খালেদা জিয়ার কেন লন্ডনে যাওয়া হলো না? আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী

প্রকাশিত

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী-

খালেদা জিয়াকে করোনা চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়নি। তাতে বিস্মিত বা দুঃখিত হওয়ার কিছু নেই। বিএনপি নেতাদের দাবি ছিল করোনা চিকিৎসার জন্য তাঁকে লন্ডনে পাঠানো হোক। সরকার তাঁদের দাবি মানবে এই আশায় খালেদা জিয়ার পাসপোর্ট পর্যন্ত তাড়াহুড়া করে নবায়ন করা হয়েছে। স্পেশাল প্লেন ভাড়া করার কথা পর্যন্ত শোনা গেছে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে এসে খালেদা জিয়ার ডাক্তাররাই বলছেন, তাঁর করোনা নেই। তাহলে এত দিন করোনা, করোনা বলে চিৎকার করা হলো কেন? খালেদা জিয়া যদি করোনামুক্ত হয়ে থাকেন, তাহলে করোনার উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে বিদেশে পাঠানোর দাবি অনেকটা এমনিতেই দুর্বল হয়ে পড়ে।

খালেদা জিয়ার করোনা না হোক, তিনি যে বার্ধক্যজনিত নানা রোগে আক্রান্ত এ কথা সত্য। কিন্তু তাঁর সেই চিকিৎসা দেশেই পাওয়া যাচ্ছে। সুতরাং উন্নত চিকিৎসার জন্য একজন দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ডে দণ্ডিত ব্যক্তিকে বিদেশে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হলে তা হয়তো রাজনৈতিক ঝুঁকিপূর্ণ কাজ হতো। সেই আলোচনায় আমি পরে আসছি।

বিএনপির উকিল খন্দকার মাহবুব বলেছেন, ‘খালেদা জিয়ার যদি কিছু একটা হয় সে জন্য সরকার দায়ী থাকবে।’ এই কথাটা তাঁরা গত তিন বছর ধরে বলে আসছেন। এই তিন বছরে খালেদা জিয়ার কিছু হয়নি। কারণ তিনি অসুস্থ ছিলেন, কিন্তু বারবার স্বাস্থ্য পরীক্ষায় দেখা গেছে তাঁর ব্যাধি মারাত্মক কিছু নয় এবং তাঁর চিকিৎসা দেশেই পাওয়া যাচ্ছে। তার পরও যদি বিএনপি নেত্রীর রোগটা জটিল হয়ে থাকে, যা আমাদের দেশের চিকিৎসকদের সাধ্যের বাইরে, তাহলে বিশেষ ব্যবস্থায় এই করোনার সময়েও বিদেশ থেকে ডাক্তার আনা সম্ভব।

একজন দণ্ডিত আসামিকে সাময়িকভাবে মুক্তি দিয়ে বিদেশে পাঠানোর মধ্যে যে জটিলতা আছে তা জেনে বিএনপি নেতাদের উচিত, দেশেই তাঁর উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। খালেদা জিয়া বিএনপির নেত্রী বলে সরকার তাঁর বিলাত গমন আটকে দিল, এই অভিযোগটা সঠিক নয়। বিএনপির অনেক বড় বড় নেতা যাঁরা কারামুক্ত, তাঁরা চিকিৎসার জন্য হরহামেশা বিদেশে যাচ্ছেন। সরকার বাধা দেয়নি। সম্প্রতি বিএনপির একজন শীর্ষ নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ করোনায় আক্রান্ত হয়ে সিঙ্গাপুরে গিয়েছিলেন উন্নত চিকিৎসার জন্য। তিনি সেখানেই মৃত্যুবরণ করেছেন। খন্দকার মাহবুব সে জন্য কার ওপর দায় চাপাবেন?

