কুমিল্লার সেই কলঙ্কিত তিন বাড়ি

প্রকাশিত

নিজস্ব প্রতিবেদক, কুমিল্লা-বাঙালি জাতির ইতিহাসে কলঙ্কের চিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কুমিল্লার তিনটি বাড়ি। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মস্বীকৃত খুনিরা থাকতেন এ বাড়িগুলোতে। কুমিল্লার দাউদকান্দির দশপাড়ায় খোন্দকার মোশতাক আহমেদের বাড়ি, চান্দিনার ছয়ঘড়িয়ায় কর্নেল আবদুর রশিদ খোন্দকারের বাড়ি আর মেজর শরিফুল হক ডালিম কুমিল্লা শহরের অশোকতলার যে বাড়িতে থাকতেন সেই বাড়ি।

খোন্দকার মোশতাক আহমেদ মারা গেলেও কর্নেল আবদুর রশিদ খোন্দকার আর মেজর শরিফুল হক ডালিম কোথায় রয়েছেন- তা জানে না সরকারও। কিন্তু তাদের এ বাড়িগুলোতে সেইসব খুনিরা বা তাদের উত্তরাধিকাররা না থাকলেও বাড়িগুলো বহন করছে অভিশাপের চিহ্ন। কুমিল্লাকে কলঙ্কিত করা এসব বাড়িগুলোকে লক্ষ্য করে মানুষ এখনও ঘৃণা জানায়। ঘৃণা জানিয়ে কুমিল্লার মানুষ আসলে জাতির জনক হত্যার কলঙ্কই মোচন করতে চায়।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বপরিবারে হত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত সাবেক রাষ্ট্রপতি খোন্দকার মোশতাক আহমেদের বাড়ি কুমিল্লার দাউদকান্দির সুন্দলপুরের দশপাড়ায়। চারদিকে দেয়াল ঘেরা বিশাল ওই বাড়িতে দোতলা একটি ভবন রয়েছে। রয়েছে একটি মসজিদ ও পারিবারিক কবরস্থান। কবরস্থানের কবরগুলোতে সাইনবোর্ডে পরিচয় থাকলেও মোশতাক আহমেদের কবরে কোনো সাইনবোর্ড নেই। সেটি সরিয়ে ফেলা হয়েছে।

দোতলা ওই বাড়ির নিচতলায় মসজিদের ইমাম ও মাজারের একজন খাদেম ছাড়া সেখানে এখন তাদের কেউ থাকেন না। খোন্দকার মোশতাক আহমেদের এক ছেলে খোন্দকার ইসতিয়াক আহমেদ আমেরিকায় এবং মেয়ে খোন্দকার শিরিন সুলতানা এবং ডা. খোন্দকার নাজনিন সুলতানা লন্ডনে থাকেন। তাদের পরিবারের সদস্যরা মাঝে মধ্যে দশপাড়ায় সেই বাড়িতে আসেন। দোতলা বাড়িটির পাশেই রয়েছে দশপাড়া হযরত কবির উদ্দিন সিনিয়র কামিল মাদ্রাসা। আত্মস্বীকৃত খুনি মোশতাক ১৯৯৫ সালে মারা যান।

এদিকে, খোন্দকার মোশতাক আহমেদের বাড়ি আগামী ১৬ আগস্ট ঘেরাওয়ের কর্মসূচি দিয়েছেন দাউদকান্দি উপজেলা চেয়ারম্যান মেজর মোহাম্মদ আলী সুমন। তিনি জানান, খুনি মোশতাকের প্রতি ঘৃণা জানাতে আমরা তার বাড়ি ঘেরাও কর্মসূচি দিয়েছি। ১৬ আগস্ট বিকাল ৩টায় দাউদকান্দির শহীদনগরের ট্রমা সেন্টারের সামনে থেকে মিছিল নিয়ে মোশতাকের বাড়ি ঘেরাও করে প্রতিবাদ ও নিন্দা জানাবো।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বপরিবারে হত্যার আরেক আত্মস্বীকৃত খুনি লে. কর্নেল (অব.) আবদুর রশিদ খোন্দকারের কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার ছয়ঘড়িয়া গ্রামের বাড়িটি এখন জনশূন্য। গত ১৪ জুন তার সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়। সরকারের পক্ষে কুমিল্লা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হাসানুজ্জামান কল্লোলের নির্দেশে এবং চান্দিনা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) উপস্থিতিতে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি রশিদের বাড়িসহ ৬ দশমিক ১২ একর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে ছয়টি সাইনবোর্ড টাঙ্গিয়ে দিয়েছে চান্দিনা থানা পুলিশ। এর মধ্যে তার বাবার আব্দুল করিমের সম্পত্তিও রয়েছে।

