চট্টগ্রাম সড়কে এখনো অনিয়মের সেই দৃশ্য

প্রকাশিত

সড়কে এখনো অনিয়মের সেই দৃশ্য

উল্টোপথে চলছেই গাড়ি। গতকাল দুপুরে চট্টগ্রাম নগরের আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভার থেকে তোলা।

চট্টগ্রাম মহানগরের সড়কে শৃঙ্খলা ফেরছেই না। ট্রাফিক সপ্তাহ উপলক্ষে পুলিশের ব্যাপক তল্লাশি, মামলা ও জরিমানা সত্ত্বেও গাড়িচালকদের বেপরোয়াভাব কমছে না। সেই সঙ্গে রয়ে গেছে পুরনো নানা অনিয়মের দৃশ্যগুলো। উল্টোপথে গাড়ি চালানো, ওভারটেক প্রতিযোগিতা এবং পথচারীদের হুড়োহুড়ি করে সড়ক পার হওয়ার দৃশ্য যথারীতি চোখে পড়ছেই।

গতকাল রবিবার বেলা ১১টা থেকে দেড়টা পর্যন্ত নগরের বিভিন্ন সড়ক ঘুরে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি দেখা গেছে। এ সময় ট্রাফিক পুলিশের গাড়ির কাগজপত্র তল্লাশি কার্যক্রম যেমন দেখা গেছে তেমনি গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে বিশৃঙ্খলাও দেখা গেছে সমানে। অর্থাৎ, মামলা ও জরিমানার শিকার হওয়ার পরও চালকেরা সচেতন হচ্ছেন না। আবার পথচারীরাও নিজেদের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় না নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে সড়ক পার হচ্ছেন।

বেলা সোয়া ১১টায় মুরাদপুর মোড়ে দেখা গেল গাড়ি ও পথচারীদের জটলা। হাটহাজারী সড়কের একপাশ দখল করে গাড়ি পার্কিং করা হয়েছে। সেখানে দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা হাতের ইশারায় গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করছেন। কিন্তু তা সুশৃঙ্খলভাবে হচ্ছিল না। এরই মধ্যে কোলে শিশু নিয়ে দৌঁড়ে সড়ক পার হচ্ছিলেন এক নারী। কিন্তু সামনে পড়ে বহদ্দারহাটমুখী একটি প্রাইভেট কার। অল্পের জন্য রক্ষা পান তিনি।

বহদ্দারহাট যাওয়ার পথে দেখা গেল গাড়ির চাপ। সেখানে ফ্লাইওভারের নিচ দিয়ে অন্য প্রান্ত থেকে উল্টোপথে গাড়ি আসছে হাটহাজারীমুখী সড়কে প্রবেশের জন্য। রিকশা ও অটোরিকশার লাইন পড়েছে। উভয়মুখী গাড়ি চলাচলনের সঙ্গে কিছু যাত্রীকে দেখা যায় গাড়ির জন্য অপেক্ষা করতে। বহদ্দারহাট মোড়ে গিয়ে দেখা গেল চতুর্রমুখী গাড়ির চাপ সামাল দিতে ট্রাফিক পুলিশের হিমশিম অবস্থা। পথচারীরা যেমন দৌঁড়ে সড়ক পার হচ্ছেন তেমনি রিকশাচালকরাও বেপরোয়া।

বহদ্দারহাট ঘুরে পুনরায় মুরাদপুর আসার পথে শুলকবহর এলাকায় এসে ফ্লাইওভারের মুখে দেখা গেল সড়কে বড় গর্ত। একটি প্রাইভেট কারের চাকা পড়েছে গর্তে। সেই কারণে দেখা দিয়েছে যানজটের। অবশ্য অল্প ক্ষণের মধ্যেই চালক গর্ত থেকে প্রাইভেট কার তুলে আনতে সক্ষম হন।

দুপুর সাড়ে ১২টার পর নগরের জিইসির মোড়ে এসে দেখা গেল তীব্র যানজট। সড়ক অনেকটা স্থবির। এখানে পুলিশের তৎপরতাও বেশ লক্ষণীয়। পরক্ষণে জানা গেল, জিইসি কনভেনশন হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে এসেছেন। সেই কারণে জিইসির মোড় ঘিরে পুলিশের বাড়তি তৎপরতা। এ তৎপরতার বাড়তি ফল যানজট।

