আতিক–তাবিথই প্রার্থী, অপেক্ষা আনুষ্ঠানিকতার

প্রকাশিত

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) উপনির্বাচনে প্রধান দুই দলের মেয়র প্রার্থী ঠিক করাই আছে। সরকারি দল আওয়ামী লীগের সবুজসংকেত নিয়ে গত মাস থেকেই মাঠে আছেন ব্যবসায়ী নেতা আতিকুল ইসলাম। আর বিএনপি তাদের গতবারের প্রার্থী তাবিথ আউয়ালকেই মনোনয়ন দিচ্ছে—এটাও প্রায় নিশ্চিত। এরপরও দলীয় মনোনয়নের ফরম বিক্রি ও জমা নেওয়াসহ আনুষ্ঠানিকতা অনুসরণ করা হচ্ছে।

কাল মঙ্গলবার আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ডের বৈঠক ডাকা হয়েছে। সেখানেই ডিএনসিসির মেয়র ও দুই সিটিতে নতুন যুক্ত হওয়া ৩৬টি ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর প্রার্থী চূড়ান্ত করা হবে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।

অন্যদিকে আজ সোমবার বিএনপির ফরম সংগ্রহ করা সম্ভাব্য প্রার্থীদের দলের গুলশান কার্যালয়ে সাক্ষাৎকার নেওয়া হবে। দলীয় সূত্র জানায়, এরপরই আনুষ্ঠানিকভাবে মেয়র প্রার্থী ঘোষণা করা হবে। তবে কাউন্সিলর পদের প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করা হবে পরে।

আওয়ামী লীগের প্রধান শেখ হাসিনার নেতৃত্বে স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ড আছে। তবে বিএনপিতে এমন কোনো বোর্ড নেই।

আগামী ২৬ ফেব্রুয়ারি ডিএনসিসির মেয়র পদে ভোট গ্রহণ হবে। আনিসুল হক মারা যাওয়ার পর ডিএনসিসির মেয়র পদ শূন্য হয়ে যায়। একই দিনে ডিএনসিসি ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) যুক্ত হওয়া ১৮টি করে মোট ৩৬টি নতুন ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর পদেও ভোট হবে। মেয়র পদে দলীয় প্রতীকে ভোট হবে। কাউন্সিলর পদ নির্দলীয়।

নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসিল অনুসারে, মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া যাবে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত। মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই হবে ২১ ও ২২ জানুয়ারি। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ২৯ জানুয়ারি।

মেয়র পদ শূন্য হওয়ার পর থেকেই আওয়ামী লীগের একাধিক প্রার্থী মাঠে নেমে পড়েন। তবে আইনি জটিলতায় নির্বাচন আটকে যায় কি না—এই আশঙ্কায় বিএনপি ধীরে চলো নীতি নিয়েছিল। নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণার পর তৎপর হয় বিএনপিসহ অন্যান্য দল।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি আবদুল্লাহ আল ক্বাফী ওরফে ক্বাফী রতন এবং গণসংহতি আন্দোলনের আহ্বায়ক জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি প্রার্থী হওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছেন। এই দুজন গত নির্বাচনেও প্রার্থী হয়েছিলেন। তবে এবার বাম দলগুলোর মধ্য থেকে এঁদের একজনকে প্রার্থী করার বিষয়ে আলোচনা চলছে। আজ এই বিষয়ে চূড়ান্ত বৈঠক হবে।

জোনায়েদ সাকি নির্বাচন কমিশন থেকে আজ মনোনয়ন ফরম কিনতে যাবেন বলে জানিয়েছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, কর্মীদের নিয়ে বৈঠক চলছে। বাম দলগুলোর মধ্যে একক প্রার্থী দেওয়ার জন্যও চেষ্টা চলছে। একই কথা বলেছেন ক্বাফী রতনও।

বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি সেলিম উদ্দিনও প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। 
তবে বিএনপি জোটের একক প্রার্থী করার চেষ্টা চালাচ্ছে। জামায়াতের সঙ্গে এই বিষয়ে সমঝোতা হয়ে যাবে বলেও মনে করছেন দলের নীতিনির্ধারকেরা।

