উৎসবেও জৌলুসহীন কলকাতার সোনাগাছি

প্রকাশিত

বিশ্বজিৎ ঘোষ, কলকাতা:

দুর্গাপুজো হোক অথবা, বর্ষবরণ৷ কিংবা, বছরের অন্য যে কোনও সময় হোক অথবা, পার্বণ৷ উৎসবেও জৌলুসহীন থেকে যায় সোনাগাছি৷

কারণ, সোনাগাছির যৌনকর্মীদের উপার্জন ৭০ শতাংশ কমে গিয়েছে৷ আর, উপার্জন এ ভাবে কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ জুলুমবাজি৷ স্বাভাবিক ভাবেই, উপার্জন কমে যাওয়ার প্রভাব পড়ছে সেখানকার যৌনকর্মীদের এবং তাঁদের পরিবারের উপর৷

তিন বছর ধরে এমনই পরিস্থিতির মধ্য রয়েছে কলকাতার অন্যতম এই যৌনপল্লি৷ পশ্চিমবঙ্গের যৌনকর্মীদের অন্যতম সংগঠন দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটির তরফে এমনই জানানো হয়েছে৷ একই সঙ্গে জানানো হয়েছে, এই জুলুমের কারণ তোলাবাজি৷ এই তোলাবাজির পোশাকি নাম চাঁদা৷ বছরভর দুষ্কৃতীরা এই চাঁদার নামে জুলুমবাজি করে চলেছে৷

এবং, এই জুলুমবাজির শিকার যেমন হচ্ছেন সোনাগাছির যৌনকর্মীদের নিয়মিত এবং অনিয়মিত কাস্টমাররা৷ তেমনই শিকার হচ্ছেন খোদ দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটিরই কর্মীরা৷ শুধুমাত্র তাই নয়৷ দুষ্কৃতীদের এই জুলুমের শিকার হচ্ছেন যেমন সরকারি কাজে নিয়োজিত কর্মীরা৷ তেমনই, অন্য বিভিন্ন ধরনের মানুষও শিকার হচ্ছেন তোলাবাজির এই জুলুমে৷

দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটির তরফে এমনই জানানো হয়েছে, দুষ্কৃতীদের এই দলে পুরুষদের সঙ্গে মহিলারাও রয়েছে৷ এই সব মহিলা নকল যৌনকর্মী হিসাবে সোনাগাছির বিভিন্ন অংশে থাকে৷ যৌনতার পরিষেবা দেওয়ার ছল করে সোনাগাছিতে যাওয়া বিভিন্ন কাস্টমারের কাছে যা কিছু থাকে, সে সব জোর জবরদস্তি ছিনিয়ে নেয় তারা৷ জোর জবরদস্তির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কাস্টমারদের বিভিন্ন ধরনের ভীতি প্রদর্শনও করে তারা৷

এই কাজেও দলের পুরুষ দুষ্কৃতীরা ওই সব নকল যৌনকর্মীকে সহায়তা করে৷ তবে, শুধুমাত্র এমন ছিনতাইও নয়৷ পুরুষ দুষ্কৃতীরা বছর ভর কোনও না কোনও পার্বণের নামে চাঁদা সংগ্রহ করে সোনাগাছির বিভিন্ন অংশে৷ কেউ চাঁদা দিতে না চাইলে, তাঁর কাছে যা কিছু থাকে সে সব যেমন ছিনিয়ে নেওয়া হয়৷ এবং, একই রকম ভাবে এ ক্ষেত্রেও ভীতি প্রদর্শন করা হয়৷ পুলিশের একাংশের মদতে সোনাগাছিতে দিনের পর দিন দুষ্কৃতীদের এই তাণ্ডব চলছে বলে অভিযোগ করেছে দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটি৷

আর, এই ধরনের পরিস্থিতির জেরে সোনাগাছিতে কাস্টমারের সংখ্যা অনেক কমে গিয়েছে বলেও জানানো হয়েছে৷ কারণ, এমন বহু কাস্টমারই রয়েছেন, সোনাগাছিতে যৌনপরিষেবা নেওয়ার বিষয়টি যাঁরা গোপন রাখেন৷ স্বাভাবিক ভাবেই, তোলাবাজির এই জুলুমের জেরে এমন অনেক কাস্টমার এখন আর সোনাগাছিতে যান না বলেই দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটির তরফে জানানো হয়েছে৷ এ সব কারণে, আগে যেমন দুর্গাপুজো, ইংরেজি নববর্ষ, বড়দিন, দোলযাত্রা সহ বছরের অন্য বিভিন্ন উৎসবে সোনাগাছিতে দেখা মিলত অনিয়মিত অথবা নতুন কাস্টমারদের, তেমন কাস্টমারদের আর দেখা মিলছে না বলেও জানানো হয়েছে৷

কয়েক মাস আগে যৌনকর্মীদের আধার কার্ড করিয়ে দেওয়ার জন্য কলকাতা পুরসভার তরফে যাঁরা সোনাগাছিতে গিয়েছিলেন, তাঁরাও এই চাঁদার নামে তোলাবাজির শিকার হয়েছিলেন৷ তাঁদের কাছ থেকেও যা কিছু ছিল ছিনিয়ে নিয়েছিল এবং মারধর করেছিল ওই দুষ্কৃতীরা৷ এ কথা জানিয়ে দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটির মেন্টর ভারতী দে বলেছেন, ‘‘১২ মাসে ১৩ পার্বণের নাম করে চাঁদা তোলা হচ্ছে সোনাগাছিতে৷ বছরভর এই ধরনের ছিনতাই চলছে৷ এর জন্য আগের মতো কাস্টমার এখন আর আসেন না৷’’

একই সঙ্গে দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটির মেন্টর বলেন, ‘‘আগে দুর্গাপুজো, নতুন বছর সহ বিভিন্ন উৎসবের সময় অনেক কাস্টমার সোনাগাছিতে আসতেন৷ এখন আর উৎসবের সময় তেমন কাস্টমার আসেন না৷ এর জন্য যৌনকর্মীদের রোজগার এখন আর আগের মতো হয় না৷ তিন বছর ধরে এই ধরনের পরিস্থিতি চলছে সোনাগাছিতে৷’’ এই তিন বছর ধরে উপার্জনের কত শতাংশ কমে গিয়েছে? ভারতী দে বলেন, ‘‘৭০ শতাংশের মতো উপার্জন কমে গিয়েছে৷’’ একদিকে, উপার্জন কমে গিয়েছে৷ অন্যদিকে, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি৷ যার প্রভাবেও জৌলুসহীন হয়ে পড়েছে সোনাগাছির যৌনকর্মীদের এবং তাঁদের পরিবারের উৎসব পালনের বিষয়টি৷

 

Be the first to write a comment.

Leave a Reply