চট্টগ্রামে রাইফার মৃত্যুতে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন

প্রকাশিত

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি : হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা ও চিকিৎসকের অবহেলা আর গাফিলতিতে ২ বছর চার মাস বয়সী শিশুকণ্যা রাইফার মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ করেন রাইফার পরিবার। দৈনিক সমকালের চট্টগ্রাম ব্যুরোর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক রুবেল খান রবিবার তার নিজ বাসায় এ অভিযোগটি করেন।
রাইফার মৃত্যুর কারণ জানতে এ ঘটনায় গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি রবিবার দুপুরে রুবেলের বাসায় গেলে পুরো ঘটনার বিবরণ কমিটির কাছে তুলে ধরেন।
চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব ও সাংবাদিক ইউনিয়নের সদস্য রুবেল খান বলেন, বুধবার রাতে রাইফার ঠাণ্ডা লেগে গলা ব্যথা শুরু হয়। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে সে খাওয়ার বন্ধ করে দেন। মেয়েকে সুস্থ করতে ম্যাক্স হাসপাতালের পরিচালক লিয়াকত আলীকে ফোন করে বৃহস্পতিবার বিকেলে রাইফাকে ভর্তি করানো হয়।
কিন্তু ভর্তির পর থেকেই তিনি এ হাসপাতালটির নানা অব্যবস্থাপনা লক্ষ্য করেছেন। জরুরি বিভাগসহ হাসপাতালের এ ফ্লোর টু ওই ফ্লোরে দৌড়ঝাপ করতে হয়েছে প্রায় দুঘন্টা। হাসপাতালের এ অবস্থা পরিলক্ষিত হলে পরিচাক লিয়াকতের সাহায্য চাওয়া হয়। তিনি ফোনে বিষয়টি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বলে দেন। পরে কেবিনে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দিয়ে হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক রাইফাকে একটি অ্যান্টিবায়োটিক ইনজেকশন দেন।
এরপর পরই রাইফাকে ছটফট করতে দেখে বিষয়টি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে জানায়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তৎক্ষনাৎ নাক, কান, গলা বিশেষজ্ঞ এক চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে বলেন। সেই প্রেক্ষিতে এসব রোগের হাসপাতালটির বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সুমন তালুকদারের পরামর্শে দুটি এক্স-রে করানো হয় রাইফার। এ দুটি রিপোর্টে তেমন কোন সমস্যা না পেয়ে ডাক্তার সুমন একজন শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে পরামর্শ দেন।
তার এ পরামর্শটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সাথে আলাপ আলোচনা করে হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. বিধান রায় চৌধুরীকে অনকলে আনা হয়। এ কলে বিধান রায় হাসপাতালে উপস্থিত হলেও রাইফাকে না দেখে শুধুমাত্র কর্তব্যরত চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন দেখেই ওষুধ লিখে দেন। তিনি যে ওষুধ দিয়েছেন তার পরই রাইফার খিঁচুনি শুরু হয়। তখন ম্যাক্স হাসপাতালের দায়িত্বরত চিকিৎসক দেবাশীষকে জানালে তিনি ডা. বিধানের সাথে কথা বলে ‘সেডিল’ ইনজেকশন পুশ করেন। এরপরেই রাইফার মৃত্যু হয়।
রুবেল খান অভিযোগ করে বলেন ডাক্তাররা ভুল চিকিৎসা ও অবহেলা করে আমার সন্তানকে হত্যা করেছে। তিনি বলেন, কিছু ডাক্তার চিকিৎসা সেবার নামে বাণিজ্য খুলে বসেছে। অর্থের লোভে তারা সামান্য রোগকে জটিল রুপ দিয়ে হাই এন্টিবাইটিক ওষুধ দিয়ে রোগীকে মেরে ফেলছে। এ কাজটি আমার সাথেও করেছে ডাক্তার বিধান রায়। তিনি কলে কেবিনে এসে রোগীর গায়ে স্পর্শ না করে একজন শিশুকে অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ লিখে দিয়ে দুই হাজার দুইশত টাকার একটি বিলের রশিদ ধরিয়ে হাসপাতাল ত্যাগ করেছেন।
রাইফার মৃত্যুর পর সাংবাদিক সমাজসহ সর্বস্থরের নিন্দা ও প্রতিবাদে সিভিল সার্জনকে প্রধান করে গঠিত তদন্ত কমিটি মৃত্যুর আসল কারণ অনুসন্ধানে সাংবাদিক রুবেল খানের বাসায় যান কমিটির তিন সদস্য।
কমিটি প্রধান চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন ড. আজিজুল ইসলাম ভুঁইয়া, দৈনিক আজাদীর সিনিয়র রিপোর্টার সবুর শুভ এবং চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান প্রফেসর ডা. প্রনব কুমার চৌধুরী ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারের সকলের কথা শোনেন এবং রাইফার মৃত্যুর আগে ও পরের চিকিৎসা সম্পর্কিত যাবতীয় কাগজ পত্রাদি সংগ্রহ করেন।
