আ. লীগে প্রবীণ হটানোর লড়াই জামায়াতে ‘ক্ষুব্ধ’ বিএনপি

প্রকাশিত

খুলনার উপকূলীয় উপজেলা পাইকগাছা ও কয়রা নিয়ে গঠিত খুলনা-৬ আসন। এটি জাতীয় সংসদের ১০৪ নম্বর নির্বাচনী এলাকা।

ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, জলাবদ্ধতা, নদীভাঙনসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ এ এলাকার মানুষের নিত্যসঙ্গী। আবার লবণাক্ততা, ঘের নিয়ে বিরোধও কম নয় এখানে।

কয়রা-পাইকগাছার ১৭টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত এ আসনে ভোটার সংখ্যা প্রায় তিন লাখ। নির্বাচন এগিয়ে আসতেই সরব হয়ে উঠছেন আওয়ামী লীগ, বিএনপি জোটসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা। খুলনা জেলার ছয়টি সংসদীয় আসনের মধ্যে বড় দুটি রাজনৈতিক দলের সবচেয়ে বেশি প্রার্থী পাইকগাছা-কয়রায়। আছে নবীন-প্রবীণের তীব্র লড়াই। এর পরও বিগত নির্বাচনগুলোর মতো আগামী নির্বাচনেও এ আসনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বলে সাধারণ ভোটাররা মনে করছে।

এখানে আওয়ামী লীগের একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশী রয়েছেন। প্রবীণদের হটিয়ে নবীনরা উঠে আসার চেষ্টা করছেন।

অন্যদিকে বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীরা আর এ আসনটি জোটের শরিক জামায়াতকে ছেড়ে দিতে চায় না।

বিগত নির্বাচনগুলো পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ১৯৭৩ সালে এ আসনে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের তৎকালীন নেতা স ম বাবর আলী। ১৯৭৯ সালে বিএনপির শেখ রাজ্জাক আলী এবং ১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টির মোমিন উদ্দীন আহমেদ নির্বাচিত হন। এরশাদের স্বৈরশাসনের অবসানের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করেন জামায়াতের শাহ্ মুহাম্মদ রুহুল কুদ্দুস। ১৯৯৬ সালে দ্বিতীয়বারের মতো অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের শেখ মো. নূরুল হক জয়লাভ করেন। ২০০১ সালে আবার জামায়াতের শাহ্ মুহাম্মদ রুহুল কুদ্দুস সংসদ সদস্য হন। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের সোহরাব আলী সানা এবং সর্বশেষ ২০১৪ সালে একই দলের শেখ মো. নূরুল হক সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

আওয়ামী লীগ : আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী যেসব নেতা এরই মধ্যে গণসংযোগ শুরু করেছেন তাঁদের মধ্যে রয়েছেন বর্তমান সংসদ সদস্য শেখ মো. নূরুল হক, সাবেক সংসদ সদস্য সোহরাব আলী সানা, খুলনা জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি গাজী মোহাম্মদ আলী, সাংগঠনিক সম্পাদক আখতারুজ্জামান বাবু, পাইকগাছা উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্যসচিব সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মো. রশীদুজ্জামান মোড়ল ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাবেক সহসম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার প্রেমকুমার মণ্ডল। তবে সবাইকে ছাপিয়ে এ আসনে প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান শেষ পর্যন্ত প্রার্থী হলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। তবে খুলনা-৪ আসনেও তিনি প্রার্থী হতে পারেন বলে আলোচনা রয়েছে।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের বর্তমান ও সাবেক দুই সংসদ সদস্য পড়েছেন তীব্র ভাবমূর্তি সংকটে। ফলে বর্তমানে বলা কঠিন এই আসনে আওয়ামী লীগের টিকিট কে পাচ্ছেন। বর্তমান সংসদ সদস্য শেখ মো. নূরুল হককে নিয়ে নির্বাচনী এলাকায় আলোচনার শেষ নেই। একটি পরিবারের যাতায়াত পথ বন্ধ করে দিয়ে তিনি গেল বছর সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছিলেন। এ ছাড়া তিনি ও তাঁর সন্তানদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, সালিস-বিচারের নামে পক্ষপাতিত্ব, নিজ দলের প্রতিপক্ষকে হয়রানির অভিযোগ রয়েছে।

