চা পাতার দরপতনে চা চাষীরা দিশেহারা দাম নেই চা পাতার

প্রকাশিত

তেঁতুলিয়া (পঞ্চগড়) প্রতিনিধিঃ
কয়েক বছরেই অর্থনীতির চাঙ্গা হয়ে উঠেছিল সবুজ চা শিল্পে। দীর্ঘ আয়ের অর্থকরী ফসল হিসেবে চা উৎপাদনে বাড়ির আঙিনাসহ নিজস্ব যেটুকু জমি রয়েছে, সেখানেই চা চারা লাগিয়েছিলেন বহু ক্ষুদ্র চাষী। এই আগ্রহের ঝড়ে উত্তরের তেঁতুলিয়ার চা শিল্পের বিপ্লব শুরু হয়। এই অল্প সময়ে ঘুরে গিয়েছিল অর্থনীতির চাকা। গত বছরও ছিল চা পাতার বেশ দাম। ৩০-৩৫ টাকা কেজি। কিন্তু এক বছরেই হঠাৎ কচি চা পাতার দরপতনে ব্যাপক লোকসানে নীরবে কাঁদছে চা চাষিরা। চলমান লোকসানের জের ধরে চা চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন প্রায় পাঁচ হাজার ক্ষুদ্র চা চাষী। এতে করে চরম হুমকির মুখে পড়েছে উত্তরের সীমান্তবর্তী তেঁতুলিয়া উপজেলার সবুজ চা শিল্প।

চা শিল্পকে ঘিরে নতুন নতুন চা কারখানা গড়ে উঠলেও মিলছে না চা পাতার ন্যায্য দাম। অর্থ বিপ্লবের এই চা শিল্পকে নিয়ে চলছে কারখানা মালিক ও চা চাষীদের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ। চা চাষীদের অভিযোগ, কারখানা মালিকরা সিন্ডিকেট তৈরি মাধ্যমে চা পাতার দাম কমিয়ে দেয়ার কারণে তারা তাদের উৎপাদিত চা পাতার ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না। বাজারে এখন চাপাতার দামের চেয়ে উৎপাদন খরচ বেশি। বেশ কিছুদিন ধরেই কাঁচা চাপাতার দরপতন চলছেই। বিষয়টি দেখার কেউ নেই।
কিন্তু চা কারখানা মালিকরা বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের অভিযোগ, ক্ষুদ্র চাষিরা কাঁচাপাতা তুলতে সঠিক নিয়ম না মানায় কমে গেছে চায়ের মান। তাই অকশন মার্কেটে প্রস্তুতকৃত চা যাওয়ার কারণে কমেছে কাঁচা চাপাতার দামও। কাঁচা চাপাতার মূল্য বাড়ানোর জন্য চাষিদের নিয়ম মেনে কাঁচা চাপাতা সংগ্রহ ও ভালো চারা রোপণের পরামর্শ দিচ্ছে টি-বোর্ড।

খোঁজ নিয়ে চা চাষীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, বর্তমানে চা কারখানাগুলো ১০-১২ টাকা কেজি দরে চা পাতা কিনছে। এখান থেকে আবার বিভিন্ন অজুহাতে শতকরা ২০/৩০ ভাগ পাতা কেটে নিচ্ছে চা কারখানা কর্তৃপক্ষ। এতে প্রতি কেজি চা উৎপাদনে কৃষকের খরচ পড়ছে ১৪-১৫ টাকা। এতে করে ক্ষুদ্র চা চাষিদের মজুরি এবং সার-কীটনাশকের খরচ জোগাতে ঘর থেকে টাকা ঢালতে হচ্ছে। যার কারণে প্রতিনিয়ত এখন লোকশান গুনতে হচ্ছে ক্ষুদ্র চা চাষীদের। এসব কারণে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন নতুন চাষিরা। আর যারা চা চারা উৎপাদন করছেন, তারাও বিক্রি করতে পারছেন না চায়ের চারা। এ নিয়ে মানববন্ধনের মাধ্যমে দাবি দাওয়া তুলে ধরলেও কেউই কর্ণপাত করছেন না। বরঞ্চ কোন প্রতিবাদ করলে উল্টো কারখানা মালিকরা চা পাতা কেনা বন্ধ করে দেন। ফলে অনেক সময় কোন ভাগারে ফেলে দিতে হচ্ছে বিক্রি না হওয়া চা পাতা।