এসময় চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন ড. আজিজুল ইসলাম ভুঁইয়া বলেন, রাইফার মৃত্যুর সঠিক কারণ অনুসন্ধানে তাদের সর্বাত্মক চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তারা ইতিমধ্যে ম্যাক্স হাসপাতালের দায়িত্বরত ও কর্মরত বিভিন্ন কর্মকর্তা এবং পরিচালকদ্বয়ের সাথে কথা বলেছে। কথা হয়েছে অভিযুক্ত ডাক্তার ও নার্সের সাথেও। তাছাড়া সরকারি স্বাস্থ্য দপ্তরেও এর সঠিক তথ্যগুলো যথাসময়ে পেশ করা হচ্ছে।
আজ রাইফার বাবা মা ও ঘটনাস্থলে থাকা উপস্থিত আত্মীয় স্বজনদের সাথে কথা বলতে সাংবাদিক রুবেল খানের বাসায় এসেছি। তিনি আশা করেন তাদের বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যেই রাইফার মৃত্যু সঠিক কারণ অনুসন্ধান করে দোষীদের শাস্তির আওতায় আনা হবে।
এদিকে একমাত্র কণ্যা সন্তানের মৃত্যুর পর তার শোক সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা ও সান্তনা দিতে সাংবাদিক রুবেল খানের বাসায় ছুটে গিয়েছেন চট্টগ্রাম সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন। ঢাকায় কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় যোগ দিতে ঘটনার দিন ঢাকায় ছিলেন মেয়র। ঢাকা থেকে এসই তিনি ছুটে আসেন রুবেল খানের বাসায়। তিনি ঘটনার সুষ্ট তদন্ত অনুসন্ধানে সার্বিক সহযোগীতার আশ্বাস দিয়ে বলেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কিংবা চিকিৎসকের ভুল চিকিৎসায় রাইফার মৃত্যু প্রমাণ কলে দোষীদের বিচার করা হবে।
তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, এমন একটি আইন তৈরি করতে হবে যে আইনে ডাক্তার বা নার্সের অবহেলা অবজ্ঞা বা ভুল চিকিৎসার কারণে রোগী মৃত্যু বরণ করলে যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। টাকা দিয়ে তো আর প্রাণ ফিরিয়ে দেয়া সম্ভব নয় তবুও ক্ষতিগ্রস্থদের ক্ষতিপূরণের পাশাপাশি উপযুক্ত শাস্থি প্রদান করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। এমনকি সেসব চিকিৎসকের প্রাপ্ত সনদ বাতিল করে তার চিকিৎসা সেবা বন্ধ করে দিতে হবে। পরে তিনি সাংবাদিক রুবেল খান ও তার পরিবারকে সান্তনা দেন।
এর আগে চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি ক্লিনিক ম্যাক্স হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় আড়াই বছরের শিশু কণ্যা রাইফা খানের মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠে। ডাক্তার-নার্সের ভুল চিকিৎসায় শুক্রবার রাত ১২ টায় নগরীর ম্যাক্স হাসপাতালে রাইফা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। ঘটনার পর শুক্রবার রাতেই অভিযুক্ত দুই চিকিৎসক সুমন তালুকদার ও বিধান রায়সহ তিনজনকে আটক করে চকবাজার থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। পরে শনিবার ভোরে চট্টগ্রামের বিএমএ নেতারা তাঁদের ছাড়িয়ে নিয়ে যান।
এর প্রতিবাদে শনিবার বিকালে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব ও সাংবাদিক ইউনিয়নের উদ্দ্যেগে সাংবাদিক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। বিকেলে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সামনে বিক্ষুব্ধ প্রতিবাদ সমাবেশে সাংবাদিক নেতারা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের শাস্থির দাবি করেন। চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের (সিইউজে) সভাপতি নাজিমুদ্দীন শ্যামলের সভাপতিত্বে সাধারণ সম্পাদক হাসান ফেরদৌসের সঞ্চালনায় সভায় বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) সাধারণ সম্পাদক ওমর ফারুক, সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল ভুইয়া, চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সভাপতি কলিম সরোয়ার, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি আবু জাফর সুর্য, সাবেক সভাপতি শাবান মাহমুদ, সাবেক যুগ্ম সম্পাদক জাকারিয়া কাজল, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সহ-সভাপতি শহীদ উল আলম, যুগ্ম সম্পাদক তপন চক্রবর্তী, নির্বাহী সদস্য আসিফ সিরাজ, সিইউজের সিনিয়র সহ-সভাপতি মাঈনুদ্দীন দুলাল, চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সহ-সভাপতি কাজী আবুল মনসুর, যুগ্ম সম্পাদক চৌধুরী ফরিদ, সিইউজের অর্থ সম্পাদক কাশেম শাহ, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আহমেদ কুতুব, নির্বাহী সদস্য উত্তম সেনগুপ্ত ও ভুল চিকিৎসায় মৃত্যু হওয়া শিশু রাইফার বাবা সাংবাদিক রুবেল খান প্রমুখ।
শনিবার ভুল চিকিৎসায় শিশু রাইফার মৃত্যুর ঘটনায় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা সিভিল সার্জন।  কমিটিকে আগামী পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।