এবারের ঈদ আনন্দের চেয়ে আতংকটাই প্রবল

প্রকাশিত
মোঃ ইলিয়াছ মোল্লা – মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে বড় দুটি আনন্দ উৎসবের অন্যতম ঈদুল আজহা কড়া নাড়ছে সকল মুসলিম উম্মাহর হৃদয়ে । কিন্তু ত্যাগের মহিমায় উজ্জ্বল হলেও এবারের ঈদ আনন্দের চেয়ে আতংকটাই প্রবল । গত বছরও চলমান মহামারী করোনার মধ্যেই উদযাপিত হয়েছিল (৩০ জুলাই) ঈদুল আজহা । তবে এক বছরের ব্যবধানে করোনা সংক্রমণ এবং মৃত্যুর চিত্র এখন ভয়াবহ । এই ভয়াবহ অবস্থার মধ্যেই ঈদুল আজহা উপলক্ষে সরকার শিথিল করেছে কঠোর লকডাউন । ১৫ জুলাই থেকে ২২ জুলাই পর্যন্ত চলবে সব গণপরিবহন, বাস, ট্রেন, নৌযান এবং শপিং মলসহ সব ধরনের মার্কেট । কোরবানির পশুর হাটও রাজধানীসহ সারা দেশে চালু করা হয়েছে । করোনা মহামারি নিয়ন্ত্রণের যে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল, তা যে মারাত্মকভাবে ব্যর্থ হতে চলেছে সেটা ইতিমধ্যে স্পষ্ট হয়ে গেছে। গত মে মাসে রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে লকডাউন বহাল রাখা হয়েছিল । বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল বাস-ট্রেনসহ সব ধরনের গণপরিবহন। বেপরোয়া ঘরমুখো মানুষকে সেই লকডাউনের বিধিনিষেধ মানানো যায়নি বলেই এবার কি সব খুলে দেওয়া হলো? আমার দৃষ্টিতে বিবেচনাটা সে রকমই । কিন্তু এই বিবেচনার পক্ষে যত যুক্তিই থাক, এই সিদ্ধান্ত যে ভয়ংকর আশঙ্কার, তা বিশ্বাস না করে উপায় নেই । সরকারী ভাবে পশুর হাট বসার নির্দেশ দেওয়ার আগেই দেখেছি রাজধানীসহ বহু জায়গায় বসে গিয়েছিল কোরবানির পশুর হাট । আর নির্দেশ দেওয়ার পর সারাদেশের পশুর হাটের যে ভয়ংকর চিত্র টিভিসহ নানা সংবাদমাধ্যমে দৃশ্যমান, তাতে এই ঈদের পরে করোনা পরিস্থিতি কী হবে, ভাবতেও ভয় লাগে । হাজার হাজার মানুষ এরইমধ্যে নেমে পড়েছে সারাদেশের পশুর হাটগুলোতে । অধিকাংশ মানুষের মুখে মাস্ক নেই । দূরত্ব নেই। যাদের মাস্ক আছে তাদেরও হয় চিবুকের কাছে, না হয় গলায় ঝুলছে! লকডাউন শিথিলের পর ৮ দিন ঈদে যানবাহন চলাচলের জন্য যে পাঁচটি শর্ত দিয়েছে বিআরটিএ, তা অধিকাংশ যানবাহন মানছে না । মনিটরিংয়ের মতো জনবল হয়তো তাদের নেই, নয়তো কোনও উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনা । ১৫ জুলাই থেকে ২৩ জুলাই ভোর ছয়টা পর্যন্ত সব ধরনের যানবাহন চলবে বেঁধে দেওয়া স্বাস্থ্যবিধি মেনে । এরপর থেকে পরবর্তী ১৪ দিন সব ধরনের যানবাহন বন্ধেরও নির্দেশনা দিয়েছে বিআরটিএ । এখন দেখার বিষয় কতটা মানা হয় সেই ১৪ দিনের বিধিনিষেধ । গত রোজার ঈদে আমরা যা দেখেছি তারপর আর আস্থা পাচ্ছি না লকডাউন শিথিল করা আট দিন নিয়ে । গত মে মাসের প্রথম সপ্তাহে যখন ঈদুল ফিতর উদযাপনের জন্য সব বিধিনিষেধ– এমনকি লকডাউন অগ্রাহ্য করে যেভাবে মানুষ যানবাহনহীন পরিবেশেও দুর্যোগ মাথায় নিয়ে চরম কষ্ট সয়ে বাড়ি ফিরছিল, তখনই সচেতন মহলের