে পারেন।

পরনিন্দা, ঘৃণা, বিদ্বেষ, কুটুক্তি আর অসহিঞ্চুতা বশবর্তী হয়ে যেকোন লেখা, ছবি ও ভিডিও ছড়ানোও অপরাধের মধ্যে পড়ে। এসব ক্ষেত্রে আপনি যদি সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকও হোন, সেক্ষেত্রেও আপনাকে আপনার সংবাদনীতিমালা মেনেই আপনার দায়িত্ব পালন করতে হবে। কারণ সাংবাদিকদের জন্য ৫৭ ও ৩২ ধারা চালু করা হয়েছে। এ আইনে সরকারী, আধা-সরকারী, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কেউ যদি বেআইনীভাবে প্রবেশ করে কোন ধরনের তথ্য-উপাত্ত, যে কোন ধরনের ইলেকট্রনিকস যন্ত্রপাতি দিয়ে গোপনে রেকর্ড করে, তাহলে ১৪ বছর কারাদন্ড ও ২০ লাখ টাকা জরিমানা। নতুন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ডিজিটাল মাধ্যমে আক্রমণাত্মক ভয়ভীতি দেখানো হয় তাহলে তিন বছরের জেল ও তিন লাখ টাকা জরিমানা। ধর্মীয় বোধ ও অনুভূতিতে আঘাত করলে ১০ বছরের জেল ও ২০ লাখ টাকা জরিমানা। মানহানিকর কোন তথ্য দিলে তিন বছরের জেল ও পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা আর না জানিয়ে কেউ যদি কোনো ইলেকট্রনিকস ডিভাইস ব্যবহার করে, তাহলে পাঁচ বছরের জেল ও পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দন্ডের বিধান রাখা হয়েছে। তাই যেসব কাজ ও সোস্যাল মিডিয়ায় পোষ্টের মাধ্যমে ভাইরাল করে রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করে এরূপ চিন্তা বাদ দিয়ে নিজেকে যেমন সচেতন হতে হবে এবং অন্যকেও সচেতন করণে প্রচেষ্টা চালাতে হবে।

-এস কে দোয়েল,সাংবাদিক ও কলামিস্ট
তেঁতুলিয়া, পঞ্চগড়।