জাতীয় পার্টি বিরোধী দল হিসেবে এখনো ইমেজ সংকটে

প্রকাশিত

বিশেষ প্রতিবেদকঃ সোমবার বর্তমান সংসদের মেয়াদ চার বছর পেরিয়ে পাঁচ বছরে যাত্রা শুরু করেছে। চার বছর বেরিয়ে পাঁচ বছরে পদার্পন করলেও দশম জাতীয় সংসদে প্রথম বারের মতো বিরোধী দলের আসনে বসা জাতীয় পার্টি এখনো বিরোধী দল হিসিবে জনগণের আস্থা অর্জনে পুরোপুরি ব্যার্থ হয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন দেশের জনগণ জাতীয় পার্টিকে যতটা না বিরোধী দল হিসেবে স্বীকৃতি দিতে ইচ্ছুক তার চেয়ে বেশি ইচ্ছুক সরকারি দল হিসেবে স্বীকৃতি দিতে।
শুধু বিশ্লেষক নয়, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ থেকে শুরু করে দলের তৃণমূলের নেতারাও বিভিন্ন সভা-সমাবেশে বিরোধী দল হিসেবে জাতীয় পার্টি জনগণের আস্থা অর্জন করতে না পারার কথা তুলে ধরেছেন।
তবে দশম জাতীয় সংসদের চার বছরপূর্তি উপলক্ষে গত রোববার এক সংবাদ সম্মেলনে বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ দাবি করেছেন, জাতীয় পার্টি সংসদে ও সংসদের বাইরে কার্যকর বিরোধী দল হিসেবে ভূমিকা রেখেছে। সংসদ বর্জনের অপসংস্কৃতি পাল্টে দিয়েছেন তারা জনগণের স্বার্থে জাতীয় সংসদে তারা সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। তিনি বলেন, আমরা সুস্থধারার রাজনীতি ও দেশের স্থিতিশীলতায় বিশ্বাসী। কোনো ক্ষেত্রে সরকার যখন লাইনচ্যুত হয় বিরোধী দল তখন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। সরকার দূরদর্শী বলে এ থেকে শিক্ষা নিয়ে সঠিক পথে চলার চেষ্টা করে। আর এ জন্যই বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান সম্প্রতি বলেন, ‘এটা সাজানো বিরোধী দল। তাদের কাজ আর কী হবে? সরকারই তাদের চালায়। যা করে তা সরকারের সাজানো। এতে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই।’
বিরোধী দল হিসেবে আস্থা অর্জন করতে না পারার কারণ হিসেবে নেতাকর্মীরা জানান, দলের চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হিসেবে মন্ত্রীর মর্যাদা ভোগ করছেন। পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ সরকারের বন ও পবিশে সম্পদমন্ত্রী। প্রেসিডিয়াম সদস্য মুজিবুল হক চুন্নু শম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী, মশিউর রহমান রাঙ্গা পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী। ৬ জন সংরক্ষিত নারী সদস্যসহ ৪০ জন এমপি সংসদে প্রতিনিধিত্ব করছেন। মূল আসনের ৩৪ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে ২১ জনই বিনাভোটে নির্বাচিত।
তারা বলেন, গত ২২ জানুয়ারি দলের এক যৌথসভায় এইচ এম এরশাদ বলেছেন, ‘দেশ-বিদেশের মানুষ এখনো জাপা সংসদের গৃহপালিত বিরোধী দল মনে করে। ঘটনা ঘটে গেছে। কিছু করা যাবে না। আমার খারাপ লাগে।’ এর আগে জাতীয় পার্টির ৩০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে দলের চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বলেছেন, ‘জনগণ জাতীয় পার্টিকে বিরোধী দল মনে করে না। আমি প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত। সরকারে আমাদের মন্ত্রিত্ব রয়েছে। দেশের জনগণ আমাদের প্রধান বিরোধী দল মনে করে না।’ তিনি জাতীয় পার্টি যেন প্রকৃত বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করে, সে জন্য সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদের প্রতি আবেদন জানান। রওশনকে উদ্দেশ্য করে এরশাদ বলেন, ‘আপনার কাছে আবেদন, জাতীয় পার্টি যেন প্রকৃত বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করে।’
জানা যায়, বিএনপি বিহীন সংসদে জাপা প্রধান বিরোধী দল হলেও সরকারের প্রতি আকুণ্ঠ সমর্থন ছিল এই দলটির। বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারের প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিল। সংসদের বাইরে গত ৪ বছরে দুই-একটি কর্মসূচি ছাড়া সরকারের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে দলটিকে তেমন কর্মসূচি পালন করতে দেখা যায়নি। তবে পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ জাতীয় পার্টির বিভিন্ন সভা-সমাবেশে সরকারের কঠোর সমালোচনা করেছেন। মন্ত্রিসভায় যুক্ত হওয়ার সময় বার বার বলেছিল, তারা সরকারের অংশ হলেও ‘গঠনমূলক’ সমালোচনায় কোনো ছাড় দেবে না। তবে, গত চার বছরে হাতেগোনা দুই-একটি ইস্যু ছাড়া বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নিশ্চুপ থাকতে দেখা গেছে। সেই তুলনায় সরকারের জনবিরোধী বিভিন্ন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সরকারি দলের সদস্য ও মন্ত্রিসভার সদস্যদেরই সোচ্চার হতে দেখা গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পার্টির এক প্রেসিডিয়াম বলেন, জাতীয় পার্টি আইনগত এবং বাহ্যিক কোনোভাবেই বিরোধী দল নয়। জাতীয় পার্টির অধিকাংশ সংসদ সদস্য আওয়ামী লীগের দ্বারা নির্বাচিত। জাতীয় পার্টির পক্ষে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন সম্ভব নয়। বিরোধী দল হিসেবে জাতীয় পার্টি সংসদের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সাংঘর্ষিক। তিনি বলেন, জাতীয় পার্টি চার বছরে একটিও ‘না ভোট’ দেয়নি। মাত্র চারবার ওয়াক আউট করেছে। তাই বিরোধী দল হিসেবে জাতীয় পার্টি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।