‘আর কারও সন্তান যেন জঙ্গি না হয়’

প্রকাশিত

‘আমি হতভাগ্য পিতা, আবার হতভাগ্য দাদাও। জঙ্গিবাদের বিষবাষ্প আমার সন্তান ও এক নাতিকে কেড়ে নিয়েছে। যে সন্তান জীবনে একটি মিথ্যা কথা বলেনি, সে কি-না জঙ্গিবাদে জড়িয়েছে! ইসলামের ভুল ব্যাখ্যা নিয়ে বাবার সঙ্গে প্রতারণা করেছে! বিদেশে থাকার কথা বলে দেশে গোপনে উগ্রবাদী কার্যক্রম চালিয়েছে!’

মিন্টো রোডের কার্যালয়ে গতকাল শনিবার ‘মৌলবাদ-উগ্রবাদ প্রতিরোধ :পরিবার ও সমাজের ভূমিকা’ শীর্ষক দিনব্যাপী কর্মশালার আয়োজন করে কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি)। সেখানে আজিমপুরে জঙ্গি আস্তানায় নিহত তানভীর কাদেরীর বাবা সত্তরোর্ধ্ব বাতেন কাদেরী এসব কথা বলেন। তানভীর ছাড়াও জঙ্গি অভিযানে নিহত হয় তানভীর কাদেরীর যমজ সন্তানের একজন আফিফ কাদেরীও। আফিফের আরেক ভাই তাহরীম কাদেরীকে পুরান ঢাকার একটি আস্তানা থেকে গ্রেফতার হয় তার মাসহ।

জামিন পাওয়ার পর নতুন জীবন শুরু করেছে কিশোর তাহরীম।

গতকাল দাদার সঙ্গে ছিল সে। সেও বলেছে, কীভাবে জঙ্গিবাদে জড়িয়ে তার পুরো পরিবার তছনছ হয়ে গেছে।

শুধু তাহরীম ও তার দাদা নন, গুলশানের হলি আর্টিসানে নিহত একাধিক উগ্রপন্থির পরিবারের সদস্য ও জামিনপ্রাপ্ত যেসব জঙ্গি ভালো পথে ফিরে নতুনভাবে জীবন শুরু করেছে, তারাও শুনিয়েছে নানা গল্প। তাদের খোলামেলা আলোচনায় জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে ভবিষ্যৎ করণীয় বিষয়টিও উঠে আসে। এই প্রথম উগ্রবাদের শিকার পরিবার ও জামিনপ্রাপ্ত জঙ্গিদের নিয়ে এ ধরনের ব্যতিক্রমী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হলো।

কর্মশালায় মুখ্য আলোচক ছিলেন সিটিটিসির প্রধান মনিরুল ইসলাম। স্বাগত বক্তব্য দেন সিটিটিসির যুগ্ম কমিশনার আমিনুল ইসলাম, মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিটিটিসির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবদুল মান্নান। এ সময় অন্যানের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সিটিটিসির ডিসি মহিবুল ইসলাম ও সুনন্দা রায়।

আলোচকরা বলেন, ভবিষ্যতে কারও মা-বাবাকে যেন জঙ্গিবাদের নিষ্ঠুর পরিণতির শিকার না হতে হয়, সে ব্যাপারে লক্ষ্য রাখতে হবে। সহনশীল নতুন প্রজন্ম গড়ে তোলা জরুরি। যারা এরই মধ্যে ভুল বুঝতে পেরে উগ্রবাদের পথ ছেড়ে এসেছে, নতুনভাবে জীবন শুরু করার সুযোগ দিতে হবে তাদের। এ ছাড়া জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে সকল সংস্থার সমন্বয় আরও বাড়ানোর তাগিদ দেওয়া হয়।