জিইসির মোড়ে কথা হয় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হিসাব কর্মকর্তা আবদুল মাবুদের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘চালাক, যাত্রী ও পথচারী সচেতন না হলে ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নতি হবে না। আমরা সড়ক পার হচ্ছি, কিন্তু জেব্রা ক্রসিং ব্যবহার করছি না। আবার সিগন্যাল বাতির পরিবর্তে ট্রাফিক পুলিশ হাতের ইশারায় গাড়িগুলোকে সংকেত দিচ্ছে। এভাবে তো ট্রাফিক ব্যবস্থার সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই পুরো ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাকেই ঢেলে সাজাতে হবে। সড়ক ব্যবহারকারীদের দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।’

ট্রাফিক সপ্তাহের মধ্যেও সড়কে বিশৃঙ্খলা কেন?-এমন প্রশ্নের জবাবে নগর ট্রাফিক পুলিশের সার্জেন্ট মোহাম্মদ শাহনেওয়াজ বলেন, ‘ট্রাফিক সপ্তাহ এবং এর আগে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর মানুষ অনেক সচেতন হয়েছে, এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়।’ তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রাম নগর ট্রাফিক পুলিশে সাত বছর ধরে দায়িত্বপালন করছি। অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে এবারের অবস্থা ভিন্ন। অনেক পরিবর্তন হয়েছে। চালকদের কাছে লাইসেন্স ও গাড়ির কাগজপত্র অতীতের চেয়ে বেশি ভালো অবস্থায় পাওয়া যাচ্ছে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সব গাড়িই রাতারাতি কাগজপত্র ঠিক করেছে কিংবা ফিটনেস আছে এমন দাবি করব না। তবে বলব, পরিস্থিতি অতীতের চেয়ে ভালো দেখা যাচ্ছে।’

একই দাবি করেন আরেক সার্জেন্ট মো. ওয়াসিম আরাফাত। গতকাল বেলা দুটা পর্যন্ত তিনি জিইসির মোড় এলাকায় দায়িত্বপালন করেন। বললেন, ‘রবিবার দ্রুতগতিতে গাড়ি চলাচল, ফিটনেস না থাকা, চালকের লাইসেন্স না থাকা এবং উল্টোপথে গাড়ি চালানোর অপরাধে সাতটি মামলা দিয়েছি। কিন্তু চালকদের মধ্যে সচেতনতা দেখা গেছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর সবক্ষেত্রেই ঝাঁকুনি পড়েছে। এখন ট্রাফিক সপ্তাহের পর এই সফলতা কতোটা ধরে রাখা যায়, সেটাই দেখার বিষয়।’

ট্রাফিক সপ্তাহেও সড়কে শৃঙ্খলা না ফেরার বিষয়ে নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) কুসুম দেওয়ান  জানান, ট্রাফিক সপ্তাহের সাত দিনে ১১ আগস্ট পর্যন্ত আট হাজার ৩৪৯টি মামলা, ৬২৬টি গাড়ি ডাম্পিংয়ে নেওয়া এবং ২২ লাখ ৮৫ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘ট্রাফিক সপ্তাহে সড়কে অবশ্যই আগের চেয়ে বেশি শৃঙ্খলা দেখা গেছে। তবে সড়কের পরিস্থিতি রাতারাতি ট্রাফিক পুলিশ ঠিক করতে পারবে না। এ জন্য চালক, যাত্রী, পথচারীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। তবেই সড়কে শৃঙ্খলা ফেরবে।’

তাঁর মতে, ‘সড়কে অন্তত ৯০ শতাংশ মানুষ ট্রাফিক আইন মানেন না, তাহলে শৃঙ্খলা ফেরবে কী করে। তাই আগে সড়ক ব্যবহারকারীদের ট্রাফিক আইন মানতে হবে, তাহলেই সড়কে শৃঙ্খলা ফিরবে।’