এর বাইরে সংগীতশিল্পী শাফিন আহমেদ মেয়র পদে নির্বাচন কমিশন থেকে ফরম সংগ্রহ করেছেন। মাহমুদুর রহমান মান্নার নাগরিক ঐক্য ও ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনও মেয়র পদে প্রার্থী দিতে পারে বলে জানা গেছে।

আ.লীগের মনোনয়ন ফরম কিনেছেন ১২ জন

কাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় গণভবনে আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ডের সভা ডাকা হয়েছে। এতে সভাপতিত্ব করবেন দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর আগে দলের আগ্রহী প্রার্থীদের মধ্যে গত শনিবার থেকে মনোনয়ন ফরম বিক্রি শুরু হয়। গতকাল রোববার পর্যন্ত মেয়র পদে আতিকুল ইসলাম, সাবেক সাংসদ এইচ বি এম ইকবালসহ ১২ জন ফরম কিনেছেন। আজ সন্ধ্যার মধ্যে তা জমা দেওয়ার শেষ সময়।

আতিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, গতকাল তিনি বিশ্ব ইজতেমায় কাটিয়েছেন, কুশল বিনিময় করেছেন। আজ দলীয় কার্যালয়ে মনোনয়ন ফরম জমা দেবেন। শুভাকাঙ্ক্ষীরাও সঙ্গে থাকবেন।

এর আগে গত ২৩ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর বৈঠকে আতিকুল ইসলামকে দলীয় প্রার্থী করার ইঙ্গিত দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর থেকেই তিনি প্রচারে নেমে পড়েন। ৬ জানুয়ারি দলের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে এক নেতা ঢাকা উত্তরের মেয়র পদে কাকে প্রার্থী করা হচ্ছে, এমন প্রশ্ন করলে দলীয় প্রধান অতিকুলকেই ইঙ্গিত করেন। তবে সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেই প্রার্থী ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত হয়।

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের শরিকদের মধ্যে মেয়র হওয়ার ঘোষণা দেয়নি কেউ। আজ আওয়ামী লীগের ধানমন্ডির কার্যালয়ে ১৪ দলের বৈঠক ডাকা হয়েছে। সেখানে আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে ১৪ দলের ঐক্যবদ্ধ প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হবে বলে আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে।

কাউন্সিলর পদেও একক প্রার্থী

নতুন যুক্ত হওয়া ওয়ার্ডেও একক কাউন্সিলর প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আওয়ামী লীগ। তিন ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদেও একক প্রার্থী দিতে চায় দলটি। এ জন্য এসব পদেও কেন্দ্রীয়ভাবে প্রার্থী ঠিক করে মনোনয়ন দেওয়া হবে।

এ বিষয়ে দলের পক্ষ থেকে পাঠানো লিখিত নির্দেশনায় বলা হয়েছে, সম্ভাব্য কাউন্সিলর প্রার্থীদের তিনজনের নামের একটি প্যানেল মহানগর, থানা ও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের যৌথ স্বাক্ষরে ১৫ জানুয়ারির মধ্যে পাঠাতে হবে। এতে প্রার্থীদের যোগ্যতা, নেতৃত্বের গুণাবলি, জনপ্রিয়তা ইত্যাদি বিষয় উল্লেখ করতে হবে। সেখান থেকে মনোনয়ন বোর্ড একজনের নাম চূড়ান্ত করবে।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় একজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, দলীয় প্রধান ঢাকার প্রায় সব নেতাকেই চেনেন এবং সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে জরিপও করেছেন। ফলে কাউন্সিলর পদে কাকে মনোনয়ন দেওয়া হবে, এটা অনেকটাই দলীয় প্রধানের বিবেচনা ও জরিপের ফলের ওপর নির্ভর করবে।

