গাজীপুরে মিটারে চলেনা কোন সিএনজি

প্রকাশিত

তুহিন সারোয়ার-

গাজীপুরে মিটারে যেতে অনীহা সিএনজি চালকদের। অনীহার পেছনে হাজারো খোঁড়া যুক্তি তাদের। মিটার ভালো নয়, যানজট ইত্যাদি। উল্টো তারা যাত্রীদের শিখিয়ে দেন, ‘ট্রাফিক পুলিশ জিজ্ঞেস করলে বলবেন, মিটারে যাচ্ছেন’। তবে গাজীপুরবাসীর প্রতিনিয়ত সিএনজি চালকদের এই খামখেয়ালি আর নৈরাজ্যের শিকার হলেও এবং সমস্যাটা সর্বজনবিদিত হলেও না জানার ভান করে আছে বিআরটিএ, ট্রাফিক পুলিশ ও অটোরিকশার মালিকেরা। দেখে মনে হয়, যেন তারা একাট্টা হয়ে যাত্রীদের তামাশা দেখছেন আর অটোরিকশা চালকদের অন্যায় অব্যাহত রাখতে অঙ্গীকার করেছেন- এমন অভিযোগ যাত্রীদের।

গাজীপুর কলেজগেট থেকে জরুরি কাজে টঙ্গীবাজার  যাবেন জাকির হোসেন। দীর্ঘক্ষণ বাসের অপেক্ষা করার  পরও অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে বাসে উঠতে পারেননি। তাই বাধ্য হয়ে সিএনজিতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তখন শুরু হয় সিএনজি ঠিক করার আরেক যুদ্ধ।

তিনি বলেন, টঙ্গীবাজার যাওয়ার জন্য তিন জন চালকের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা কেউ যাবে না। এরপর যারা যেতে চাইলো তারা কেউ মিটারে যেতে রাজি না। যেতে ভাড়া লাগবে একদাম সাড়ে ২০০ টাকা বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন অন্য আরেকজন চালক। অথচ মিটারে গেলে সর্বোচ্চ ৫০ থেকে ৭০ টাকা লাগত।

বোর্ডবাজার এলাকার বাসিন্দা ফারজানা খাতুন বলেন, চাকরির কারণে প্রতিদিন রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় যেতে হয়। বাসে অতিরিক্ত ভিড় থাকে আবার সিটিং সার্ভিসের জন্য অনেক বাসের গেইট বন্ধ থাকে। ফলে প্রায় নিয়মিত সিএনজিতে যাতায়াত করতে হয়। কিন্তু সবসময় কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য অনুযায়ী চালকরা যেতে চান না। কোনো সিএনজি কখনই মিটারে যায় না। তারা অতিরিক্ত ভাড়া দাবি করে সব সময়। যে গন্তব্যে যেতে মিটারে ভাড়া পড়বে ১৫০ টাকা সেই ভাড়া দিতে হয় ৩০০ টাকা। তারা যাত্রীদের জিম্মি করে ভাড়া আদায় করে। আমারা যাত্রীরা তাদের কাছে অসহায়।

ভুক্তভুগিরা জানান, জরুরি কাজে রাস্তায় বের হলেও স্টেশনে প্রয়োজনের তুলনায় সিএনজি চালিত অটোরিকশা মেলে না। দু’একটা যাও মিলছে তাতে আবার ভাড়া কয়েকগুণ বেশি। এ সময় যাত্রীর গন্তব্যের কথা বললে চালকেরা অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিশ্চুপ থাকেন। আর মিটারের কথা বলা মাত্রই তারা সাফ জানিয়ে দেন যাওয়া সম্ভব নয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তার মোড়ে সিএনজি নিয়ে বসে থাকবেন ঠিকই কিন্তু কিছুতেই মিটার বিলে যাত্রী ওঠাবেন না চালকেরা। গাজীপুরে এটাই প্রচলিত। এতে প্রতিনিয়ত চরম দুর্ভোগে পড়েন যাত্রীরা। প্রয়োজনকে জিম্মি করে সিএনজি চালকেরা অধিক ভাড়া আদায় করছে বলে অভিযোগ যাত্রীদের। বিষয়টি সবারই জানা। কিন্তু সমাধানে নেই কোনো পদক্ষেপ। চুক্তিতে সম্মত হলেই সিএনজি চালিত অটোরিকশার চাকা ঘুরবে। যাত্রীদের আরও অভিযোগ, দর কষাকষি করে ভাড়া নির্ধারণ করার পর চালকেরা আরেকটি শর্ত জুড়ে দেন। আর সেটি হচ্ছে ‘থানা পুলিশের চেকপোস্ট এবং ট্রাফিক পুলিশ জিজ্ঞেস করলে যাত্রীকে বলতে হবে চালক মিটারের বিল অনুযায়ী ভাড়া নেবেন’