ধারনা হয়ে গিয়েছিল আমাদের একটা চরম বিপর্যয় আসন্ন । বাস-ট্রেন- লঞ্চ সব বন্ধ । চালু ছিল শুধু নৌরুটের ফেরিগুলো । আর তাতেই ঝাঁপিয়ে পড়েছিল জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হাজার হাজার মানুষ! কোথায় মাস্ক! কোথায় কীসের দূরত্ব! প্রবল ভিড়ের চাপে পরস্পর পিষ্ট হয়ে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ রাজধানীসহ বিভিন্ন শহর থেকে গ্রামে গিয়েছিল ঈদ করতে । তখনই চিকিৎসাবিজ্ঞানীসহ সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা ব্যাপক সংক্রমণের আশঙ্কা ব্যক্ত করেছিলেন । সব সংবাদমাধ্যম, সামাজিক নেটওয়ার্কে সেই ভয়ংকর ঈদযাত্রার চিত্র আমরা প্রত্যক্ষ করেছি । তার বিষফল ভোগ করতে হচ্ছে আজ সারা দেশবাসীকে। ঈদুল ফিতরের সেই যাত্রায় যারা শহর থেকে স্বজনদের সঙ্গে আনন্দ উদযাপন করতে গ্রামে গিয়েছিলেন, তারা আসলে স্বজনদের চরম সর্বনাশ করেই ফিরেছেন। যে বাবা-মা-ভাই-বোনদের সঙ্গে নিয়ে ঈদ করেছিলেন, তাদের অনেকেই করোনায় আক্রান্ত হয়ে ধরণী ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন অকালে। অনেকে এখনও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে করোনায় ধুঁকছেন। প্রতিদিন ঢলে পড়ছেন মৃত্যুর কোলে । গত রোজার ঈদের পর ২/৩ সপ্তাহের মধ্যেই সারাদেশে করোনার সংক্রমণ ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে । একদিনে রেকর্ড ২৩০ জনের প্রাণহানি এবং কয়েক হাজার মানুষের সংক্রমণ ধরা পড়ার চিত্র দেখে সারাদেশ আঁতকে উঠেছে । মে মাস পর্যন্ত রাজধানীসহ বড় বড় শহর নগরে করোনার ঝুঁকি থাকলেও গ্রামবাংলা ছিল মোটামুটি নিরাপদ । কিন্তু অতি উৎসাহী স্বজনদের গ্রামে গিয়ে ঈদ উদযাপনের বিবেচনা বোধহীন আকাঙ্ক্ষা গ্রামবাংলাকে ভয়াবহ সংক্রমণের মুখে ঠেলে দিয়েছে! প্রতিদিন সেই সংক্রমণে প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিভিন্ন হাসপাতালে ধুঁকে ধুঁকে মরার মর্মান্তিক দৃশ্য আমরা টেলিভিশনে, সামাজিক নেটওয়ার্ক এবং সংবাদমাধ্যমে প্রত্যক্ষ করছি । স্থানীয় হাসপাতালের চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীরা হিমশিম খাচ্ছেন! পরিস্থিতি সামলাতে পারছেন না। বিপুল সংখ্যক করোনা রোগীর চিকিৎসা সেবা দেওয়ার মতো প্রয়োজনীয় উপকরণও নেই সেখানে । এই দুঃসময়ে প্রাথমিকভাবে গ্রামের মানুষকে বাঁচাতে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারতো উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো । কিন্তু সেগুলোর অবস্থাও তেমন ভালো নেই। দেশের অনেক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডাক্তার নিয়োগ দেওয়া থাকলেও কর্মস্থলে মাসে দশ দিনও পাওয়া যায় না তাদের
