‘গণসচেতনতা দরকার কৃষিজমি ও কৃষকের অধিকার রক্ষায়’

প্রকাশিত

নিজস্ব প্রতিবেদক: ‘বসতবাড়ি তৈরি, কন্ট্রাক্ট ফার্মিং, চিংড়ি চাষ, তামাক চাষ, দোকানপাট নির্মাণ, ইটের ভাটা প্রভৃতি কারণে দিন দিন কমছে কৃষি জমি। খাদ্য নিরাপত্তার জন্য কৃষি জমি প্রয়োজন। যেভাবে কৃষি জমি হারিয়ে যাচ্ছে, তা খুবই উদ্বেগজনক। কৃষি জমি সুরক্ষায় এসব বন্ধ করতে হবে।’

শনিবার সকালে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা আরো বলেন, শুধু আইন তৈরি করে বা তা প্রয়োগ করে নয়, গণসচেতনতা ও গণআন্দোলনের মাধ্যমে কৃষিজমি ও কৃষকের অধিকার রক্ষা করতে হবে।

‘কৃষিজমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার আইন-এর জরুরি গুরুত্ব ও খাদ্য যোগানের নিশ্চয়তা’ শীর্ষক এ আলোচনার আয়োজন করে অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভলপমেন্ট (এএলআরডি)।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন আদিবাসীবিষয়ক সংসদীয় ককাসের আহ্বায়ক ও সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আইনজীবী রফিক আহম্মেদ সিরাজী। প্যানেল আলোচক ছিলেন ঐক্য ন্যাপের সভাপতি পঙ্কজ ভট্টাচার্য, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান ভূইয়া, বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টির পলিটব্যুরো সদস্য বিমল বিশ্বাস, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের নেতা অ্যাডভোকেট তবারক হোসেইন, গবেষক ও গ্রিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আবুল হোসেন এবং বাংলাদেশ কৃষক ফেডারেশনের সভাপতি বদরুল আলম। স্বাগত বক্তব্য দেন এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা।

মূল প্রবন্ধে রফিক আহম্মেদ সিরাজী বলেন, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১৫ সালের তথ্য অনুয়ায়ী, দেশের ১ কোটি ৫২ লাখ ৪৫ হাজার ৮৪১ দশমিক ৯৩ হেক্টর ভূমির মধ্যে আবাদযোগ্য ৮৫ লাখ ৫ হাজার ২৭৮ দশমিক ১৪ হেক্টর।  ভূমির ১৩ দশমিক ৩ শতাংশ জুড়ে বনভূমি, ২০ দশমিক ১ শতাংশে স্থায়ী জলাধার, ঘরবাড়ি, শিল্প-কলকারখানা, রাস্তাঘাট ইত্যাদি। অবশিষ্ট ৬৬ দশমিক ৬ শতাংশ জমি কৃষি কাজের জন্য ব্যবহার করা হয়। ২০০০ সাল থেকে ২০১১ এই ১২ বছরে দেশে প্রতি বছর ৬৮ হাজার ৭৬০ হেক্টর আবাদি জমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে। গড়ে প্রতিবছর ফসলি জমির পরিমাণ ৬৮ হাজার ৭০০ হেক্টর করে কমছে, যা মোট ফসলি জমির শূন্য দশমিক ৭৩৮ শতাংশ। প্রতিবছর আবাসন খাতে ৩০ হাজার ৮০৯  হেক্টর, নগর ও শিল্পাঞ্চলে ৪ হাজার ১২ হেক্টর এবং মাছ চাষে ৩ হাজার ২১৬ হেক্টর জমি যুক্ত হচ্ছে।

