পেঁয়াজ বাসায় আছে সেটাই সাত জনমের কপাল -তুহিন সারোয়ার

প্রকাশিত
তুহিন সারোয়ার-
যানজটের মহাসমুদ্র পেরিয়ে বাসার কলিংবেল চেপে ধরে আছেন আতা মিয়া। ভেতর থেকে কেউ দরজা খুলে দিচ্ছে না বলে তিনিও ঢুকতে পারছেন না। আহা! অসহ্য। অত্যধিক গরমে আতা মিয়ার মেজাজ যখন চরমে তখন ভেজা শাড়িতে দরজা খুলে দিলেন কইতরী বেগম। রাগে আতা মিয়া জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কী ব্যাপার, এই ভর সন্ধ্যায় গোসল করছ! বাড়িতে কি দরজাটা খুলে দেওয়ার মতো কেউ নেই?’
শান্তভাবে জবাব দিলেন কইতরী বেগম, ‘নাই কে বলল, সবাই আছে। তয় রান্না ঘরে পেঁয়াজ কাটতে ছিলাম ।
কথা শুনে আতা মিয়ার মাথা তো পুরাই ফোরটি নাইন। আরে বলে কি! নিজের টাক মাথার চুল নিজেই টেনে ছিঁড়ছে আর বলছে, ‘এসব পাগলামির মানে কী?’
কইতরী বেগম জানে তার হট মেজাজি স্বামীর স্বভাব। এখন কিছু বলতে গেলে বারুদের মতো ফুরুত করে জ্বলে উঠবে। অতএব এমতাবস্থায় তাকেই একটু ধৈর্য ধরতে হবে। তাই ধীরস্থির গলায় বলল, ‘পেঁয়াজের দাম যে হারে বাড়াইছে তাতে আমাগো মতোন মানুষের বাসায় রান্নায় পেঁয়াজ খাইলে পরে পেটে আর ভাত-তরকারি জুটব না। পেঁয়াজ বাসায় আছে সেটাই আমাদের সাত জনমের কপাল। নাতী-নাতনীরা অন্তত বলতে পারবে—একদা আমাগো দাদার বাসায় পেঁয়াজ আছিল।’
আতা মিয়া এতক্ষণে ব্যাপারটি বুঝতে পারল। তবে কিছু কিছু মানুষের বুঝেও কোনো লাভ নেই। ড্রাইভার যদি যাত্রীদের ঝাঁকুনি খাওয়াতে চায় তাহলে উঁচু-নিচু বা ভাঙা রাস্তার প্রয়োজন হয় না, সমান রাস্তাতেও ঝাঁকাতে পারে। ড্রাইভার এটা ভালো করেই জানে যে, যাত্রীরা কিছুক্ষণ হৈ-হুল্লোড় করে ওই একই সিটে বসেই গন্তব্যে পৌঁছাবে।
আতা মিয়ার আট বছরের মেয়ে পেয়ারী এসে বাবাকে বলল, ‘জানো বাবা, আজ আম্মু বলেছে আমাকে আর
পেঁয়াজ দিয়ে মুড়ি মাখা খেতে দেবে না। পেঁয়াজ নাকি অনেক খরচ হবে। আরও কি বলেছে জানো! গরিবের নাকি ঘোড়ারোগ থাকতে নেই। আচ্ছা বাবা, ঘোড়ারোগটা কী?’
বাকরুদ্ধ আতা মিয়ার কাছে সে জবাব নেই। কিভাবে সে বলবে তার স্বল্প আয়ে ঊর্ধ্বগতির বাজারে নিত্যপণ্যের চাহিদা মেটাতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে। তার উপর গ্যাস-বিদ্যুতের ক্রমাগত মূল্যবৃদ্ধি যেন মরার উপর খাঁড়ার ঘা। মেয়ের প্রশ্নের উত্তর না দিয়েই বলল,
‘তোমার আম্মুকে পেঁয়াজ বাটা নিয়ে আসতে বলো তো আম্মু।’ পেয়ারী চলে গেল রান্নাঘরে আম্মুকে ডাকতে। ছোটবেলা থেকেই আতা মিয়ার মাথা হট, সেইসাথে নানা চিন্তা-ভাবনা করতে করতে অল্প বয়সেই মাঝখানটা টাক হয়ে গেছে। বন্ধুবান্ধবের অনেকে স্টেডিয়াম মাথা কেউবা টাকলু আতা বলে ডাকে। কইতরী বেগমের বান্ধবীরাও মাঝেমধ্যে খোঁচা মেরে কথা বলে। তাই বউয়ের পরামর্শে ইজ্জতের শেষ রক্ষা করতে কিছুদিন আগে এক হারবাল চিকিত্সকের শরণাপন্ন হয়েছিল। সেই চিকিত্সক মাথায় পেঁয়াজ বেটে পেস্ট বানিয়ে লাগাতে বলেছে। এতদিন ধরে নিয়মিত সেটাই করে আসছে। যদি কয়েকটা চুলও গজায় অন্তত টাকলু নামটা তো দূর হবে। প্রতিদিনের মতো কইতরী বেগম বাটিতে করে পেঁয়াজ বাটা এনে আতা মিয়ার টাক মাথায় লাগিয়ে দিচ্ছে।
কিন্তু একি! পেঁয়াজের ঝাঁঝ গেল কোথায়? এতক্ষণে আতা মিয়ার চোখের জল নাকের জল একাকার হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু সে রকম কিছু হচ্ছে না দেখে প্রশ্ন করল, ‘কি গো কইতরী বেগম, আজকাল কি পেঁয়াজের ঝাঁঝও চলে গেল নাকি?’
কইতরী বেগম সটাং করে জবাব দিল, ‘তুমি পেঁয়াজ কোথায় দেখলা? এটা তো আলুর পেস্ট। তোমার হট মাথা ঠাণ্ডা করনের লাইগা দিতাছি। দরকার হলে টাকলু মাথার স্বামী নিয়া ঘরসংসার করুম তবু এত দামি পেঁয়াজের রস মাথায় ঢালতে পারুম না!’

 

  • -লেখক- তুহিন সারোয়ার, (সাংবাদিক ,রম্য লেখক)
  • -বাংলাদেশ প্রতিনিধি -হিন্দুস্তান টাইম (ভারত) 
  • -ভাপ্রাপ্ত সম্পাদক- দৈনিক এই দেশ
  • -সি,ই,ও -চ্যানেল সিক্স, রেড়িও X, 
  • -চেয়ারম্যান, তুলি মিডিয়া এন্টারটেইনমেন্ট লি: