চিকিৎসা সেবার নামে অর্থ উপার্জনের প্রতিযোগিতা

প্রকাশিত

টিটু সরকারঃ চিকিৎসা সেবামূলক হলেও বর্তমানে টাকা উপার্জনের সেরা পন্থা। বর্তমানে দেশে অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। অনেক বেসরকারি (মালিকানা) হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিকরা সঠিক কাগজপত্র ছাড়া শুধুমাত্র টাকা উপার্জনের জন্য এসব প্রতিষ্ঠান খোলেছেন। হাসপাতালের ডিউটি ডাক্তার এমবিবিএস ও ডিপ্লোমা সম্পন্ন করা নার্স রাখার নির্দেশনা থাকলেও অধিকাংশ হাসপাতালেই তা নেই। গ্রামের হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বেশিরভাগগুলোর চিত্র এমনই। দেশে সিজারিয়ান অপারেশন বৃদ্ধি পাওয়া বেসরকারি হাসপাতাল বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। সিভিল সার্জনের তালিকার বাহিরে অাছে অনেক বেসরকারি হাসপাতাল। হাসপাতালের মালিকেরা অপারেশনের চুক্তির ভিত্তিতে ডাক্তার নিয়ে অাসেন। গ্রামের বেসরকারি হাসপাতালে একটি সিজারিয়ান অপারেশনের জন্য রোগীর স্বজনদের ১২ থেকে ২০ হাজার টাকা দেয়া লাগে । অনেক হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় অনেকে লাশ হয়েছে অাবার অনেকে পঙ্গুত্ব বরণ করেছে। সরকার দেশের সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসার মান উন্নয়নের চেষ্টা করলেও শুধুমাত্র ডাক্তারদের অবহেলার কারণে রোগীরা সঠিক সেবা পাচ্ছে না। ১০ টাকায় টিকিট কেটে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে ডাক্তারের সাথে রোগের বিষয়ে খোলে বলার অাগেই পুরো কথা না শুনে ডাক্তার ব্যবস্থাপত্র লিখে দেন। অথচ সেই ডাক্তার যখন নিজের চেম্বারে ৫০০ থেকে ১০০ টাকায় রোগী দেখেন তখন সমস্যার কথা শুনেই ব্যবস্থাপত্র লেখেন। প্রায়ই দেখা যায় সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের বাহিরে বিভিন্ন ঔষধ কোম্পানির লোকজন দাঁড়িয়ে থাকেন ও রোগীদের ব্যবস্থাপত্রের ছবি তুলে নেন। ব্যবস্থাপত্রের ছবি তুলে নেয়ার কারণ খুঁজতে গেলে যে তথ্য বেরিয়ে এসেছে তা হলো ঔষধ কোম্পানির পক্ষ থেকে ডাক্তারের অনেক সুবিধা দেয়া হয় বিনিময়ে তিনি ঐ কোম্পানির ঔষধ রোগীর ব্যবস্থাপত্রে লিখবেন এবং তিনি ঐ কোম্পানির ঔষধ লিখেছেন তার প্রমাণ হিসেবে তারা ব্যবস্থাপত্রের ছবি তুলে পাঠিয়ে দেন।অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজন নেই তবু ডাক্তাররা ঔষধ লিখে দেন যা খেলে রোগীর উপকার যেমন হবেনা তেমনি ক্ষতিও হবেনা। ডাক্তারদের অনেক ল্যাবের সাথে চুক্তি থাকে এবং তিনি রোগীর পরীক্ষার টাকা থেকে কমিশন পান। এজন্য অনেক ডাক্তারেরা কমিশন পাওয়ার জন্য অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা করিয়ে থাকেন এবং রোগীদের বলে দেন কোথা থেকে পরীক্ষা করতে হবে। বেশ কয়েক বছর যাবৎ অনেক ডাক্তার বিভিন্ন ফার্মেসীতে রোগী দেখেন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রোগী দেখার কোন টাকাই ফার্মেসীর মালিক পান না, তবে কেন ফার্মেসীর মালিকেরা টাকা খরচ করে ডাক্তারের জন্য চেম্বার তৈরি করেন? কেনইবা ডাক্তারের প্রয়োজন হলে ফার্মেসীর মালিক দৌড়ে যান? বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য মতে জানা যায়, ডাক্তারেরা ফার্মেসীর মালিকদের এমন ঔষধ রাখতে বলেন যেগুলো বিক্রি করলে লাভ বেশি হয় এবং অন্য ফার্মেসীতে যেগুলো কম পাওয়া যায়। ডাক্তার রোগীর ব্যবস্থাপত্রে ঐ গ্রুপের ঔষধ লিখে দেন। গ্রামের মানুষ সহজ সরল হওয়ায় ব্যবস্থাপত্রে লেখা ঔষধ ছাড়া অন্য গ্রুপের ঔষধ কিনেন না, তাই বাধ্য হয়ে ঐ ফার্মেসী থেকেই ঔষধ কিনেন। ডাক্তারি মহান পেশা হলেও বর্তমানে টাকা উপার্জনের সেরা পেশা। সরকারি হাসপাতালের পরিচালক ও পরিচালনা বোর্ডের সদস্যদের সঠিক মনিটরিং না থাকায় সাধারণ মানুষ সরকারি হাসপাতালে সঠিক চিকিৎসা সেবা পাচ্ছে না। অপরদিকে সিভিল সার্জনদের সঠিক মনিটরিং ও তদারকি না থাকায় বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো সঠিক সেবা না দিয়ে শুধুমাত্র অর্থ উপার্জন করে যাচ্ছে। এক এক হাসপাতালে পরীক্ষা ও অপারেশনের বিল একেক রকম। হাসপাতালের মালিকেরা নিজেদের ইচ্ছে মতো বিল করেন। কোন হাসপাতালে কোন পরীক্ষা কত টাকা, কোন অপারেশন কত টাকা সেই তালিকা নেই সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে যে যার মতো টাকা উপার্জনে ব্যস্ত। চিকিৎসা মহৎ পেশা হলেও বর্তমানে চিকিৎসকের কসাইয়ের সাথে তুলনা করা হয়। অনেক হাসপাতালে সময়মতো টাকা জমা করতে না পারলে টাকা বকেয়া রেখে করা হয় না অপারেশন। শুধুমাত্র টাকা উপার্জনের জন্য ডাক্তারেরা ৩ থেকে ৭ মাসের গর্ভের বাচ্চা নষ্ট করেন। ডাক্তারের কাজ মানুষের জীবন বাঁচানো হলেও বর্তমানে টাকার বিনিময়ে গর্ভের বাচ্চার জীবন নিয়ে থাকেন। ডাক্তারির মতো মহৎ পেশায় নিয়োজিতরা টাকার কাছে বিক্রি হচ্ছেন। টাকা না থাকায় সাধারণ মানুষ সরকারি হাসপাতালে গিয়েও পাচ্ছেন না সঠিক চিকিৎসা। চিকিৎসা মানুষের মৌলিক অধিকার হলেও বর্তমানে সেটা পাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। টাকার কাছে মানবতা অাজ বড়ই অসহায়।