টেকনাফে ইয়াবাবিরোধী অভিযানে বাড়ি ভাঙার পেছনে পুলিশ

প্রকাশিত

বিশেষ প্রতিবেদকঃ গত ৪ মে দেশব্যাপী মাদকবিরোধী অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে বিশেষ নজরদারি রাখা হয় টেকনাফে। অভিযান শুরুর সঙ্গে সঙ্গে পালাতে শুরু করে ইয়াবার কারবারিরা। তাদের ওপর মনস্তাত্তি¡ক চাপ তৈরির লক্ষ্যে ইয়াবা বাণিজ্যের টাকায় গড়ে তোলা তাদের অট্টালিকা গুঁড়িয়ে দেয়ার কার্যক্রম হাতে নেয় পুলিশ বাহিনী। পাশাপাশি একের পর এক অভিযানে নিহত হয় ৩৯ জন ইয়াবা ব্যবসায়ী। এরপরই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে ৬৩ জন ইয়াবা কারবারি; এখনো পলাতক রয়েছে অনেকে। বাড়ি ভাঙা কার্যক্রমের আওতায় মূলত তাদেরই অট্টালিকা গুঁড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। যদিও পুলিশের পক্ষ থেকে খোলাখুলি বাড়ি ভাঙার বিষয়টি স্বীকার করা হচ্ছে না। তবে অট্টালিকায় থাকা ইয়াবা-কারবারিদের স্বজনরা জানান, পূর্ব ঘোষণা দিয়ে পুলিশই ভাঙছে বাড়িগুলো। পুলিশের পক্ষ থেকে আগেই খবর আসে এই বাড়ি ভাঙা হবে। তখন তারা পালিয়ে যান। এরপর রাতের আঁধারে বাড়ির আঙ্গিনা ভাঙার পর আবার ফিরে আসেন। ফলে সারাক্ষণ আতঙ্কে দিন কাটাতে হয় স্বজনদের। অনেক সময় বাড়ি ভাঙার ভয় দেখিয়ে চাঁদা দাবির অভিযোগও পাওয়া গেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। তবে এ বিষয়ে কেউ ভয়ে কথা বলতে রাজি হননি। এদিকে ইতোমধ্যে অর্ধশত বাড়ি ভাঙা হয়েছে। কৌশলগত কারণে আরো অর্ধশত বাড়ি ভাঙা হতে পারে বলে পুলিশের একটি সূত্র জানায়।
অন্যদিকে পুলিশের অপর একটি সূত্র জানায়, ইয়াবা ব্যবসায়ীরা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে গেছে। তাদের মনস্তাত্ত্বিকভাবে দুর্বল করার জন্যই ভেঙে দেয়া হচ্ছে বাড়িগুলো। এটাকে পুলিশ কৌশল হিসেবে নিয়েছে, যাতে আর কোনো লোক নতুন করে ইয়াবা ব্যবসায় নাম না লেখায়। তবে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের বেশ কয়েকজন স্বজন ভোরের কাগজের কাছে অভিযোগ করেন, প্রায় প্রতিদিনই একটি বা দুটি করে বাড়ি টার্গেট করে পুলিশ। পরে মোটা অঙ্কের টাকা দিতে রাজি হলে তাদের বাড়ি আর ভাঙা হয় না। কিন্তু ইয়াবার টাকার বাড়ি, না অনেক পুরনো বাড়ি এমন কথা বললেই রাতে লোকজন নিয়ে বাড়ি ভাঙা শুরু করে। তবে ইতোমধ্যে যে বাড়িগুলো ভাঙা হয়েছে সেগুলোর অনেকটি ইয়াবার টাকায় গড়ে ওঠা সাম্রাজ্য বলে জানিয়েছে স্থানীয়রা। প্রাপ্ত তথ্য মতে, ইয়াবার গডফাদারসহ এই তালিকায় নাম থাকা প্রায় অর্ধশত ব্যবসায়ীর বাড়ি ভেঙে দিয়েছে পুলিশ। সর্বশেষ গত রবিবার রাতে টেকনাফ পৌরসভার জালিয়াপাড়া এলাকার ৩টি ইয়াবা বাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটে। বাড়ি ৩টির মধ্যে দুটির মালিক সালমান ও অপরটির মালিক জিকু। বাড়ি ভাঙার বিষয়ে জানতে চাইলে টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ভোরের কাগজকে বলেন, কে বা কারা বাড়িগুলো ভাঙছে সেগুলো আমরা জানি না। আমার মনে হয়, যারা ইয়াবা পছন্দ করে না তারাই এই কাজগুলো করছে। তবে বাড়ি ভাঙার বিষয়ে এখনো কেউ কোনো অভিযোগ করেননি বলে জানান তিনি।
অভিযুক্ত ইয়াবা ব্যবসায়ীদের স্বজনরা বলেন, অভিযুক্ত গ্রেপ্তারের পর যদি প্রমাণ হয় এই বাড়ি ইয়াবার টাকায় করা হয়েছে তাহলে ভেঙে দেয়া হোক। কিন্তু পুলিশ কোনো কথার কর্ণপাত না করে বাড়ি ভেঙেই চলেছে। ইয়াবা ব্যবসা শুরু হওয়ার আগে তৈরি করা বাড়িও ভাঙার অভিযোগ পাওয়া গেছে। আবার টেকনাফের বাইরে কক্সবাজার শহর ও চট্টগ্রাম শহরে যে অট্টালিকা গড়ে উঠেছে ইয়াবার টাকায় সেগুলো অক্ষত রয়েছে বলে জানা গেছে। স্থানীয়রা জানিয়েছে, বেশিরভাগ ইয়াবা ব্যবসায়ী টেকনাফে নয়, কক্সবাজার ও চট্টগ্রামে বাড়ি করেছেন। তাদের বাড়িও ভাঙা প্রয়োজন। পাশাপাশি এখনো যারা ইয়াবা ব্যবসা করছেন তাদের প্রতি আরো নজরদারি বাড়ানো উচিত।
গত বুধবার সরেজমিন টেকনাফের নাজিরপাড়া গ্রামের অন্যতম তালিকাভুক্ত ইয়াবা ব্যবসায়ী সৈয়দ হোসেনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বিশাল দৃষ্টিনন্দন অট্টালিকার প্রধান ফটক ও চারপাশের দেয়াল গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে। বাড়ির কলাপসিপল গেট ও জানালার গ্লাস এবং বাড়ির সামনের কিছু অংশ ভাঙা। বাড়িটির মধ্যে পাওয়া গেল হোসেনের স্ত্রী, ছেলে ও মা ফিরোজা খাতুনকে। ফিরোজা খাতুন ভোরের কাগজকে বলেন, তার ৬ ছেলে, সৈয়দ হোসেন, জামাল হোসেন, সৈয়দ আলী, আছাদ হোসেন, নূর হোসেন ও জাহিদ হোসেন। এক সময় এরা ৬ জনই দুবাই থাকত। সেই টাকা দিয়ে এই বাড়ি বানানো হয়েছে। ২ বছর আগে সৈয়দ হোসেন ও জামাল হোসেনসহ ৪ ভাই দেশে এসে রাজনীতিতে নাম লেখায়। এর পরই ইয়াবার তালিকায় তাদের নাম আসে। কিন্তু তারপরও বাড়িটি ভেঙে দেয় পুলিশ।
ভাঙার সময় আপনারা কোথায় ছিলেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, থানা থেকে প্রথমে জানানো হয় বাড়ি ভাঙা হবে। কেউ থাকলে ক্রসফায়ারে পড়বি। পরে আমরা ভয়ে পালিয়ে যাওয়ার পর রাত ৮টার দিকে টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশের উপস্থিতিতে বাড়ি ভাঙে ৩০-৪০ জনের একটি দল। বুলডোজার দিয়ে গেট ভেঙে ভেতরে ভাঙচুর করা হয়। পরে পুলিশ চলে গেলে আমরা বাড়ি ফিরে