খালেদার রায় নিয়ে দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি হুঁশিয়ারি

প্রকাশিত

ডেস্ক রিপোর্ট: খালেদা জিয়ার দুর্নীতি মামলার রায় ঘিরে পাল্টাপাল্টি হুঁশিয়ারি এসেছে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ নেতাদের কাছ থেকে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেছেন, তাদের চেয়ারপারসনের মামলায় ‘নেতিবাচক’ কোনো রায় হলে তার পরিণতি ‘ভয়াবহ’ হবে।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক হাছান মাহমুদ বলেছেন, খালেদা জিয়ার মামলার রায় নিয়ে দেশে আবার কোনো জ্বালাও-পোড়াও হলে তাতে বিএনপিই পুড়ে ‘ছারখার হয়ে যাবে’।

হুঁশিয়ারি এসেছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালের দিক থেকেও। তিনি বলেছেন, রায় ঘিরে কেউ ‘বিশৃঙ্খলা বা ধংসাত্মক কার্যকলাপের’ চেষ্টা করলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ‘প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা’ নেবে।

এর প্রতিবাদে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, রায়ের পরের পরিস্থিতি কী হবে- তা নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ওই বক্তব্য ‘সঙ্গত নয়’।

পাল্টাপাল্টি এই বক্তব্যের মধ্যেই শনিবার রাতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যদের নিয়ে জরুরি বৈঠকে বসছেন বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া।

আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া এতিমখানা ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায় ঘোষণা করবে ঢাকার পঞ্চম জজ আদালত। বিএনপি-জামায়াত জোটের ২০০১-২০০৬ মেয়াদের সরকারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া দুই কোটি ১০ লাখ টাকা আত্মসাতের এ মামলার প্রধান আসামি।

অভিযোগ প্রমাণিত হলে এ মামলায় খালেদা জিয়ার সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে। সেক্ষেত্রে তিনি আগামী নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অযোগ্য হয়ে পড়বেন।

বিএনপি অভিযোগ করে আসছে, ক্ষমতাসীনরা রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে ‘অন্তঃসারশূন্য’ এই মামলাকে এ পর্যন্ত নিয়ে এসেছে।

মির্জা ফখরুল বৃহস্পতিবারও বলেছেন, তাদের চেয়ারপারসনকে সাজা দেওয়ার বিষয়টি সরকার ‘আগেই ঠিক করে রেখেছে’।

দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী শুক্রবার বলেন, “দেশের সার্বিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে শনিবার রাত সাড়ে ৮টায় গুলশানের কার্যালয়ে জাতীয় স্থায়ী কমিটির জরুরি বৈঠক ডেকেছেন ম্যাডাম।”

দলের স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নির্বাচনের আগে বছরখানেক হাতে থাকতে ওই রায় সামনে রেখে শনিবারের বৈঠকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন তারা।

আরাফাত রহমান কোকোর তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘নাগরিক অধিকার আন্দোলন ফোরাম’ আয়োজিত এক আলোচনা সভায় গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের কথায় বিএনপি নেতাদের মনোভাবের কিছু আভাস পাওয়া যায়।

তিনি বলেন, “৮ ফেব্রুয়ারি যেটা আমরা আশঙ্কা করছি, সেদিন নেতিবাচক কোনো সিদ্ধান্ত সরকার কর্তৃক আদিষ্ট হয়ে যদি আদালত থেকে প্রকাশ পায়, তাহলে আমার মনে হয়, তখন থেকে এই সরকারের পতনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হবে।”

ক্ষমতাসীনদের উদ্দেশে এই বিএনপি নেতা বলেন, “সময় বলে দেবে কে নেতৃত্ব দেবে, আর কে রাজপথে থাকবে। সরকারকে বলব, জেলের ভয় দেখিয়ে লাভ নেই। আমরা তো খালেদা জিয়ার সাথে বৃহত্তর কারাগারেই আছি। আমরা সবাই খালেদা জিয়ার জেল পার্টনার।”

খালেদার রায় ঘিরে বিএনপি এখন পর্যন্ত কোনো কর্মসূচি না দিলেও গয়েশ্বর বলছেন, “আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু করার ঘোষণা দিই বা না দিই, এমন কিছু যে ঘটবে না- সে নিশ্চয়তা আমরা দিতে পারি না।”

সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এক মানববন্ধনে আওয়ামী লীগ নেতা হাছান মাহমুদের বক্তব্যে পাল্টা হুঁশিয়ারি আসে।

তিনি বলেন, “আমরা দেখলাম, তারা বলেছেন, বেগম খালেদা জিয়ার যদি শাস্তি হয়, তবে নাকি দেশে আগুন জ্বলবে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাহেব, রিজভী সাহেব ও বিএনপির নেতাদের বলতে চাই, আপনারা দেশে অতীতেও আগুন জ্বালিয়েছেন। সেই আগুনে আপনারা জ্বলেছেন। আবারও যদি আগুন জ্বালানের চেষ্টা করেন, তাহলে সেই আগুনে আপনারাই জ্বলে পুড়ে ছারখার হয়ে যাবেন।”

তার ভাষায়, খালেদা জিয়া যখন ক্ষমতায় ছিলেন, তখন আদালত ‘স্বাধীন ছিল না’ বলেই বিএনপি নেতারা মনে করেন, সরকারের ইচ্ছায় রায় হয়।

“তারা মনে করেন, তাদের সময়ে আদালত যেভাবে কাজ করত, এখনো মনে হয় আদালত সেভাবেই কাজ করে। এখন আদালত স্বাধীন। খালেদা জিয়া হয়ত খালাসও পেতে পারেন।”

হাছান মাহমুদ অভিযোগ করেন, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ যখন এগিয়ে চলছে, তখন ‘একটি চক্র’ দেশকে অস্থিতিশীল করার ‘ষড়যন্ত্র’ করছে।

তিনি বলেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা, খালেদা জিয়ার আদালতে যাওয়া আসার ঘটনা, মির্জা ফখরুলের বক্তব্য, রিজভী আহমেদের বক্তব্য সবগুলো একই সূত্রে গাঁথা।”

খালেদা জিয়ার মামলার রায়ের দিন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে হাছান মাহমুদ বলেন, “খালেদা জিয়ার বিচারের রায় হবে। রায়ের আগে বা পরে দেশে বিশৃঙ্খলা চালানোর অপচেষ্টা করা হবে। সরকারি দলের নেতাকর্মী হিসেবে জনগণের পাশে দাঁড়ানো আমাদের কর্তব্য। জনগণকে সাথে নিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের পেট্রোল বোমা বাহিনীকে প্রতিহত করতে অতন্দ্র প্রহরীর মতে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানাচ্ছি।”

দুই পক্ষের এই বক্তব্য নিয়ে শুক্রবার ঢাকেশ্বরী মন্দিরে এক অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালকে প্রশ্ন করেছিলেন সাংবাদিকরা।

জবাবে তিনি বলেন, আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি এই রায় ঘিরে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা করা যাবে না।

আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই, আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আগের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে তুলনা করা যাবে না। কারণ তারা দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ। পেশাদার এবং জনগণের বন্ধু। সুতরাং জনগণের ক্ষতি হলে তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।”

শুক্রবার বিকালে প্রয়াত সাহিত্যিক শওকত আলীর বাসায় তার পরিবারের সদস্যদের সমবেদনা জানাতে গিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে বিএনপি মহাসচিব বলেন, “আমরা এখনো রায়টা পাইনি। আইনগতভাবে নীতিগতভাবে রায় ঘোষণা হওয়ার আগে পর্যন্ত আমরা রায় নিয়ে প্রতিক্রিয়া, সেইভাবে বলতে পারব না।

“স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এই নিয়ে আজকে কথা বলেছেন। এই কথা বলা কোনোমতেই সঙ্গত নয়। তিনি সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে আছেন, যা দিয়ে তিনি গোটা আইনশৃঙ্খলা পরিবেশকে ..। এ থেকে এটা পরিষ্কার বোঝা যায় যে, তারা কী চিন্তা করছেন?”

খালেদা জিয়ার মামলার রায় ‘নজিরবিহীন দ্রুততার সঙ্গে’ করা হচ্ছে মন্তব্য করে ফখরুল বলেন, “তারা ডিটারমাইন্ড যে, তারা আগামী নির্বাচন করতে চান বিএনপিকে বাদ দিয়ে এবং সেজন্যই তাড়াহুড়া করে বিচার কাজ শেষ করা এবং এ সমস্ত কমেন্ট করা। আমরা এখন পর্যন্ত কোনো কর্মসূচি ঘোষণা করিনি। তাহলে কোথায় যাবেন?”