চট্টগ্রাম হতাশ করল না আরও একবার

প্রকাশিত

ইয়াসিন হাসান, চট্টগ্রাম থেকে:বাংলাদেশের পয়মন্ত মাঠ বলা হয় সাগরিকার জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামকে। সাগরিকার বিশাল জলরাশির মতো বিশাল হৃদয় চট্টগ্রামের এ মাঠের। দু’হাত ভরে বাংলাদেশকে দেয় সাফল্য। যে সাফল্য অংশীদার হয় ষোলোকোটি মানুষের হৃদয়। আরও একবার চট্টগ্রাম হতাশ করল না বাংলাদেশ দলকে।

ড্র হলো বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা টেস্ট।পিছিয়ে থেকেও দারুণভাবে হার এড়িয়েছে বাংলাদেশ। শ্রীলঙ্কা জয় দেখছিল চতুর্থ দিনে।নিজেদের স্বাধীনতা দিবসে দেশকে জয় উপহার দেওয়ার পরিকল্পনা হয়তো করেছিল! কিন্তু আজ উলট-পালট করে দিল বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা। ভালো দিন কাটানোর জন্য রাতভর দেখা স্বপ্ন সত্যি হলো টাইগারদের।

১০৫তম টেস্টে এটি বাংলাদেশের ষোলোতম টেস্ট ড্র। যার ছয়টিই চট্টগ্রামে। প্রথম টেস্ট জয়ের ঘ্রাণ এখনও সুবাতাস দেয় বাংলাদেশ শিবিরে। ওই জয় দেয় আত্মবিশ্বাস। সাথে ভারত, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ড্র রীতিমত বাংলাদেশের জন্য জয়ের সমতুল্য! বৃষ্টিতে ড্র হয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে এর আগেও এখানে একটি টেস্ট ড্র হয়েছিল। আজ সেই সাফল্যের মুকুটে যোগ হলো আরেকটি পালক।

মুমিনুল প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে এক টেস্টে দুই সেঞ্চুরি করেছেন। অফ ফর্মে থাকা লিটন খেলেছেন ক্যারিয়ারের সেরা ইনিংস। তাদের দুজনের ১৮০ রানের জুটিতে শ্রীলঙ্কা হারায় মনোবল। তাতেই ড্র নিশ্চিত বাংলাদেশের। ১১৯ রানে পিছিয়ে থেকে আজ পঞ্চম দিনে ব্যাটিংয়ে নেমে ৫ উইকেটে ৩০৭ রান করে বাংলাদেশ। ততক্ষণে বাংলাদেশের দ্বিতীয় ইনিংসে লিড ১০৭ রানের। ফল বের হবে না নিশ্চিত। তাই দুই দল মেনে নেয় ড্র।

রৌদ্রজ্জ্বল দিনে শুরু থেকেই লিটন ও মুমিনুল লঙ্কান বোলারদের উপর আক্রমণ করেন। বাজে বলগুলোকে বাউন্ডারিতে পাঠাতে কার্পণ্য করেননি। দিনের শুরুতেই ৭৮ বলে মুমিনুল তুলে নেন ফিফটি। এরপর ধারাবাহিকভাবেই বেড়েছে তার রানের গতি।

আগের দিন তিন ওভারের বোলিংয়ে তামিমের উইকটে নিয়ে বাংলাদেশকে বড় ধাক্কা দিয়েছিলেন লাকশান সান্দাকান। আজ দিনের প্রথম ঘন্টার শেষ দিকে চান্দিমাল চায়নাম্যানের হাতে বল তুলে দিলেও লিটন তার মনোবল নষ্ট করে দেন শুরুতেই। প্রথম ওভারেই তাকে দুটি বাউন্ডারি এবং এক ওভার পর আরও একটি বাউন্ডারি হাঁকান লিটন।

ব্যাট হাতে প্রথম ঘন্টা দারুণ কাটে বাংলাদেশের। কোনো ব্যাটসম্যানকে না হারিয়ে বাংলাদেশ বুঝিয়ে দিচ্ছিল চাইলে তারাও ব্যাটিং করতে পারে অনন্তকাল! সেটা যেকোনো মুহূর্তে, যেকোনো মঞ্চে।  লিটন  ও মুমিনুল কোনো সুযোগ না দিয়ে ব্যাটিং করে যান ২৮.১ ওভার। এ সময়ে ১০৬ রান জমা করলেও প্রতিটি শটে ছিল জোড়াল আত্মবিশ্বাস।