পরিবারে সন্তানদের যে কোনো মতামতের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনার কথা বলেন অনেকে। সেই মতামত সঠিক না হলে তাদের সুন্দরভাবে বোঝাতে হবে। জঙ্গিবাদে আকৃষ্ট হওয়ার পেছনে অনেকে ইন্টারনেটের অবাধ ব্যবহারের সুযোগ পাওয়াকে দায়ী করেন। ধর্মের কোমল চর্চার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। আর যেন কোনো মা-বাবাকে এই পরিণতির শিকার হতে না হয়- সে ব্যাপারেও সতর্ক থাকার কথা একাধিক ব্যক্তির আলোচনায় উঠে আসে।

সিটিটিসির প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘শুধু মেরে-কেটে আর জেলে পুরে জঙ্গিবাদ নির্মূল করা যাবে না। সঠিক ব্যাখ্যা দিয়ে জঙ্গিদের ভুল পথ থেকে সঠিক পথে আনতে হবে। কেউ নিখোঁজ হলে তা না লুকিয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানাতে হবে। দেশে যেসব নারী উগ্রবাদে জড়িয়েছে, তারা কেউ স্বেচ্ছায় নয়; হয় তারা স্বামীর চাপাচাপি অথবা হুমকির পর ভুল পথে পা বাড়িয়েছে।’

মিরপুরের রূপনগরে নিহত মেজর (অব.) জাহিদুল ইসলামের শ্বশুর মোমিনুল ইসলাম বলেন, ‘জঙ্গিরা যেসব ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে তরুণদের উগ্রবাদের পথে নিচ্ছে তার সঙ্গে কোরআন ও হাদিসের নূ্যনতম সম্পর্ক নেই। ইসলামের কোথাও মানুষ হত্যার কথা বলা নেই। জঙ্গিবাদ প্রতিরোধ শুধু পুলিশের একার ব্যাপার নয়, দেশের সব মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। কানাডায় গিয়ে জাহিদ জঙ্গিবাদে জড়িয়েছে। পরিবারের সবার মতামত অগ্রাহ্য করে ২০১৬ সালের শেষের দিকে সেখান থেকে আসার পরপরই সে চাকরি ছাড়ার প্রক্রিয়া শুরু করে। বাসা থেকে যাওয়ার সময় তার মেয়ের মোবাইল সিমও নষ্ট করে দিয়ে যায় সে।’

মোমিনুল ইসলাম এও বলেন, ‘যারা জঙ্গি হয়েছে তারা এরই মধ্যে শাস্তি পেয়েছে। তবে তাদের পরিবারের যারা জেলখানায় আছে, তারা যেন সেখানে মানবিক আচরণ পান।’

কল্যাণপুরের জঙ্গি আস্তানা থেকে গ্রেফতার রাকিবুল ইসলাম রিগ্যানের মা রোকেয়া আক্তার বলেন, ‘শিহাব নামে এক ভাড়াটিয়ার কারণে তার সন্তান জঙ্গিবাদে জড়ায়। ছেলে নিখোঁজ হওয়ার পর পুলিশ-র‌্যাবের কাছে গিয়েছি। কবিরাজ-ফকির ধরেছি। কেউ তখন খবর দিতে পারেনি।’ আক্ষেপ নিয়ে তিনি একটা প্রশ্ন করেন- কোনো ভালো ছেলেকে যে জঙ্গিবাদে জড়িয়েছে তার দায় বেশি, না যাকে জড়ানো হয়েছে তার?

কুমিল্লা থেকে গ্রেফতার এক জঙ্গির বাবা বলেন, হঠাৎ দেখলাম ছেলে পড়াশোনায় অমনোযোগী। এরপর তার পরামর্শে গৃহশিক্ষক রাখলাম। পরে বেরিয়ে আসে ওই গৃহশিক্ষক জঙ্গি গ্রুপের সদস্য। নিজে দেশের প্রথম অ্যান্টি টেররিস্ট প্লাটুন কমান্ডার ছিলাম। স্বপ্ন ছিল ছেলে সেনা কর্মকর্তা হবে। তবে সেই স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। ভুল বুঝতে পেরে জঙ্গি আস্তানা থেকে ফেরত আসার পর পুনরায় নতুনভাবে জীবন শুরু করা যায়- এ বিশ্বাস যাতে উগ্রপন্থিদের মধ্যে জন্মায়, সেটার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। আর তারা যদি মনে করে ভালো পথে ফেরার বদলে ‘মৃত্যু’ তাদের কপালে লেখা আছে, তাহলে পুরনো বিশ্বাস আঁকড়ে ধরে থাকবে অনেকে। তিনি এও বলেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সুন্দর জীবনে যারা ফেরত আসতে চায়, সুযোগ দেওয়া উচিত তাদের।