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ আবুল বারকাতের এক গবেষণার তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০০৩ সালে থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ২৬ লাখ ৫৫ হাজার ৭৩১ কৃষি জমি অকৃষি খাতে চলে গেছে। গড়ে প্রতিদিন ৬৬১.৪৫ একর কৃষি জমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে। প্রতিবছর প্রায় ১ শতাংশ হারে কৃষি জমি কমছে। অকৃষি খাতগুলোর মধ্যে রয়েছে- বসতবাড়ি তৈরি, কন্ট্রাক্ট ফার্মিং, চিংড়ি চাষ, তামাক চাষ, দোকানপাট নির্মাণ, হাউজিং সোসাইটি নির্মাণ, ইটের ভাটা প্রভৃতি।

সরকারি হিসেব অনুযায়ী ইটভাটার বর্তমান সংখ্যা ৬ হাজার ৯৩০। এগুলোর বেশিরভাগই কৃষিজমির ওপর গড়ে উঠেছে। দেশের বার্ষিক উৎপাদিত ইটের পরিমাণ ১৭ দশমিক ২ বিলিয়ন। এই ইট তৈরিতে ১২৭ কোটি সিএফটি মাটির দরকার হয়। এই মাটি সংগ্রহ করা হচ্ছে কৃষিজমির সবচেযে উর্বর অংশ (উপরিভাগ) থেকে।

কৃষিজমি যথাসম্ভব কৃষি কাজে ব্যবহার নিশ্চিত করা ভূমি ব্যবহার নীতির অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হলেও বাস্তব অবস্থা এর বিপরীত। ভূমি ব্যবহার নীতি ২০০১ এ বলা আছে, কৃষিজমি কৃষিকাজে ব্যতিরেকে অন্য কাজে ব্যবহার করা যাবে না। কৃষিজমি ভরাট করে বাড়ি-ঘর, শিল্পকারখানা, ইটভাটা বা অন্য অকৃষি স্থাপনা কোনোভাবেই নির্মাণ করা যাবে না। কিন্তু এ নীতির বাস্তবায়নে কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেই।

কীভাবে অকৃষি খাতে জমি চলে যায় তা দেখার জন্য আটটি সংগঠন জরিপ চালায়। তাতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ভূমিদখলের চিত্র উঠে এসেছে।

অনুষ্ঠানে বদরুল আলম বলেন, যে হারে কৃষিজমি বিলুপ্ত হচ্ছে, হারিয়ে যাচ্ছে, তা ভীষণভাবে উদ্বেগজনক। কৃষি আমাদের জীবন-জীবিকার প্রধান ক্ষেত্র। ভূমি ছাড়া কৃষি সম্ভব নয়। ভূমি জীবন-জীবিকার উৎস। কৃষক মানেই তার ভূমি থাকতে হবে। ভূমি না থাকলে কৃষক কোথায় চাষ করবে? আমাদের খাদ্য নিরাপত্তায় ভূমির প্রয়োজন। কৃষি আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা দিতে পারে।

কৃষক ও আদিবাসীদের স্বার্থের ব্যাপারে জোর দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, কৃষিজমি সুরক্ষার জন্য নীতিমালা আর কৃষক ও আদিবাসীদের অধিকারের জন্য একটি আইন করা খুবই জরুরি। আবাসনের নামে ব্যাপকভাবে দখল চলছে, কৃষিজমি সুরক্ষায় এসব দখল বন্ধ করতে হবে।

আইনজীবী তবারক হোসেন বলেন, একসময় কৃষক আন্দোলন খুবই জোরদার ছিল। কৃষকের গণসংগঠনগুলোকে আমরা টুকরো টকুরো করে নিশ্চিহ্ন করে ফেলেছি। এখানে যারা রাজনীতিক আছেন, তারা উদ্যোগ দিয়ে কৃষকদের আবার সংগঠিত করতে হবে।

কমরেড বিমল বিশ্বাস বলেন, এক ধরনের ভূমিদস্যু আছে, যারা শহরটাকে গ্রাস করছে। আরেক ধরনের ভূমিদস্যু আছে, যারা হতদরিদ্রের জমি জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে গ্রাস করছে। এই মুহূর্তে কৃষক আন্দোলনের কোনো অস্তিত্ব নেই।