kalerkanthoবর্তমানে খালেদা জিয়া বার্ধক্যজনিত যেসব রোগে ভুগছেন, তাতে তাঁর জীবন সংশয় ঘটছে না। তবু আমি প্রার্থনা করি, তিনি যেন দেশের ডাক্তারদের সঠিক চিকিৎসায় শিগগিরই সুস্থ হয়ে ওঠেন। তবে জীবন সংশয় হতে পারে এমন রোগাক্রান্ত বহু বিখ্যাত নেতা কারাগারে মৃত্যুবরণ করেছেন। তাঁদের দেশের সরকার মুক্তি দেয়নি। স্বাধীন ভারতে বিখ্যাত রাজনৈতিক নেতা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি কাশ্মীরের কারাগারে বন্দি অবস্থায় মারা যান। নকশাল আন্দোলনের বিখ্যাত নেতা চারুচন্দ্র মজুমদার ইন্দিরা গান্ধীর জেলে মারা যান। গ্রেপ্তার হওয়ার সময় তিনি ছিলেন মুমূর্ষু রোগী। কোনো মামলায় তখনো দণ্ডিত হননি। কিন্তু দেশে সন্ত্রাস বাড়বে এই ভয়ে মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও চারু মজুমদারকে চিকিৎসার জন্য প্যারোলেও মুক্তি দেওয়া হয়নি। তিনি জেলেই মারা যান। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের আইরিশ এমপি ববি স্যান্ডার্স জেলে অনশন করে মারা যান। তবু তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার তাঁকে মুক্তি দেননি।

আমি চাই না খালেদা জিয়াকে প্যারোলে মুক্তি দিয়ে চিকিৎসার জন্য বিলাতে যাওয়ার অনুমতিদানের মানবিক দিকটি উপেক্ষিত হোক। কিন্তু এই মানবিক দিকটির অপব্যবহার করেছেন খালেদা জিয়ার নিজস্ব চিকিৎসকরা এবং তাঁর দল। সত্যই কি খালেদা জিয়ার শরীরে করোনা পজিটিভ হয়ে দেখা দিয়েছিল? নাকি তাঁর পুরনো ব্রংকাইটিস রোগজনিত শ্বাসকষ্ট এবং আনুষঙ্গিক রোগগুলোকেই করোনার পজিটিভ লক্ষণ বলে ধরা হয়েছিল? আমি ডাক্তার নই, এই প্রশ্নের জবাব দিতে পারব না। তবে সাধারণ মানুষ হিসেবে ভেবে দেখেছি, খালেদা জিয়ার দেহে করোনা পজিটিভ যত দিন ধরে বলা হচ্ছে, এত দীর্ঘদিন কি তিনি স্বাভাবিক থাকতে পারতেন? আর সরকার তাঁকে বিদেশে যাওয়ার হয়তো অনুমতি দেবে; কিন্তু ব্রিটিশ সরকার একজন করোনা পজিটিভ রোগীকে (তিনি যতই গণ্যমান্য হোন) তাঁদের দেশে ঢোকার ভিসা দিতে না-ও পারে, এটা জানার সঙ্গে সঙ্গেই কি খালেদা জিয়া করোনামুক্ত হয়ে গেছেন? এই আকস্মিক ঘোষণা কি বাংলাদেশ সরকারের মনে এই সন্দেহ ঢোকাতে পারে না যে খালেদা জিয়ার করোনা রোগ নিয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যমূলক একটি নাটক করা হচ্ছে? সঙ্গে সঙ্গে সরকার সতর্ক হয়ে গেছে?

বিচারপতি শামসুদ্দীন চৌধুরী একটা বিতর্ক তুলেছিলেন যে একজন দণ্ডিত আসামিকে সরকার রোগের চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার অনুমতি দিতে পারে না, এটা পারেন যাঁরা দণ্ড দিয়েছেন সেই উচ্চ আদালত। তাঁর এই অভিমত নিয়ে বিতর্ক চলছে। কিন্তু এই বিতর্কে না গিয়ে আমরা সংগতভাবেই ভাবতে পারি, খালেদা জিয়া করোনা কেন, যেকোনো রোগেই তাঁর জীবন সংশয় দেখা দিয়ে থাকলে মানবিক কারণে তাঁকে বিদেশ গমনের অনুমতিদানের বিষয়টি বিবেচনায় ছিল। আইন মন্ত্রণালয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়—দুই মন্ত্রণালয়ই বিষয়টি নিয়ে গুরুত্বসহ চিন্তা-ভাবনা করছিল।