গুলশানের হলি আর্টিসানে নিহত নিবরাস ইসলামের বাবা নজরুল ইসলাম বলেন, ‘টেলিভিশনে ফিলিস্তিনের ওপর নির্যাতন দেখলে নিবরাস তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখাত। তবে তখনও বুঝিনি এটা জঙ্গিবাদে জড়ানোর ধাপ। কীভাবে বুঝব, ছেলে জীবনে মদ-গাঁজা স্পর্শ করেনি, খেলাধুলা নিয়ে ব্যস্ত থাকত, মোনাশে পড়ত। নিবরাসের বিরুদ্ধে কখনও কেউ অভিযোগ দেয়নি। সেই ছেলে কি-না এমন ঘটনায় জড়াল!’

নজরুল ইসলাম আরও বলেন, জঙ্গিবাদের পথ থেকে যারা এরই মধ্যে ফিরে এসেছে, তাদের পুনর্বাসন দরকার। যারা কারাগারে আছে, শুনতে হবে তাদের কথাও।

নিবরাসের মা বলেন, ছেলে কত ভালো ছিল, সেটা মা হিসেবে আমার চেয়ে কেউ বেশি জানে না। ওরা ভালো ছেলেগুলোকে টার্গেট করে উগ্রবাদে জড়িয়েছে।

আরেক জঙ্গির মা বলেন, সন্তান বিপথে গেলে তার মা-বাবা বোঝেন এর বেদনা কত গভীর। কোমলমতি এসব কিশোর-তরুণের মনের কোথায় আঘাত করতে হবে, তা বোঝে জঙ্গিবাদে রিক্রুটকারীরা। জঙ্গিবাদের থাবা থেকে সন্তানকে বাঁচাতে হলে সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে পরিবারকে।

জেল থেকে জামিনপ্রাপ্ত এক জঙ্গি বলেন, সমাজে পারিবারিক বন্ধন আলগা হয়ে যাচ্ছে। সন্তানরা তাদের কথা বলার জন্য নির্ভরশীল কাউকে পাচ্ছে না। এতে কোনো খারাপ বন্ধুর পাল্লায় পড়ে জঙ্গি হচ্ছে। জেলখানায় সব জঙ্গিকে একই জায়গায় রাখায় তারা পরস্পরের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করে পুনরায় সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। তথ্য পাচার করছে তারা। এ ছাড়া জেল থেকে যারা ছাড়া পাচ্ছে, তাদের সঙ্গে যাতে পরিবারের সদস্য ও পরিচিতজন মানবিক আচরণ করেন, খেয়াল রাখতে হবে সেটাও। এ ছাড়া জঙ্গিবাদ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে গণমাধ্যম কর্মীদের আরও সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানানো হয়। প্রতি মাসে অন্তত একবার জেলখানায় গিয়ে বন্দি জঙ্গিদের উদ্দেশে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের মোটিভেশনাল বক্তব্য দেওয়া উচিত।

কী কী আচরণ দেখলে সন্তান উগ্রবাদে জড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে- তাও তুলে ধরা হয়েছে। সাধারণত কেন তরুণরা জঙ্গিবাদে জড়াচ্ছে, উল্লেখ করা হয় তাও। সেখানে বলা হয়, আন্তর্জাতিক রাজনীতির ভূমিকা, ষড়যন্ত্র, সামাজিকীকরণের প্রভাব হ্রাস, সংস্কৃতিচর্চা কমে যাওয়া, হতাশা, দরিদ্রতা, স্বামীর প্রতি অন্ধ অনুগত, রোমাঞ্চকর মানসিকতা, কোরআন-হাদিসের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে জঙ্গিবাদে জড়ানো হয়।