১৩ রানে পিছিয়ে থেকে মধ্যাহ্ন বিরতিতে যায় বাংলাদেশ। বিরতির আগে ৭০ রানে অপরাজিত মুমিনুল। প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে জোড়া সেঞ্চুরি তুলে নিতে পারেন কিনা সেটা দেখার অপেক্ষায় ছিল পুরো বাংলাদেশ। হতাশ করেননি বাংলাদেশের ‘ব্র্যাডম্যান।’

ঠিকই দুই ইনিংসে দুই সেঞ্চুরি তুলে বসেছেন স্যার ডন ব্র্যাডম্যানের পাশে। সঙ্গী হিসেবে পেয়েছেন সুনীল গাভাস্কার, ব্রায়ান লারা, স্যার গ্যারি সোবার্সসহ আরও ৬৬ কিংবদন্তিকে। যারা প্রত্যেকে একেকটি ইতিহাসের অধ্যায়। মুমিনুল সেই ক্লাবে যোগ দিলেন যোগ্যতম ক্রিকেটার হিসেবেই।

কাভার ও পয়েন্টের মাঝ দিয়ে সান্দাকানের বলটি ঠেলে দিয়ে ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ সেঞ্চুরি তুলে নেন মুমিনুল। তবে হঠাৎ বাজে এক বলে আউট মুমিনুল। তাও ধনাঞ্জয়া ডি সিলভার বলে। প্রথম ইনিংসে ১৭৬ রান পেয়ে ক্ষুধা মেটেনি মুমিনুলের। দ্বিতীয় ইনিংসে ১০৫ রানের ইনিংস উপহার দিয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুলতেই পারেন।

মুমিনুলের তিন অঙ্ক ছোঁয়ার দৃশ্য আত্মবিশ্বাস দেয় লিটনকে। ৯৩ বলে ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় হাফ সেঞ্চুরি তুলে ইনিংসটিকে বড় করতে থাকেন ডানহাতি এ ব্যাটসম্যান। আজ ব্যাটিংয়ে ছিল না কোনো জড়তা।  স্পিনের বিরুদ্ধে ছিলেন সাবলীল, ডিফেন্স ছিল আকর্ষণীয়। চোখ জুড়ানো সব সুইপ, ড্রাইভে মন্ত্রমুগ্ধ করেন সবাইকে। পেসাররা তার কাছে পাত্তাও পাননি।

কিন্তু ঠিক নার্ভাস নাইন্টিসে গিয়ে হঠাৎ খেই হারিয়ে বসেন লিটন। অভিজ্ঞ স্পিনার হেরাথকে বাউন্ডারি মেরে সেঞ্চুরিতে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু টার্নের বিপরীতে এগিয়ে এসে বড় শট খেলতে গিয়ে মিড অফে ক্যাচ দেন ৯৪ রানে! আর মাত্র ৬টি রান করতে পারলে ক্যারিয়ারের প্রথম আন্তর্জাতিক সেঞ্চুরির স্বাদ পেতেন লিটন। পাশাপাশি টেস্টে বাংলাদেশের হাফ সেঞ্চুরিও পূর্ণ হতো। কিন্তু তার আউটে বাংলাদেশের সেঞ্চুরি ৪৯ নট আউট।

লিটন আউট হওয়ার পর উইকেটে থিতু হয়ে সময় কাটিয়েছেন মাহমুদউল্লাহ ও মোসাদ্দেক। দুজনের রক্ষণাত্মক ও দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ে চান্দিমালও বুঝছিলেন আজ আর ম্যাচের ফল বের হচ্ছে না। তাই মাঠে থাকা মাহমুদউল্লাহর সাথে কথা বলে ড্র মেনে নেন খেলা শেষ হওয়ার ১৭ ওভার আগে। প্রথম ইনিংসে ৮৩ রানে অপরাজিত থাকা মাহমুদউল্লাহ দ্বিতীয় ইনিংসে করেছেন ২৮ রান। মোসাদ্দেক হোসেন সৈকতের ব্যাট থেকে আসে ৮ রান।

দুই দলের মুখোমুখি লড়াইয়ের আগের টেস্টেই ছিলেন না মুমিনুল হক ও মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। সেটাও শ্রীলঙ্কার বর্তমান কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহের ইচ্ছাতেই। কি মধুর প্রতিশোধ নিলেন মাহমুদউল্লাহ-মুমিনুল! এক টেস্টে বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ ২৮১ রান করে ম্যাচসেরা মুমিনুল। শুধু ম্যাচসেরা হননি। শ্রীলঙ্কার জয় আটকে বাংলাদেশের ম্যাচ বাঁচিয়ে দিয়েছেন। আর মাহমুদউল্লাহর অধিনায়কত্ব তো কুড়াচ্ছে প্রশংসা।

তারা দুজনই ফিরলেন। বার্তা দিলেন, এভাবেও ফিরে আসা যায়।