চা পাতার ন্যায্য মূল্যের দাবিতে চা চাষীরা বিভিন্ন সময় রাজপথে সভা-সমাবেশ, মানববন্ধন, সড়ক অবরোধ করলেও কোন সুফল মিলেনি। সরকারিভাবে মূল্য নির্ধারণ করলেও সেটা বহাল থাকেনি। সর্বশেষ মূল্য নির্ধারণ কমিটি ২৪.৫০ পয়সা থেকে ১৬.৮০ পয়সা মূল্য নির্ধারণ করলেও সেটি বহাল থাকেনি শেষ পর্যন্ত। এক কুঁড়িতে ৪/৫ পাতার চাপাতা সরবরাহের জন্য চাষীদের নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু কারখানা মালিকদের প্রতি বৃন্তে ৪/৫ পাতার বেশি কাঁচা চাপাতা না নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হলেও তারা এই নির্দেশনা মানছেন না।

 

 

সরেজমিনে উপজেলার দর্জিপাড়ার আব্দুল করিম, সালাম, প্রেমচরণ জোত গ্রামের আনোয়ার, শাহজাহান, বিহারীপাড়ার আল মামুন, তেলিপাড়ার মিজানুর রহমান, আজিজনগর গ্রামের আব্দুল জলিলসহ অর্ধশতাধিক চা চাষীদের সাথে কথা বললে তারা জানান, চা চাষে ব্যাপক লোকশানে আছি। এমনিতে চা পাতার দাম কম, তার মধ্যে অনেক সময় কারখানাগুলো চা পাতা নিচ্ছে না। নিলেও ৩০-৩৫% পর্যন্ত কেটে নিচ্ছে। আবার চা পাতা যাতে সময় মত না দিতে পারে পরিকল্পিতভাবে অনেক সময় হুটকরে চা কারখানা বন্ধ রাখা হয়। পেদিয়াগজ এলাকার ক্ষুদ্র চা-চাষি ফারুক হোসেন জানান, এক হাজার কেজি কাঁচা চা উৎপাদনে খরচ হয় ১০ হাজার টাকা। কারখানায় নিয়ে গেলে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কেটে নিয়ে দাম পাই ৭ হাজার টাকা।

এ বিষয়ে তেঁতুলিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান কাজী মাহমুদুর রহমান ডাবলুও প্রশাসন ও কারখানা মালিকদের সাথে সমন্বয় করে চেষ্টা করেছেন চা চাষীদের উৎপাদিত চা পাতার ন্যায্য মূল্য পেতে। জেলা প্রশাসন, চা কারখানা মালিকদের নিয়ে মূল্য নির্ধারণ কাগজে কলমে করা হলেও সেটা বাস্তবায়ন হয়নি। চা কারখানা কর্তৃপক্ষ বলছেন, ক্ষুদ্র চা-চাষিরা গাছ থেকে চাপাতা সংগ্রহে নিয়ম মানছেন না। চাপাতার কালচার যথাসময়ে বজায় রাখছেন না। চা পাতার থিকনেস বাড়ানোর জন্য কেমিক্যাল ব্যবহার করায় চায়ের গুণগত মান কমে যাচ্ছে।

স্মল টি গ্রোয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের উপজেলা সভাপতি হবিবুর রহমান হবি বলেন, ‘পঞ্চগড়ে সরকারিভাবে একটি চা কারখানা স্থাপন করার কথা ছিল, সেটি দ্রুত স্থাপন করা হোক। সেই সঙ্গে পঞ্চগড়ের সব চাষিকে চা একটি বিক্রয়কেন্দ্রে বিক্রির ব্যবস্থা করতে হবে। সেখান থেকে কারখানা মালিকরা তাদের চাহিদা অনুযায়ী চা কিনে নিয়ে যাবেন।

চলমান চা পাতার দরপতনের অচলাবস্থা দূর হবে কীনা এমন আশঙ্কায় প্রহর পোহাচ্ছেন চা চাষীরা। এ বিষয়ে বাংলাদেশ চা বোর্ডের ‘নর্দান প্রকল্পের পরিচালক মোহাম্মদ শামীম আল মামুন জানান, নিলাম বাজারে এখানকার চায়ের দাম কমায় কাঁচা পাতার দামে প্রভাব পড়েছে। চা উৎপাদনে গুণগত মান রক্ষা করতে পারলে এমন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সম্ভব। # ০২/০৯/১৯