। কাজ চালায় আয়া-ওয়ার্ড বয়! অনেক উপজেলার চিত্র তুলে ধরে দৈনিক পত্রিকার প্রথম পাতায় যখন শিরোনাম হয় ‘যন্ত্রপাতি বাক্সবন্দি; নষ্ট অ্যাম্বুলেন্স’, তখন প্রত্যন্ত অঞ্চলের চিকিৎসার চিত্র অনুমান করতে কারও অসুবিধা হয় না । বর্তমানে দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় করোনার সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার যা, তা দুই মাস আগেও কেউ কল্পনা করেননি । ভারতের ভয়াবহ বিপর্যয় দেখেও আমাদের শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত ছিল । পরিস্থিতি ভয়াবহ হলে কী করবেন, তৃণমূল পর্যায়ে তার আগাম প্রস্তুতি নিয়ে রাখা উচিত ছিল । এবং এই প্রস্তুতিটা নেওয়ার কথা ছিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে । কিন্তু দুঃখের বিষয়, প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা ছাড়া তেমন কেউ দূরের ভাবনা ভাবতে চান না । যে কারণে এত বড় বিপর্যয় আজ । বাস্তবতা হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা যত আন্তরিকতার সঙ্গে করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য সম্ভাব্য সবকিছু করছেন, তার স্বাস্থ্য প্রশাসন গতিশীলতা আর নিষ্ঠার সঙ্গে সে দায়িত্ব পালন করতে পারছে না, অথবা করছে না । প্রশাসনের এবং রাজনীতির তৃণমূলের সব ক্ষেত্রে এই ভয়াবহ বৈপরীত্যের চিত্র! প্রধানমন্ত্রীর আকাঙ্ক্ষার মতো করে সবাই আন্তরিকতায় এগিয়েও আসছেন না । মুজিববর্ষ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর আকাঙ্ক্ষা ছিল দেশের প্রতিটি সহায়-সম্বলহীন দরিদ্র পরিবারের জন্য একটি করে বাসস্থান করে দেওয়া । সেই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পও চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়লো! এত বড় মহৎ আকাঙ্ক্ষা কলুষিত হলো গুটিকয়েক কর্মকর্তা আর স্থানীয় রাজনৈতিক অসততা আর ব্যর্থতার কারনে । পরিতাপের বিষয়, ১৯৭২ সালে থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত জাতির পিতাকেও একই অবাঞ্ছিত বাস্তবতার বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়েছিল । রাজনৈতিক নেতাদের কারও কারও অসততা আর ঔপনিবেশিক মানসিকতার আমলাতন্ত্রের কাজকর্মে, বৈরিতায় তিনি সন্তুষ্ট হতে পারছিলেন না কিছুতেই । চরম অস্বস্তিতেই যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের সাড়ে তিন বছরের পুনর্গঠনের কাজ করছিলেন তিনি । আজ যুদ্ধাবস্থা না হলেও করোনা মহামারির সংক্রমণে ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হচ্ছে দেশকে । লক্ষ লক্ষ মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন । বহু ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে খাবার তুলে দিতে হচ্ছে সরকারি তহবিল থেকে । সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী ক্রমান্বয়ে বাড়াতে হচ্ছে । এ অবস্থায় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সততা-কর্মনিষ্ঠা ছাড়া মানুষের দুর্ভোগ মোচনের কোনও উপায় নেই বলে আমার ধারনা । এই