তবে অটোরিকশাচালকরা মিটারে না যাওয়ার পেছনে কিছুটা হলেও যাত্রীদেরও দোষ রয়েছে। চালকরা যাত্রীদের মুখ থেকেই নানা কথা বলিয়ে ট্রাফিক পুলিশের হাত থেকে চালকদের রেহাই দেওয়ার সুযোগ করে দেন। এমন অভিযোগ ট্রাফিক পুলিশদের।

‘অটোরিকশা মিটারে চলে না’ এ বিষয়ে বাংলাদের রোড ট্রান্সপোর্ট অথোরিটির (বিআরটিএ) নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. আব্দুস সালাম চ্যানেল সিক্সকে বলেন,‘প্রতিদিন আমাদের অভিযান চলে যানবাহনের অনেক অনিয়ম বন্ধের জন্য। দীর্ঘ দিনের সমস্যা এক দিনে শেষ হবে না। অটোরিকশা মিটারে না চলার অভিযোগে পেলে আমরা আইনি ব্যবস্থা নিয়ে থাকি।’ এ ক্ষেত্রে যাত্রীদের সহায়তা প্রত্যাশা করেন তিনি।

এ বিষয়ে সিএনজি চালক আকরাম আলী চ্যানেল সিক্স কে জানান, এটা ঠিক যে সিএনজি চালকরা নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি ভাড়া আাদয় করে। কারণ আমাদের মিটারে চলাচল করলে লাভ থাকে না। এমনিতেই জমার টাকা বেশি। দোষ চালকদের হলেও আড়াল থেকে কলকাঠি নাড়ছেন সিএনজিচালিত অটোরিকশার মালিকরা। তারা নির্ধারিত টাকার চেয়ে প্রতিদিন অতিরিক্ত জমার টাকা আদায় করছেন। আবার যানটি দুই বেলা দুই চালকের কাছে দিচ্ছেন। তাই বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করতে হয়।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, সিএনজির ক্ষেত্রে এখন সরকার নির্ধারিত জমা ৯০০ টাকা। কিন্তু মালিকরা আমাদের কাজ থেকে ১১০০ থেকে ১৫০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করে।

বিষয়টি স্বীকার করে নিয়ে সিএনজি অটোরিকশার একজন মালিক চ্যানেল সিক্স কে বলেন, জমার টাকা একটু বেশি না নিলে চলে না। কারণ একটা সিএনজি রাস্তায় চালালে ট্রাফিক পুলিশেৱ মাসিক মাসোহাৱাসহ অনেক ধরনের খরচ আছে যা মালিকদেরই দিতে হয়। এছাড়া যেভাবে সব কিছুর দাম বাড়ছে তাতে করে জমার টাকা কিছুটা বেশি না নিলে তো আমরা টিকে থাকতে পারবো না।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো: মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, যাত্রীদের জিম্মি করে এই খাতে নৈরাজ্য চালাচ্ছেন মালিক ও চালকেরা। তারা ইচ্ছেমতো জমা ও ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছেন। সেক্ষেত্রে বিআরটিএ ও ট্রাফিক পুলিশের যৌথ অভিযানের মাধ্যমে মিটারবিহীন চলাচল বন্ধ করতে হবে। সেই সঙ্গে মালিক কর্তৃক অবৈধ অতিরিক্ত জমা আদায় বন্ধে কোম্পানি ভিত্তিক অটোরিকশা পরিচালনা বা সরকারি কোষাগারের জমা আদায় করে তা মাসিক ভিত্তিতে মালিককে বণ্টনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।