এখন ফাইনালের ফেভারিট বাংলাদেশ

প্রকাশিত

ক্রীড়া প্রতিবেদক : আগের ম্যাচে নেপালের জালে ১০ গোল দেওয়ার পর ভারতকে নিয়ে খানিকটা শঙ্কায় পড়েছিল বাংলাদেশ। দেশের মাঠে না বিপদে পড়ে স্বাগতিকরা।

মাঠে নামতেই বোঝা গেল ওই ভয় অহেতুক, গোলের সরলাঙ্কজনিত ভারতভীতি। শামসুন্নাহার-মনিকাদের দাপটে হাওয়াই ভয় হাওয়ায় মিলিয়ে দিয়ে বাংলাদেশ ৩-০ গোলে ভারতকে হারিয়ে সাফ অনূর্ধ্ব-১৫ নারী ফুটবলে ফেভারিট হয়েই থাকল।

তবে ২৪ ডিসেম্বর ফাইনালের আগে অত তৃপ্তির ঢেকুর তুলতে চান না স্বাগতিক কোচ গোলাম রব্বানী ছোটন। নিজের দলকেও ফেভারিট আখ্যা দিতে চান না, ‘ফেভারিট কথাটি বলতে চাই না। অতি আত্মবিশ্বাস সব সময় খারাপ ফল বয়ে আনে। ’ ভারতের সঙ্গে ফাইনালের আগে তাদের একবার হারানোর স্মৃতি নিশ্চিতভাবেই বাড়াবে লাল-সবুজের আত্মবিশ্বাস। অনুপ্রাণিত করবে খেলোয়াড়দের। কারণ ৯০ মিনিটে একবারও মনে হয়নি ম্যাচটি হারতে পারে বাংলাদেশ। গোল তো দূরের কথা, প্রতিপক্ষ একবারও পারেনি স্বাগতিক গোলমুখ খুলে সুযোগ তৈরি করতে।

উল্টো অভিষেক ম্যাচে শামসুন্নাহার ডান পায়ের দুর্দান্ত ফ্লিকে বুঝিয়ে দিয়েছেন নতুনের পায়েও ভারত-বধের সামর্থ্য আছে। ৬ মিনিটে বাঁদিক থেকে আঁখির তুলে দেওয়া বলটি কাছের পোস্টে এত সুন্দর ফ্লিক করেছেন, চলমান প্রিমিয়ার লিগের দেশি ফুটবলারের পায়ে দেখা যাবে না এমন ম্যাজিক। সেটি পোস্ট ঘেঁষে বাইরের জাল ছুঁলেও পরের ৬ মিনিটে চাপে চিড়েচ্যাপ্টা ভারত। এতটাই আগ্রাসী হয়ে ওঠে স্বাগতিকরা। পাসিং ফুটবল খেলে জায়গা নেওয়া, বডি ডজে পেছনে ফেলে পোস্টের সামনে নিখুঁত ক্রস ফেলা—কিশোরীদের পায়ে ফুল হয়ে ফুটছে ফুটবল। অমন দৃষ্টিনন্দন ফুটবলের পর মিসগুলো তাই বেশ পীড়াদায়ক। ৮ মিনিটে পোস্টের সামনে একদম ফাঁকায় থেকেও ঋতুপর্ণা মেরেছে বাইরে। মিনিট চারেক বাদে একই কাজ করেছে সাজেদা। তাই ১২ মিনিটের চাপে গোলহীন থাকার পর ৩৩ মিনিটে মনিকার কর্নারে বদলি ফরোয়ার্ড আনুচিংয়ের হেডে গোলের খাতা খোলে বাংলাদেশ। মিনিট দুয়েক বাদে তিনিই আবার ভারতীয় গোলরক্ষককে পরাস্ত করেও বল পোস্টে রাখতে পারেননি। তবে প্রথমার্ধের ইনজুরি টাইমে সদ্য জেএফএ কাপ খেলে দলে ঢোকা শামসুন্নাহারকে ফাউল করে দ্বিতীয় গোলের আয়োজন করে ভারত। এরপর সিনিয়র শামসুন্নাহারের পেনাল্টি কিকে ২-০ গোলে এগিয়ে বাংলাদেশ বিরতিতে যায়।

