অর্থ মন্ত্রণালয়ের স্পষ্টীকরণ চিঠিতেও বঞ্চিত হচ্ছেন বেসরকারি শিক্ষকরা!

প্রকাশিত

নানা বৈষম্যের শিকার বেসরকারি শিক্ষকরা নতুন করে বঞ্চনার শিক্ষার হচ্ছেন অর্থ বিভাগের ‘স্পষ্টীকরণ’ চিঠিতে। শিক্ষকদের উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট করতে গিয়ে সমস্যা আরও জটিল হওয়ায় ওই চিঠি প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন শিক্ষকরা। শিক্ষক নেতাদের অভিযোগ, বছরের পর বছর বিভিন্ন বৈষম্য নিরসন হচ্ছে না, এরমধ্যে অর্থ বিভাগের স্পষ্টীকরণের ‘অযৌক্তিক’ চিঠির কারণে নির্ধারিত সময়েও উচ্চতর গ্রেড পাচ্ছেন না শিক্ষকরা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (মাধ্যমিক) মো. মমিনুর রশিদ আমিন বলেন, ‘অর্থ মন্ত্রণালয় প্রথম চিঠিতে যেটা করেছিল, সেটায় যারা বিএড করেছিল তারা ১০ বছর পূর্তিতে উচ্চতর স্কেল পাচ্ছিলেন না। পরের চিঠিতে সে সমস্যা নেই। আর ১৬ বছর পূর্তিতে যে স্কেল পাওয়ার কথা সেটার জন্য হাতে সময় আছে, আদালতে মামলাও চলছে। তবে স্পষ্টীকরণ চিঠির শেষের লাইনে সমস্যা রয়েছে। এ বিষয়ে আমরা ব্যবস্থা নেবো, প্রয়োজনে নীতিমালা সংশোধন করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সালে জাতীয় বেতন স্কেল ঘোষণার পর এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের টাইম স্কেল বন্ধ হয়ে যায়। তবে ২০১৮ সালের এমপিও নীতিমালা অনুযায়ী শিক্ষকতার ১০ বছর পূর্তি এবং ১৬ বছর পূর্তিতে উচ্চতর গ্রেড দেওয়ার বিষয়টি যুক্ত করা হয়। কিন্তু গ্রেড পাওয়া নিয়ে জটিলতা থাকায় গত ৯ মার্চ অর্থ বিভাগের কাছে বিষয়টি স্পষ্ট করে জানতে চেয়ে চিঠি দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ওই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি স্পষ্ট করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে গত ৩১ মে চিঠি দেয় অর্থ বিভাগ।

চিঠিতে আরও বলা হয়, অর্থ বিভাগের ২০১৬ সালের ২১ সেপ্টেম্বর জারি করা ২৩২ নম্বর পরিপত্র হাইকোর্ট বিভাগ থেকে অকার্যকর ঘোষণা করা হয়েছে এবং এ রায়ের বিপরীতে আদালতে আপিল মামলা চলমান আছে বিধায় মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত জাতীয় বেতন-স্কেল-২০১৫ –এর ৭(২) অনুচ্ছেদের বিষয়ে করণীয় নেই।

অর্থ বিভাগের এই চিঠির পর শিক্ষকরা উচ্চতর গ্রেডের জন্য আবেদন জানালে জেলা শিক্ষা অফিস থেকে জানানো হয় চিঠি অস্পষ্ট। চিঠি স্পষ্ট করলে গ্রেড দেওয়ার বিষয়ে সুপারিশ করা যাবে। এই পরিস্থিতিতে শিক্ষকরা অর্থ বিভাগে ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের কাছে বিষয়টি স্পষ্ট করার দাবি জানান।

শিক্ষকদের দাবির পর শিক্ষা মন্ত্রণালয় অর্থ বিভাগের কাছে গত ২২ জুন চিঠি দিয়ে বিষয়টি স্পষ্ট করার অনুরোধ জানায়। সর্বশেষ অর্থ বিভাগ গত ১২ জুলাই শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে স্পষ্টীকরণ চিঠি দেয়।