অন্যদিকে সাবেক সংসদ সদস্য সোহরাব আলী সানাও এলাকায় ব্যাপক আলোচিত। দলের একাংশের অভিযোগ, এর আগে সংসদ সদস্য থাকাকালে তিনি পরিবারতন্ত্রের মধ্যে আবদ্ধ ছিলেন। তখন তাঁর স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে ও জামাই নিয়োগ বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েন। আবার সংসদ সদস্য হলে একই অবস্থা হতে পারে বলে অভিযোগকারী নেতাকর্মীরা আশঙ্কা করছেন।

প্রবীণ এই দুই নেতার বাইরে আরেক প্রবীণ নেতা জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি গাজী মোহাম্মদ আলী। তিনি ১৯৯৬ সাল থেকে এ পর্যন্ত দলীয় মনোনয়ন চেয়েও পাননি। বরং প্রার্থীর প্রধান নির্বাচনী এজেন্টের দায়িত্ব পালন করেন।

পাইকগাছা উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্যসচিব ও সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মো. রশীদুজ্জামান মোড়ল। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) একসময়ের এই নেতা লবণ পানিতে ঘের বিরোধী আন্দোলনের নেতা হিসেবে এলাকায় পরিচিত। দলীয় মনোনয়ন পেতে দীর্ঘদিন তৃণমূল পর্যায়ে কাজ করছেন।

তবে প্রবীণ নেতাদের ছাপিয়ে এ আসনে তরুণ সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে নজর কেড়েছেন খুলনা জেলা যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আখতারুজ্জামান বাবু। তিনি নির্বাচনী এলাকার বিভিন্ন সামাজিক, ধর্মীয় অনুষ্ঠানসহ দলের নানা কর্মসূচিতে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছেন। প্রতিদিনই তিনি ওই এলাকায় গণসংযোগ চালাচ্ছেন।

এ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী আরেক নেতা হলেন ইঞ্জিনিয়ার প্রেমকুমার মণ্ডল। তিনিও কয়রা-পাইকগাছার বিভিন্ন গ্রাম-মহল্লায় গণসংযোগ চালাচ্ছেন।

জানতে চাইলে বর্তমান সংসদ সদস্য শেখ মো. নূরুল হক বলেন, ‘আমি দীর্ঘদিন এলাকার সাধারণ মানুষের সঙ্গে কাজ করছি। আগামী নির্বাচনেও প্রার্থী হতে চাই। ’

অভিযোগ প্রসঙ্গে সংসদ সদস্য বলেন, ‘আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের অধিকাংশই অপপ্রচার। নির্বাচনে এর কোনো প্রভাব পড়বে না। ’

সাবেক সংসদ সদস্য সোহরাব আলী সানা বলেন, ‘আমি বিপুল ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে কয়রা-পাইকগাছায় কোটি কোটি টাকার উন্নয়নমূলক কাজ করেছি। সার্বক্ষণিকভাবে জনগণের কাতারে ছিলাম এবং এখনো আছি। ’

গাজী মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর ৬ দফা থেকে শুরু করে এখনো পর্যন্ত দলের প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নিয়েছি। কখনো আপস না করে সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করেছি। বিগত নির্বাচনগুলোতে দলের মনোনয়ন চেয়েও পাইনি। দল যে দায়িত্ব দিয়েছে সেই দায়িত্ব পালন করেছি। তাই এবার এ আসনে মনোনয়ন চাইব। ’

জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আখতারুজ্জামান বাবু বলেন, ‘ছাত্ররাজনীতি থেকে যুব রাজনীতি এবং এখন দলের হয়ে পাইকগাছা ও কয়রার মানুষের পাশে থেকে কাজ করছি। তাদের সুখে-দুঃখে পাশে থাকার চেষ্টা করছি। তৃণমূলের মতামতকে প্রাধান্য দেওয়া হলে দলীয় মনোনয়ন পাব বলে আশা করি। ’

পাইকগাছা উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্যসচিব মো. রশীদুজ্জামান মোড়ল বলেন, ‘আমি পূর্বে পাইকগাছা উপজেলা চেয়ারম্যান ছিলাম। দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূলে জনমানুষের সঙ্গে মিশে রাজনীতি করছি। গত সংসদ নির্বাচনে এ আসনে দলের মনোনয়ন চেয়েছিলাম, এবারও চাইব। ’