আসি। শিলখালী বানিয়াপাড়া গ্রামের তালিকাভুক্ত ইয়াবা ব্যবসায়ী সাইফুলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় দেয়াল ভাঙা। তবে পুরো বাড়ি অক্ষত। ভেতরে ঢুকতেই দেখা যায়, বাড়ির সামনে পার্ক করা একটি প্রাডো গাড়ির পাশে সাইফুলের বৃদ্ধ বাবা ড. মোলভী মো. হানিফ বসে আছেন। তিনি জানান, পাকিস্তান আমল থেকেই আমার বাড়ির অবস্থা এ রকম। সম্প্রতি ৩ তলার কাজ শুরু করেছি। থানার ওসি আমাকে ফোন দিয়ে বাড়ি ভাঙার কথা বলে। আমি ওসিকে বলি এটা আমার বাড়ি। সাইফুল চট্টগ্রাম শহরে বাড়ি বানিয়েছে। এখানে থাকে না। ভাঙতে হলে তার বাড়ি ভাঙেন। তারপরও লোকজন নিয়ে এসে বাড়ির দেয়াল ভেঙে দিয়েছে। আল্লাহর অশেষ রহমত আমাদের কোনো ক্ষতি হয়নি। সাইফুল কোথায় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ২ বছর ধরে দুবাই আছে। তার অভিযোগ, এলাকার সবাই জানে আমাদের আর্থিক অবস্থা ভালো। তারপরও কেন বাড়ি ভাঙা হলো। যদি কেউ প্রমাণ করতে পারে এটি ইয়াবার টাকার বাড়ি তাহলে পুলিশ পুরো বাড়িই ভেঙে দিক। আমাদের কোনো আপত্তি নেই। মুণ্ডাবিল এলাকার শাকির মাঝির বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পুরো বাড়িই গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে। ওই বাড়ির পাশের বাড়িও ফাঁকা। বাড়িটির সামনে ক্ষেতে কাজ করা এক কৃষক জানান, ১৫-২০ দিন আগে পুলিশ লোকজন নিয়ে এসে বাড়িটি ভেঙে দেয়। সে সময় বাড়িতে কেউ ছিল না। পুলিশ তাদের বলে, পুলিশ বাড়ি ভেঙেছে এ কথা কাউকে বললে দেখে নেব।
দেশের সীমান্তবর্তী উপজেলা টেকনাফ। এক সময় এই এলাকার মানুষের দৈন্যদশা ছিল। মাছ ও লবণ চাষই ছিল জীবিকা প্রবাহের অন্যতম মাধ্যম। এই থেকে যা আয় হতো তা দিয়েই চলত জীবন সংসার। কিন্তু হঠাৎ করে তাদের কাছে আলাউদ্দিনের চেরাগের মতো ধরা দেয় মরণ নেশা ইয়াবা। কারণ মিয়ানমার থেকে ইয়াবা প্রবেশের একমাত্র রুট এই টেকনাফ। রাতারাতি ধনী হওয়ার আশায় টেকনাফের প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষই যোগ দেয় ইয়াবা ব্যবসায়। আশা বিফলে যায়নি। ইয়াবার ছোঁয়ায় রাতারাতিই কোটিপতি বনে যান অনেকে। পরিবর্তন আসে জীবন মানে। ফলে টেকনাফে গড়ে উঠতে থাকে দৃষ্টিনন্দন অট্টালিকা। কিন্তু এরই মধ্যে সারা দেশে সয়লাব হতে থাকে এই ঘাতক ট্যাবলেট। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ইয়াবার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তালিকা করা হয় ইয়াবা ব্যবসায়ীদের। যেখানে কক্সবাজার জেলার যে ১ হাজার ১৫১ জন ইয়াবা ব্যবসায়ীর নাম রয়েছে তার মধ্যে ৯ শতাধিক ব্যবসায়ী হচ্ছে টেকনাফের।