কিন্তু যখনই জানা গেল খালেদা জিয়া দৈববলে কারোনামুক্ত এবং তিনি এই মুহূর্তে জীবন সংশয় হতে পারে এমন কোনো রোগে ভুগছেন না, যেসব রোগে ভুগছেন তা বার্ধক্যজনিত, তখনই তাঁকে চিকিৎসার জন্য বিলাতে যাওয়ার অনুমতিদানের মানবিক বিবেচনা উবে গিয়ে রাজনৈতিক বিবেচনা সরকারের কাছে বড় হয়ে উঠেছে। তারা এখন জানে, খালেদা জিয়াকে লন্ডনে নেওয়ার এত জোর প্রচেষ্টার পেছনে চিকিৎসা নয়, রাজনৈতিক লক্ষ্য অথবা একটু কঠোরভাবে বলতে গেলে রাজনৈতিক চক্রান্ত কাজ করছে।

এই রাজনৈতিক খেলাটা বিএনপি এর আগেও খেলেছে। এক-এগারোর সরকারের আমলে দুর্নীতি, সন্ত্রাস, ক্ষমতার অপব্যবহার ইত্যাদি গুরুতর অপরাধের জন্য তারেক রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। ওই সরকারের আমলেই তিনি দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। বিএনপি মহল থেকে তখন জোর গুজব ছড়ানো হলো, কারাগারে তারেক রহমান গুরুতর অসুস্থ। আরো ছড়ানো হলো, জেলের অভ্যন্তরে কয়েকজন সামরিক অফিসার মেরে তাঁর হাড়গোড় ভেঙে দিয়েছেন। তিনি হাঁটতে পর্যন্ত পারেন না। এই প্রচারণার ফলে হাওয়া ভবনের অধীশ্বর সম্পর্কেও মানুষের মনে একটু করুণা জাগল। তারই সুযোগে তারেক রহমান চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার জন্য জামিন পেলেন।

আধাসামরিক সরকারের কাছে তারেক রহমান মুচলেকা দিলেন, তিনি জীবনে আর রাজনীতি করবেন না। ক্ষমতায় থাকতে যত অপরাধ তিনি করেছেন, সে জন্য দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চান। তারেক রহমান স্ট্রেচারে শুয়ে ঢাকা বিমানবন্দরে গেলেন। হিথরোতে পৌঁছতেই দেখা গেল তাঁর ভাঙা পা জোড়া লেগে গেছে। তিনি নিজের পায়েই হাঁটছেন। কয়েক দিনের মধ্যেই দেখা গেল তাঁর কোনো জটিল রোগ নেই। এরপর তাঁকে লন্ডনের নাইট ক্লাবে নাচতেও দেখা গেছে।

তারপর তারেক রহমানের জামিন শেষ হয়েছে ৮-১০ বছর হয়েছে। তিনি জামিনের সব শর্ত ভেঙে বিদেশে শাহজাদার জীবন যাপন করছেন। প্রকাশ্যে রাজনীতি করছেন। শেখ হাসিনা বিদেশে এলে তাঁর ওপর হামলা চালানোর ব্যবস্থা করেন। হাজার হাজার পাউন্ড খরচ করে জনসভা করেন। তাতে তাঁর পিতা জিয়াউর রহমানকে কখনো স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি, কখনো বাংলাদেশি জাতির পিতা বলে ঘোষণা করেন।

কিন্তু তারেক রহমানের চক্রান্তের রাজনীতি এযাবৎ কোনো সাফল্যই বয়ে আনেনি। কারণ তাঁর ঘৃণ্য এবং অপরাধমূলক কার্যকলাপ তাঁকে বিদেশে কোনো ক্রেডিবিলিটিই অর্জন করতে দেয়নি। ফলে তিনি বেশ কিছুকাল ধরে চেষ্টা চালাচ্ছেন তাঁর মাকে লন্ডনে নিয়ে এসে নতুন করে বাংলাদেশবিরোধী ষড়যন্ত্র শুরু করার।

এগুলো আমার মনগড়া কথা নয়। লন্ডনে বাস করি বলে তারেক রহমানের হালচালের খবর পাই নানা সূত্রে। তা ছাড়া ফেসবুকে তো খবরের ছড়াছড়ি। যদিও ফেসবুকের সব কথা বিশ্বাসযোগ্য নয়, কিন্তু বিলাতের বিএনপি মহল কর্তৃক প্রচারিত ফেসবুকের খবর সব সময় অবিশ্বাস করতেও পারি না। সম্প্রতি ফেসবুকে তারেক রহমান, তাঁর স্ত্রী এবং ব্যারিস্টার-কন্যা জাইমা রহমানের ছবি ছেপে বলা হয়েছে, জাইমা রহমান ব্রিটিশ আইনজীবীদের সহযোগিতায় তাঁর দাদি খালেদা জিয়া এবং পিতা তারেক রহমানকে বাংলাদেশের আদালতের বিভিন্ন দণ্ড থেকে মুক্ত করার চেষ্টা করছেন।