ওই স্পষ্টীকরণ চিঠিতে বলা হয়, নিম্ন-মাধ্যমিক/মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এমপিওভুক্ত বিএড ডিগ্রিবিহীন শিক্ষকরা ডিগ্রি অর্জন সাপেক্ষে দশম গ্রেড (শিক্ষায় ডিগ্রি অর্জনের জন্য উচ্চতর গ্রেড) পাওয়ার তারিখ থেকে ২০১৮ সালের এমপিও নীতিমালার ১১(৫)নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ১০ বছর সন্তোষজনক চাকরির পূর্তিতে উচ্চতর গ্রেড পাবেন, সমগ্র চাকরি জীবনে দুটির বেশি উচ্চতর গ্রেড পাবেন না। উল্লেখ্য, বিএড ডিগ্রি পাওয়ার গ্রেডটি উচ্চতর স্কেলও এ ক্ষেত্রে উচ্চতর স্কেল হিসেবে বিবেচিত হবে।

অর্থ বিভাগের এই চিঠির পর বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ লিয়াজোঁ ফোরাম শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের কাছে বিষয়টি স্পষ্ট করার দাবি জানায়। এরপর গত ১২ জুলাইয়ের চিঠির পর শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও অর্থ বিভাগে ওই চিঠি বাতিলের দাবি জানিয়ে আবেদন করেন শিক্ষক নেতারা।

এরপর শিক্ষা মন্ত্রণালয় গত ২১ জুলাই অর্থ বিভাগের ওই স্পষ্টীকরণ চিঠি অনুযায়ী সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয়।  এই চিঠির পর শিক্ষক নেতরা চিঠি বাতিলের দাবিতে সোচ্চার হন এবং আন্দোলনের হুমকি দিয়ে চিঠি প্রত্যাহার চান।

বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ লিয়াজোঁ ফোরামের মুখপাত্র মো. নজরুল ইসলাম রনি বলেন, ‘প্রথম চিঠি স্পষ্ট না হওয়ায় জেলা শিক্ষা অফিসাররা গ্রেড পাওয়ার আবেদনে সুপারিশ করেননি। এখন অর্থ মন্ত্রণালয়ের স্পষ্টীকরণ চিঠির পর তারা বিএড স্কেলকে একটি উচ্চতর গ্রেড হিসেবে বিবেচনা করে চাকরির ১০ বছর পূর্তি হওয়া শিক্ষকদের উচ্চতর স্কেল দিতে সুপারিশ করছেন না। শিক্ষা অফিসাররা বলছেন, একটি উচ্চতর (বিএড হিসেবে) গ্রেড শিক্ষকরা পেয়েছেন।  পরবর্তীটা ১৬ বছর পর পাবেন। ’

মো. নজরুল ইসলাম রনি আরও বলেন, ‘স্পষ্টীকরণ চিঠিতে সমস্যার সমাধান না করে আরও সমস্যা সৃষ্টি করা হয়েছে। তাই আমাদের দাবি ওই অর্থ মন্ত্রণালয়ের চিঠি বাতিল করে করে নতুন করে চিঠি ইস্যু করা হোক। অথবা শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে বিএড-ভুক্তদের ১০ বছর পূর্তিতে উচ্চতর গ্রেড দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে নতুন চিঠি ইস্যু করা হোক। শিক্ষকরা যদি গ্রেড বঞ্চিত হতে থাকেন তাহলে আন্দোলনে যাওয়া ছাড়া পথ থাকবে না শিক্ষকদের। ‘

মো. নজরুল ইসলাম রনি জানান, নীতিমালা সংশোধন করে এমপিওভুক্তির পর থেকে ১০ বছরে একটি উচ্চতর স্কেল দাবি করা হয়েছে। বিএডের জন্য একটি প্রশিক্ষণ স্কেল থাকতে পারে, এটাকে উচ্চতর গ্রেড বিবেচনা করা অযৌক্তিক মনে করেন তিনি।