দুর্যোগ পাড়ি দিতে হলে আমাদের অনেক দূরে তাকাতে হবে । কত বছর এই করোনা পরিস্থিতি থাকবে বলা মুশকিল। মনুষ্য সৃষ্ট এই ভয়ংকর ভাইরাস । একে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক একটি চক্র এক যুগ আগে থেকে ব্যবসার ফাঁদ নিয়ে অগ্রসর হয়েছিল বলে যে অভিযোগ সম্প্রতি উঠেছে, সে তথ্য এরই মধ্যে গণমাধ্যমে চাউর । সত্য মিথ্যা যাচাই করবে ভবিষ্যতের গবেষণা । কিন্তু ভয়ংকর একটা কিছু ঘটে গেছে, যার শিকার পৃথিবীর লক্ষ লক্ষ মানুষ । তিন কোটি মানুষ এই ভাইরাসে মারা যেতে পারে বলে এক দশক আগেই অপ্রকাশিত গোপন গবেষণার তথ্য, সোশাল মিডিয়ায় সম্প্রতি প্রকাশ করা হয়েছে । যাই হোক, করোনা এবং এর টিকা নিয়ে বিশ্বব্যাপী আজ যে রাজনীতি, তার শিকার বিশ্বের দরিদ্র এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোও । আমাদের মতো সম্ভাবনাময় উন্নয়নমুখী দেশের জন্য করোনার ছোবল এক ভয়াবহ বাস্তবতা । এ অবস্থায় ব্যক্তিগত লাভের চেয়ে দেশ এবং দেশের মানুষের কল্যাণ ভাবনাটি খুব জরুরি। আজকে প্রায় দেড় বছর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ । লকডাউনে সবকিছু বন্ধ হচ্ছে, কিন্তু গার্মেন্টস কারখানা নয় । গার্মেন্টস শ্রমিকদের কি জীবনের নিরাপত্তার প্রয়োজন নেই? গার্মেন্টস কারখানা খোলা রাখলে অন্যান্য প্রতিষ্ঠান খোলা রাখতে অসুবিধা কোথায়? এই প্রশ্নও উঠেছে । দেশের জন্য কিছু স্যাক্রিফাইস আমাদের সবার করার মানসিকতা থাকা দরকার । তা না হলে এই বিপর্যয় মোটেও সামাল দেওয়া যাবে না । লকডাউন কার্যকর করার পথে প্রধান অন্তরায় মানুষের চরম দারিদ্র্য । দিনের রোজগারে যারা দিন আহার করেন, তাদের প্রত্যেককে খাবার দেওয়ার মতো উন্নত রাষ্ট্র বাংলাদেশ এখনও হয়তো হয়ে ওঠেনি । ফলে বিশ্বের অন্যান্য দেশে যেভাবে লকডাউন কার্যকর হচ্ছে, আমাদের দেশে সেটা সম্ভব নয় । তবে গ্রামগঞ্জে হাটে-বাজারে যদি ক্ষমতাসীন দলের কর্মীরা, সরকারের সমালোচনা করেন যারা, সেসব রাজনৈতিক দলের কর্মীরা প্রতিদিন ঘুরে ঘুরে মানুষকে মাস্ক পরাতেন কিংবা বাধ্য করতেন, সামাজিক দূরত্ব রক্ষার জন্য স্বেচ্ছাসেবী ভূমিকা নিয়ে যদি সবাই কাজ করতেন, তাহলে করোনা সংক্রমণ ঠেকানো অনেকটা সম্ভব হতো আমার দৃঢ় বিশ্বাস । সরকারের জন্যও তা স্বস্তিকর হতো । ঈদুল আজহায় পশু কোরবানি করে আমরা প্রতীকীভাবে মনের পশুত্বকে কোরবানি করি, প্রিয় বস্তু ত্যাগের শিক্ষা গ্রহণ করি । এই শিক্ষাটাই নবী ইব্রাহিমকে প্রিয় সন্তান কোরবানির আদেশ দিয়ে আল্লাহ পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা করেছেন । এই শিক্ষাটা যদি সর্বক্ষেত্রে আমরা গ্রহণ করতে পারি তাহলে অনেক বড় বিপর্যয় পাড়ি দেওয়া সম্ভব । আল্লাহ আমাদের সবার মনের লোভের পশুটাকে জবেহ করার শক্তি দিন । এই মহামারী মোকাবেলায় আমাদের সকলকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার তৌফিক দান করুণ- আমিন ।