সরেজমিনে আবদুর রশিদ খোন্দকারের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় জনশূন্য অবস্থায় পড়ে রয়েছে জাতির জনকের খুনির একতলা বাড়িটি। এই বাড়িসহ ছয়ঘরিয়া-করতলা-পানিপাড়া ও থানগাঁও মৌজার ৬ দশমিক ১২ একর সম্পত্তিতে তফসিল বর্ণিত সম্পত্তি সরকারের বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি, ওই সম্পত্তিতে ‘জনসাধারণের প্রবেশ নিষেধ’ লেখা সাইনবোর্ড টাঙানো হয়েছে।

একসময় এই বাড়িটি পাহারা দিতেন কেয়ারটেকার (অব.) সার্জেন্ট সাইফুল। এক এগারোর পটপরিবর্তনের সময় থেকে তার মেয়ে মেহনাজ রশিদ খোন্দকার ছাড়া এ বাড়িতে তার পরিবারের আর কেউ আসতো না। কেয়ারটেকার সাইফুল বাসভবনের পাশে অবস্থিত একতলা ভবনে স্বপরিবারে বসবাস করতেন। তিনি ছিলেন তিন হাজার টাকায় মাসিক বেতনভুক্ত কর্মচারী।

জানা গেছে, বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যা করার পর স্বাধীনভাবে এ বাড়িতে বসবাস করলেও ১৯৯৬ সনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তথা জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠন করার পরপরই দেশত্যাগ করেন আবদুর রশিদ খোন্দকার। এর আগে ১৯৯৬ এর ১৫ ফেব্রুয়ারি বিতর্কিত নির্বাচনে অংশ নিয়ে আবদুর রশিদ খোন্দকার এমপিও হয়েছিলেন। ১৯৯৬ সালে দেশত্যাগ করে আর দেশে আসতে পারেননি তিনি।

তবে কর্নেল রশিদের কন্যা মেহনাজ রশিদ খোন্দকার বিদেশ থেকে বাংলাদেশে এসে কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার ছয়ঘরিয়ায় বাজেয়াপ্ত করা সেই বাড়িতে উঠেছিলেন। দীর্ঘদিন ওই বাড়িতে ছিলেন তিনি। মাঝে মধ্যে ঢাকার বাড়িতেও থাকতেন। পরে বাড়িটিতে আর্ক কম্পিউটার ট্রেনিং সেন্টার লিখে সাইনবোর্ড টাঙিয়ে বাড়িটিকে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান করে তার দখলে রেখেছিলেন মেহনাজ। বিভিন্ন মাধ্যমে লোকবল তৈরি করে ২০০৮-এর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে চান্দিনা আসন থেকে নির্বাচনে অংশ নিয়ে পরাজিত হন তিনি।

কুমিল্লার জেলা প্রশাসক হাসানুজ্জামান কল্লোল জানান, আবদুর রশিদ খোন্দকারের ওইসব সম্পত্তি এখন সরকারের বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি, ওই সম্পত্তিতে জনসাধারণের প্রবেশ নিষেধ কথা লিখে সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে ওই সম্পত্তি জনকল্যাণে ব্যবহৃত হবে।

অপরদিকে, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বপরিবারে হত্যার আরেক আত্মস্বীকৃত খুনি লে. কর্নেল (অব.) শরিফুল হক ডালিম তার বাবার চাকরির সুবাদে কুমিল্লায় পড়াশুনা করতেন। তিনি ছিলেন কুমিল্লা জিলা স্কুল এবং কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ছাত্র। তার বাবা কুমিল্লা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ছিলেন। সেই সুবাদে তারা থাকতেন কুমিল্লা শহরের অশোকতলা চৌমুহনীর ১৪৯ নম্বর দোতলা সরকারি বাড়িটিতে। এরপর সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর তিনি ছিলেন কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে। অশোকতলার সেই বাড়িটি দেখলে এখনও কুমিল্লার মানুষের মনে পড়ে যায় সেই ধিক্কৃত ডালিমের কথা। অশোকতলার ওই দোতলা বাড়িতে স্বাধীনতার পর উপরতলায় মৎস্য কর্মকর্তা এবং নিচতলায় খাদ্য কর্মকর্তা থাকতেন। এখন সেখানে থাকেন প্রয়াত নাসির আহমেদের পরিবার।

সংগীতশিল্পী পল্লব জানান, ১৯৮৫ সাল থেকে তারা বাড়িটি লিজ নিয়ে সেখানে থাকেন। এর আগে সরকারি কর্মকর্তারাই থাকতেন। কুমিল্লার এ তিনটি বাড়ি এখন ঘৃণ্য ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আছে অভিশাপের বোঝা নিয়ে। বাড়িগুলো দেখে কুমিল্লার মানুষের ঘৃণা প্রকাশ ছাড়া আর কি বা করা