বিএনপি : পাইকগাছা উপজেলা বিএনপির সভাপতি ডা. আব্দুল মজিদ, দলের কয়রা উপজেলা শাখার সভাপতি মোমরেজুল ইসলাম, জেলা শাখার সহসভাপতি মনিরুজ্জামান মন্টু, ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা মো. রফিকুল ইসলাম ও খুলনা মহানগর জামায়াতের আমির আবুল কালাম আজাদ ২০ দলীয় জোটের মনোনয়ন চাইবেন বলে আলোচনা রয়েছে।

তবে বিএনপি নেতারা বলছেন, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে তাঁরা কোনোভাবেই জামায়াতকে এ আসনে ছাড় দিতে চান না। জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে এখানে বিএনপি প্রার্থীকেই মনোনয়ন দিতে হবে।

স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মী ও বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, খুলনা-৬ আসনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি জোটের শক্ত অবস্থান রয়েছে। এ আসনে একবার আওয়ামী লীগ প্রার্থী জয়লাভ করেন তো পরের বার বিএনপি জোটের প্রার্থী জেতেন। বিএনপি জোট থেকে জামায়াতের প্রার্থীই মনোনয়ন পেয়ে আসছেন।

তবে বর্তমানে জামায়াত-শিবিরের সেই শক্ত অবস্থান নেই। নেই সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডও। দীর্ঘদিন শরিক জামায়াতকে ছাড় দেওয়ায় ক্ষুব্ধ স্থানীয় বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীরা। তাই কে বিএনপি ও ২০ দলীয় জোটের মনোনয়ন পাবেন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

বিএনপির পাইকগাছা উপজেলা শাখার আহবায়ক ডা. আব্দুল মজিদ বলেন, বিএনপি একটি সুসংগঠিত বৃহৎ রাজনৈতিক দল। পাইকগাছায় শক্ত অবস্থান থাকা সত্ত্বেও আজ পর্যন্ত স্থানীয়ভাবে নির্বাচন করতে কেউ আগ্রহ দেখায়নি। আগামী নির্বাচনে এ আসন থেকে নির্বাচন করার জন্য তিনি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। সাংগঠনিক কার্যক্রম বৃদ্ধির পাশাপাশি এ দুর্দিনে নেতাকর্মীদের পাশে থাকছেন। তাই তিনি জোট ও দলের কাছে মনোনয়ন চাইবেন।

কয়রা উপজেলা বিএনপির সভাপতি মোমরেজুল ইসলাম বলেন, খুলনার এ আসনে দীর্ঘদিন জোট শরিক জামায়াতকে ছাড় দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখনকার বাস্তবতা ভিন্ন। ভোটের হিসাবে বিএনপিই এগিয়ে। স্থানীয় সরকার পরিষদেও বিএনপির প্রতিনিধিত্ব বেশি। তাই জোট রক্ষায় এবার বিএনপি প্রার্থীকেই এ আসনে মনোনয়ন দিতে হবে। তা না হলে জনগণের যে আশা-আকাঙ্ক্ষা রয়েছে তার প্রতিফলন ঘটবে না।

অন্যান্য দল : একক প্রার্থী হিসেবে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় সদস্য ও পাইকগাছা উপজেলা শাখার সভাপতি মোস্তফা কামাল জাহাঙ্গীর, কমিউনিস্ট পার্টির সুভাষ সানা মহিম ও প্রশান্ত মণ্ডল, ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের নূর আহম্মদ নির্বাচনকেন্দ্রিক প্রচার চালাচ্ছেন।

জাতীয় পার্টির নেতা মোস্তফা কামাল জাহাঙ্গীর বলেন, তিনি রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি পাইকগাছা নাগরিক কমিটির ব্যানারে জনগণের দাবি আদায়ে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন-সংগ্রাম করে আসছেন। ২০১৪ সালের নির্বাচনে তিনি জাতীয় পার্টি থেকে মনোনয়ন পেলেও কেন্দ্রের সিদ্ধান্তে তা প্রত্যাহার করেন। আগামী নির্বাচনে দল তাঁকে চূড়ান্ত প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দেবে বলে তিনি আশাবাদী।

Be the first to write a comment.

Leave a Reply