কমরেড খালেকুজ্জামান বলেন, স্বাধীনতার পর মানুষ বেড়েছে দ্বিগুণ। খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে তিন গুণ। উৎপাদন বাড়িয়েছে কৃষকরাই। আপনার যারা আছেন তারা ঐক্যবদ্ধ হন। ভূমিদস্যুদের শক্তি চেয়ে জনগণের শক্তি বড় না করতে পারলে কাজ হবে না। আজ সময় এসেছে আপনার হাত মুষ্টিবদ্ধ করবেন না কি হাত উঁচু করে কাঁদবেন নেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার।

ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, গ্রামের দুর্বল লোকদের সাথেই ভূমিদস্যুতা বেশি হয়। তাদের জমি নিয়ে মামলা বেশি হয়। সবলরা মামলা এমনভাবে করে, দুর্বল লোকরে আর হাইকোর্ট পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না। একসময় তারা ওই ভূমিদস্যুর কাছে জমি বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়।

তিনি আরো বলেন, ভূমি সংস্কারে পশ্চিমবঙ্গে পঞ্চায়েত ব্যবস্থা ভূমিকা রাখে। আর আমাদের দেশে স্থানীয় সরকারব্যবস্থা বলে কোনো কিছু আছে বলে আমার মনে হয় না। আমি এই সিস্টেমের সাথে একমত না। কোটিপতিরা হচ্ছে মেয়র, বড় লোকরা হচ্ছে চেয়ারম্যান। লোকাল গভর্নমেন্ট সিস্টেম পরিবর্তন করতে হবে। চেয়ারম্যান হতে হবে কৃষকের মধ্য থেকে। আমাদের লোকাল গভর্নমেন্টের সদস্য সংখ্যা বাড়িয়ে মেম্বারদের মধ্যে ইনডাইরেক্ট ভোটে চেয়ারম্যান, পৌর মেয়র এদের বানাতে হবে। তাহলে আমাদের ভিতর থেকে নারী-পুরুষ মিলে লোকাল গভর্নমেন্ট উঠে আসতে পারে।

পঙ্কজ ভট্টাচার্য বলেন, যারা দেশটাকে বাঁচিয়ে রাখছে তারা কৃষক-শ্রমিক আর নারী। যারা বাঁচিয়ে রেখেছে আজ তাদের মেরে বহুমুখী কার্যক্রম হচ্ছে। যারা রাষ্ট্রকে টিকেয়ে রেখেছে, এই শক্তিগুলো আজ উপেক্ষিত। তাদের অধিকার ফিরিয়ে আনতে হবে। কৃষক ছাড়া মুক্তিযুদ্ধ হয়নি। যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছে তার ৯০ শতাংশই কৃষক বা কৃষকের সন্তান। কৃষকদের মুক্তির জন্য একটি রাজনৈতিক ছাতার দরকার। যার তলে দাঁড়িয়ে কৃষক বাচাঁনোর জন্য, দেশ বাঁচানোর জন্য আমরা একসাথে লড়ব, একসাথে মরব- এই প্রতিজ্ঞা করে নামতে হবে।

আলোচনা সভায় কৃষিজমি রক্ষায় আটটি সুপারিশ করা হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সুপারিশগুলো হচ্ছে- অবিলম্বে প্রস্তাবিত কৃষিজমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার আইন প্রণয়ন ও কার্যকর করতে ভূমি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। কৃষি খাস জমি ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে বন্দোবস্ত দেওয়া সুনিশ্চিত করতে হবে। কৃষি খাস জমি কোনো প্রকার অকৃষি কাজে ব্যবহারে বন্দোবস্ত দেওয়া যাবে না, এ বিধান প্রবর্তন করে কার্যকর করতে হবে। অকৃষি খাস জমিকে কেবল উন্নয়ন কাজেই বন্দোবস্ত দেওয়ার বিধান করতে হবে। ইটভাটার গ্রাস থেকে কৃষিজমিকে বাঁচাতে হবে এবং কৃষিজমি রক্ষায় সচেতনতার জন্য ব্যাপক প্রচার চালাতে হবে।