প্রথমার্ধে ভারত কয়েকবার আক্রমণ করলেও ভীতি ছড়াতে পারেনি মোটেও। দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচ হয়েছে আরো  একতরফা। খেলেছে কেবল বাংলাদেশ আর ঠেকিয়েছে ভারত। স্বাগতিক কোচ গোলাম রব্বানী ছোটনের দাবিও সে রকম, ‘নেপালকে ১০ গোলে হারানোর পর আমাকে অনেকে প্রশ্ন করেছিল এই ভারতের সঙ্গে আমরা পারব কি না। ম্যাচে ভারত প্রথমার্ধে অল আউট খেলে চেষ্টা করেছে, সেটুকু আক্রমণ-পাল্টাআক্রমণ হয়েছে। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধের পুরোটাই আমরা দাপটের সঙ্গে খেলেছি। আমাদের উদ্দেশ্যই ছিল আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলে দর্শকদের আনন্দ দেওয়া। ’ অস্বীকার করার সুযোগ নেই, দেশের আনন্দদায়ী ফুটবলের উৎস এখন নারী ফুটবল। বিরতির পর তাদের একচ্ছত্র দাপুটে ফুটবলের ফল হলো একটি অসাধারণ সুন্দর গোল। ৫৩ মিনিটে মনিকা চাকমা একক নৈপুণ্যে ডান দিক দিয়ে ঢুকে দুর্দান্ত ফিনিশ করে গোলরক্ষকের পাশ দিয়ে। সুবাদে এই টুর্নামেন্টে দুই গোলসহ মনিকার আন্তর্জাতিক গোল সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬। সঙ্গে ম্যাচসেরার সম্মান পেয়ে কিশোরী দারুণ খুশি। খুশিতে আত্মহারা এই মিডফিল্ডার বলে ফেলে, ‘ভারত অমন ডর-ভয়ের দল নয়। আমি যখন বল নিয়ে এগিয়েছি তখন মনেই হয়নি ওরা আটকাতে পারবে। গোলরক্ষককে ফাঁকি দিয়ে গোলও করেছি। ’ পরক্ষণেই দুহাতে মুখ ঢেকে ফেলে বেশি বলা হয়ে গেল মনে করে। আসলে পায়ে থাকলে মুখেও বলা যায়। এই অঞ্চলে বয়সভিত্তিক নারী ফুটবলে ভারতের দিন যে ফুরিয়ে গেছে সেটা তাদের কোচ ময়মল রকিও স্বীকার করেছেন, ‘কোনো দলই ফাইনালের আগে হারতে চায় না। বাংলাদেশ শক্তিশালী এবং অভিজ্ঞ দল। এখানে বয়সভিত্তিক পর্যায়ে কাজ হচ্ছে, তারা ট্রেনিংয়ে আছে, প্র্যাকটিস ম্যাচ খেলছে। সুবাদে তাদের ম্যাচুরিটিও অনেক। ’

কিছুদিন আগে এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ ফুটবলের চূড়ান্ত পর্ব খেলে ফিরেছে এই মেয়েরা। সেখানে এশিয়ান জায়ান্ট উত্তর কোরিয়া, জাপান, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে খেলেছে। হারলেও অর্জন হয়েছে অভিজ্ঞতা আর ম্যাচুরিটি। সুবাদে তাদের কাছে ভারত আর আতঙ্ক ছড়ানোর দল নয়। তাদের বিপক্ষে হেসেখেলেই জেতা যায়। তবে আধিপত্য খোদাই করে রাখতে হলে ২৪ তারিখের ফাইনাল জিততে হবে। অমন ম্যাচের পর এ নিয়ে আর অবিশ্বাস থাকার কথা নয় বাংলাদেশ কোচের মনে। কিন্তু তিনি যে মুখে খেলতে চান না,  ‘আমার দল তিন ম্যাচে একই তালে খেলে গেছে। এই ধারাটা বজায় থাকলে ফাইনালেও আমরা ভালো করব। ’ এই ধারায় নারী ফুটবল শিরোপাধন্য হলে, বছরের সেরা প্রাপ্তি হবে ফুটবলের।

Be the first to write a comment.

Leave a Reply