আরো একটি খবর ফেসবুকের মাধ্যমে ফাঁস হয়েছে। খবরটি হলো, বিদেশে যেহেতু তারেকের কোনো রাজনৈতিক ক্রেডিবিলিটি নেই, তাই বাংলাদেশের তিনবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে লন্ডনে এনে হাসিনা সরকারকে উচ্ছেদের জোরালো কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে। অর্থাৎ নতুন করে ষড়যন্ত্র শুরু করা হবে। এই খবরে এমন আভাসও দেওয়া হয়েছে যে খালেদা জিয়া লন্ডনে এসে পৌঁছলেই তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশের একটি অস্থায়ী সরকার গঠন করা হবে। এই সরকার বিশ্ববাসীকে জানাবে, বাংলাদেশের গত সাধারণ নির্বাচনটি সুষ্ঠুভাবে হয়নি। সুতরাং হাসিনা সরকার কোনো বৈধ সরকার নয়। এই অবৈধ সরকারকে সরিয়ে একটি বৈধ সরকার গঠনের জন্যই খালেদা জিয়া নানা অত্যাচার, নির্যাতনের মুখে বিদেশে চলে এসে অস্থায়ী সরকার গঠন করেছেন। এই সরকার গণতান্ত্রিক বিশ্বের সমর্থন ও সহযোগিতা চায়। এভাবে খালেদা জিয়া বিদেশে সরকার প্রতিষ্ঠা করবেন। আর দেশে নতুন করে বিএনপি-জামায়াত ভয়াবহ নাশকতামূলক কাজ শুরু করবে। খালেদা জিয়া তাঁর ছেলের মতোই আর দেশে ফিরে যাবেন না।

বাবুনগরীকে প্রধানমন্ত্রী করে যে দেশে সরকার গঠনের চক্রান্ত হতে পারে, সে দেশে তারেক রহমানের চক্রান্ত ও সন্ত্রাসের রাজনীতি কত দূর গড়াতে পারে তা কি লিখে কাউকে বোঝাতে হবে। শাপলা চত্বরে হেফাজতি উত্থানের সময় খালেদা জিয়া তো ক্ষমতা গ্রহণের জন্য প্রস্তুত হয়ে নিজের বাসভবনে অপেক্ষা করছিলেন এবং শেখ হাসিনাকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার আলটিমেটাম দিয়েছিলেন। তিন বছর, সাড়ে তিন বছর ধরে দেশে যারা হত্যার রাজনীতি চালাতে পারে, দিনে-দুপুরে গ্রেনেড মেরে শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের সব নেতাকে মেরে ফেলার ষড়যন্ত্র করতে পারে, করোনা-কন্সপিরেসি করা তো তাদের কাছে সামান্য ব্যাপার।

খালেদা জিয়াকে লন্ডনে চিকিৎসা লাভের জন্য অনুমতিদানটি বিবেচনায় মানবিক ও রাজনৈতিক বিবেচনা দুটিই ছিল। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনাটিই গুরুত্ব পেয়েছে। তার কারণ বিএনপির অতীত ও বর্তমানের সর্বনাশা রাজনৈতিক চক্রান্তের ইতিহাস। এই চক্রান্ত দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য এতই বিপজ্জনক যে এ ক্ষেত্রে মানবিক বিবেচনা গুরুত্ব পায়নি। মানবিক বিবেচনা তার সত্যতা প্রমাণ করতে পারেনি। চিকিৎসার জন্য লন্ডনে না গেলেও খালেদা জিয়ার জীবন অবশ্যই রক্ষা পাবে। কিন্তু তিনি লন্ডনে গেলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবার পঁচাত্তরের ঝোড়ো হাওয়া দেখা দিতে পারত। খালেদা জিয়ার রোগমুক্ত দীর্ঘ জীবন কামনা করে লেখাটা শেষ করছি। আমার পাঠকদের আগাম ঈদ মোবারক।

 

লন্ডন, সোমবার, ১০ মে, ২০২১