মনোহরদীতে অমৃত সাগর কলা চাষে কৃষকের মুখে হাঁসি

প্রকাশিত

মাহবুবুর রহমান, মনোহরদী (নরসিংদী) প্রতিনিধি –
কলা নামক বারোমাসি ফলটির সাথে যে জেলার নামটি সম্পৃক্ত তা হলো নরসিংদী। এখানে কলার ১৮টি জাতের মধ্যে ১২টি জাতেরই চাষ হয়। নরসিংদীর সবচেয়ে বেশি কলা উৎপাদিত হয় মনোহরদী উপজেলায়। এই উপজেলাটি যে কলার জন্য খ্যাত তাহলো সাগর কলা। উপজেলায় অমৃত সাগর কলাচাষ অধিক লাভবান হওয়াতে হাঁসি ফুটেছে কৃষকের মুখে। অল্পখরচে অধিক ফলন এবং বেশি লাভবান হওয়ায় কৃষকরাও ঝুঁকছে অমৃত সাগর কলা চাষে।
কলা হজম কারক একটি ফল। কলাতে রয়েছে ভিটামিন এবং খনিজ লবন। একটি কলা খেলে ১০০ ক্যালরির বেশি শক্তি পাওয়া যায়। কলার মধ্যে থাকা আয়রন রক্তে হিমোগ্লোবিন উৎপাদনে সহায়তা করে। একটি কলাতে প্রায় ৫০০ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম থাকে তাই দিনে দু-তিনটি কলাই যথেষ্ঠ মানব দেহের ১৬০০ মিলিগ্রাম পটাশিয়ামের চাহিদা মেটাতে। ফলে স্টোকের হাত হতে বছরে বেঁচে যেতেপারে প্রায় ১০ লক্ষ মানুষ।
জানাযায়, মুঘল আমল থেকেই নরসিংদীর কলার সু-খ্যাতি ছিল দেশজুড়ে। আর নানা জাতের কলার মাঝে সাগর কলার চাহিদা ছিল সবার উপরে। এই সাগর কলার জন্য বিখ্যাত হলো মনোহরদী উপজেলা। লোকমুখে শোনাযায় অত্র উপজেলায় উৎপন্ন জনপ্রিয় সাগর কলার নাম অনুসারে উপজেলার লেবুতলা ইউনিয়নের সাগরদী এলাকার নামকরণ হয়েছে। পাঁচ বছর আগেও কৃষকদের মাঝে অন্যান্য কৃষি ফসলের ভীড়ে লাভ বেশি ভেবে কলা চাষে কিছুটা অনাগ্রহ দেখা গেলেও বর্তমানে উপজেলা কৃষি অফিসের সহযোগীতা এবং অনুপ্রেরণায় অধিক লাভের আশায় অমৃত সাগর কলা চাষে ঝুঁকছে কৃষকরা।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানাযায়, বর্তমানে মনোহরদী উপজেলায় মোট প্রায় এক হাজার হেক্টর জমিতে কলার আবাদ করা হয়েছে। যার মাঝে অধিকাংশই অমৃত সাগর কলা। বারটি ইউনিয়ন এবং একটি পৌরসভা নিয়ে ঘটিত এ উপজেলায় মনোহরদী পৌরসভার সল্লাবাইদ, চন্দনবাড়ি ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রাম ও চালাকচর, কাচিকাটা, বড়চাপা, দৌলতপুর, লেবুতলা ইউনিয়নের প্রতিটি গ্রামেই সবচেয়ে বেশি কলাচাষ হয়।
কৃষকরা জানান, অত্র উপজেলায় চাম্পা, সবরি, হোমাই, কবরী এবং গোরাসুন্দর কলা চাষ হলেও বর্তমানে অমৃত সাগরের চাষ হচ্ছে অনেক বেশি এবং বাজারেও অত্র অঞ্চলের কলার চাহিদা বেশ ভাল থাকায় কলা বিক্রিতে যথাযথ মূল্য পাচ্ছে তারা।
সাধারণত বৈশাখ মাসের শুরুতে কলার চারা রোপন করলে অগ্রহায়ন মাস থেকে ফল পাওয়া শুরু হয়। যে সকল জমিতে এস সপ্তাহের বেশি পানি লেগেনা থাকে সে সকল জমিতে কলার ফলন ভাল হয়। এক বিঘা জমিতে জাত ভেদে তিন’শ থেকে সাড়েতিন’শ চারা রোপন করতে হয়। এক বিঘা জমিতে কলাচাষ করতে ১৫/২০ হাজার টাকা খরচ হয়। আর বিক্রি হয় সিজন প্রতি আশি হাজার থেকে শুরুকরে এক লাখ টাকা পর্যন্ত। যা অন্য কোন ফসলে সম্ভব নয়।
চন্দন বাড়ি গ্রামের কৃষক নূরুল ইসলাম বলেন, স্থানীয় কৃষি অফিসের পরামর্শ অনুযায়ী আমার মোট আড়াই বিঘা জমিতে সাড়ে আটশত কলার চার নিয়ে অমৃত সাগর কলার বাগান করেছি। বাগানে যথাযথ পরিচর্যার কারণে আট মাস পরেই ভাল ফলন হয়েছে। এপর্যন্ত মোট পঞ্চাশ হাজার টাকার কলা বিক্রি করলেও বাগানে এখনো আরো প্রায় সত্তর হাজার টাকার কলা রয়েগেছে।
চালাকচর গ্রামের কলাচাষী স্বপন মিয়া ও লেবুতলার শাহাদত হোসেন বলেন, আমাদের এলাকার কলা আকার এবং স্বাদে অতুুলনীয় হওয়াতে বাজারে চাহিদাও রয়েছে বেশ। এজন্য পাইকারী ক্রেতারা কলার জন্য সরাসরি আমাদের বাগানে চলে আসে। ফলে কলা বিক্রীর জন্য যেমন পরিবহন খরচ হয়না তেমনি থাকতে পারি চিন্তামুক্ত।
সরেজমিনে উপজেরার মনোহরদী বাসষ্ট্যান্ড, খালেরঘাট, চালাকচর এবং হাতিরদিয়া কলাবাজার পরিদর্শন করে দেখা গেছে, সবরি কলা প্রতি ছড়া আকার এবং প্রকার ভেদে ৩০০-৮০০ টাকা, সাগর কলা ২৫০-৮০০ টাকা, চাম্পা কলা ১০০-৩০০ টাকা, এবং হোমাই কলা ৩০০-৬০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
ঢাকা থেকে খালেরঘাট বাজারে কলা কিনতে আসা পাইকারী ক্রেতা কবির মিয়া ব্যাপারি বলেন, দেশের সর্বত্রই অত্র অঞ্চলের কলার বেশ চাহিদা থাকায় আমরা এ এলাকার কলা নিতে ছুটে আসি। লাভও হয় ভালো।
মনোহরদী উপজেলা কৃষি অফিসার আয়েশা আক্তার বলেন, নরসিংদী জেলায় সবচেয়ে বেশি অমৃত সাগর কলা উৎপাদন হয় মনোহরদী উপজেলায়। যা স্বাদে ও গন্ধে অতুলনীয়। অত্র অঞ্চলের মাটি এবং আবহাওয়া কলা চাষের জন্য বেশ উপযোগী। উপজেলা কৃষি অফিসের পক্ষ হতে সবসময় কলার প্রদর্শনীসহ বিভিন্ন ভাবে কলাচাষীদেরকে সহযোগীতা এবং পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।