বিএনপির ফরম কিনেছেন পাঁচজন

ডিএনসিসির উপনির্বাচনে মেয়র পদে বিএনপির মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন দলটির নির্বাহী কমিটির সদস্য তাবিথ আউয়াল ও বিশেষ সম্পাদক আসাদুজ্জামানসহ (রিপন) পাঁচজন। তাঁদের মধ্যে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সভাপতি এম এ কাইয়ুমের পক্ষে মহানগর উত্তর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি বজলুল বাসিত মনোনয়ন সংগ্রহ করেন। মামলায় আসামি হয়ে এম এ কাইয়ুম দীর্ঘদিন আত্মগোপনে আছেন। আজ মনোনয়ন ফরম বিক্রি ও জমার শেষ দিন।

গতকাল বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেন তাবিথ আউয়াল। তিনি গতকাল সন্ধ্যায় প্রথম আলোকে বলেন, তিনি আজ মনোনয়নপত্র জমা দেবেন। এর মধ্যে সাংগঠনিক প্রস্তুতি চলছে। দল মনোনয়ন দিলে মাঠে নেমে যাবেন।

এর আগে দুপুরে দলীয় কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘এর আগের নির্বাচনে দল আমাকে সমর্থন দিয়েছিল। তখন সেই নির্বাচনে দল আমার নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে সন্তুষ্ট হয়েছিল। এবারও আমি আশা করছি মনোনয়ন পাব।’

মনোনয়ন ফরম সংগ্রহের পর আসাদুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, অবিভক্ত ঢাকা নগর থাকতেই মেয়র পদে নির্বাচন করতে খালেদা জিয়ার কাছে আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন তিনি। ঢাকা বিভক্ত হওয়ার পরও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিতে বরাবরই তাঁর আগ্রহ ছিল। তিনি বলেন, ‘আমার পড়ালেখা, অভিজ্ঞতা, সাংগঠনিক পরিচয় ও যোগ্যতা—সবকিছু মিলিয়ে দল বিবেচনা করবে, এটা প্রত্যাশা করছি।’

এদিকে গত গত রাতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে ডিএনিসির মেয়র পদের প্রার্থী নিয়ে আলোচনা হয়। তাবিথ আউয়ালই দলীয় প্রার্থী—এমনই আলোচনা হয় বলে বিএনপির উচ্চপর্যায়ের সূত্র জানিয়েছে। তিনি গত নির্বাচনেও বিএনপির প্রার্থী হয়ে তিন লাখের বেশি ভোট পেয়ে আনিসুল হকের কাছে হেরে যান। অবশ্য জাল ভোট ও জবরদস্তির অভিযোগ এনে তিনি দুপুরের পরই নির্বাচন বর্জন করেন।

বিএনপির সূত্র জানায়, স্থায়ী কমিটির বৈঠক শেষে প্রার্থী ঘোষণা করা হলে সরকারি দল প্রচার করার সুযোগ পাবে যে বিএনপিতে গণতন্ত্র নেই। আগ্রহীদের অন্য প্রার্থীদের মধ্যেও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া হতে পারে। তাই মনোনয়ন ফরম বিক্রি ও সম্ভাব্য প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এসব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করেই প্রার্থী ঘোষণা করা হবে।

মেয়র পদে উপনির্বাচন হলেও ডিএনসিসি নির্বাচন রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। গত মাসেই রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জাতীয় পার্টির কাছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ভরাডুবি হয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে রাজধানীর এই নির্বাচন বড় দলগুলোর জনপ্রিয়তা প্রমাণের উপলক্ষ্য হিসেবে দেখা দিয়েছে। তবে আইনি জটিলতায় নির্বাচন আটকে যায় কি না এবং ভোট সুষ্ঠু হবে কি না—এই দুই আশঙ্কা নিয়েই বিরোধী দলগুলো নির্বাচনী তৎপরতা শুরু করেছে। অন্যদিকে রংপুরে পরাজয়ের পর ঢাকায় জয়ের নিশ্চয়তা কতটুকু ও ভোট সুষ্ঠু না হলে এর প্রভাব কী হতে পারে—এই বিষয়গুলো সরকারি দলকে ভাবাচ্ছে।