দুদকের সুপারিশে ২৫ সরকারি শিক্ষকের শাস্তিমূলক বদলি

প্রকাশিত

নিউজ ডেস্ক : কোচিং বাণিজ্যের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকার দায়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সুপারিশকৃত রাজধানীর সরকারি চার মাধ্যমিক স্কুলের ২৫ জন শিক্ষককে শেষ পর্যন্ত শাস্তিমূলক বদলি করেছে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর।

মন্ত্রণালয়ে দুদকের সুপারিশ পাঠানোর প্রায় দেড় মাস পর অধিদপ্তর থেকে ওই বদলি করা হয়েছে। বদলি আদেশে তাদেরকে আগামী ১ ফেব্রুয়ারির মধ্যে বিমুক্ত হওয়ার জন্য বলা হয়েছে। অন্যথায় ঐ তারিখের অপরাহ্নে তাৎক্ষণিক বিমুক্ত বলে গণ্য হবেন।

সোমবার অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রফেসর মো. মাহাবুবুর রহমানের সই করা আদেশ সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। অন্যদিকে দুদকের সুপারিশ বাস্তবায়নের এমন পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানিয়েছেন দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ।

তিনি বলেন, ‘দুদকের সুপারিশ আমলে নিয়ে শিক্ষা অধিদপ্তরের এমন সিদ্ধান্তকে কমিশন সাধুবাদ জানায়।’

বদলির ওই আদেশে মতিঝিল সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের ১২ জন, মতিঝিল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ৪ জন, গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাইস্কুলের ৮ জন ও খিলগাঁও সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষককে ঢাকার বাইরে বিভিন্ন স্কুলে বদলি করা হয়েছে।

আদেশে তাদেরকে বগুড়া, শরীয়তপুর, গোপালগঞ্জ, নেত্রকোনা, ফরিদপুর, গাইবান্ধা, সাতক্ষীরা, চাপাইনবাবগঞ্জ, মেহেরপুর, মুন্সীগঞ্জ, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, জামালপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, হবিগঞ্জ, পিরোজপুর, বরগুনা ও জয়পুরহাটে সরকারি স্কুলের শূন্য পদে বদলি করা হয়েছে।

বদলিকৃত সরকারি চার স্কুলের শিক্ষকরা হলেন

মতিঝিল সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় : প্রভাতী  শাখার সহকারী শিক্ষক আবুল হোসেন মিয়া (ভৌতবিজ্ঞান), মো. মোখতার আলম (ইংরেজি), মো. মাইনুল হাসান ভূঁইয়া (গণিত), মুহাম্মদ বেলায়েত হোসেন (গণিত), মুহাম্মদ আফজালুর রহমান (ইংরেজি), মো. ইমরান আলী (ইংরেজি), দিবা শাখার সহকারী শিক্ষক মোহাম্মদ কবীর চৌধুরী, এ বি এম ছাইফুদ্দীন ইয়াহ, মো. মিজানুর রহমান, মো. আবুল কালাম আজাদ, মো. জহিরুল ইসলাম ও সহকারী শিক্ষক মো. জামাল উদ্দিন বেপারী।

মতিঝিল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় : প্রভাতী শাখার সহকারী শিক্ষিক নূরুন্নাহার সিদ্দিকা (সামাজিক বিজ্ঞান), দিবা শাখার সহকারী শিক্ষক শাহ মো. সাইফুর রহমান (গণিত), মো. শাহ আলম (ইংরেজি), মোসা. নাছিমা আক্তার (ভূগোল)।

গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাইস্কুল : মো. শাহজাহান সিরাজ (গণিত), মোহাম্মদ ইসলাম (গণিত), জাকির হোসেন (গণিত), মো. শাহজাহান (গণিত), মো. আবদুল ওয়াদুদ খান (সামাজিক বিজ্ঞান), মো. আলতাফ হোসেন খান (ইংরেজি), মো. আযাদ রহমান (ইংরেজি) ও রণজিৎ কুমার শীল (গণিত) এবং খিলগাঁও সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. নাছির উদ্দিন চৌধুরী।

এর আগে ২০১৭ সালের ৩ ডিসেম্বর কোচিং বাণিজ্যের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত রাজধানীর আট নামিদামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৯৭ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক চূড়ান্ত সুপারিশ মন্ত্রিপরিষদে পাঠিয়েছিল দুদক।

চিঠির প্রথম দুই সুপারিশে এমপিওভুক্ত চারটি বিদ্যালয় ও চারটি সরকারি বিদ্যালয়ের ৯৭ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য বন্ধ নীতিমালা, ২০১২ অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বলা হয়েছিল।

এর মধ্যে এমপিওভুক্ত চারটি বিদ্যালয়ের ৭২ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে নীতিমালা অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কমিটি সভাপতি ও পরিচালনা পর্ষদকে এবং সরকারি বিদ্যালয়ের ২৫ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে নীতিমালা ও সরকারি কর্মচারী বিধিমালা, ১৯৮৫ অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়েছিল।

কমিশনের সুপারিশে আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের মতিঝিল শাখার ৩২ জন ও বনশ্রী শাখার চারজনসহ মোট ৩৬ জন, মতিঝিল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ২৪ জন, ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের সাতজন, রাজউক উত্তরা মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের পাঁচজন, মতিঝিল সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের ১২ জন, মতিঝিল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের চারজন, খিলগাঁও সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের একজন ও গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাইস্কুলের আটজন শিক্ষকসহ ৯৭ জনের তালিকা দেওয়া হয়েছিল।

শাস্তির বিষয়ে চিঠিতে আরো বলা হয়েছিল, কোচিং বাণিজ্য রোধে এর সঙ্গে জড়িত শিক্ষকদেরকে সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী এক বিদ্যালয় হতে অন্য বিদ্যালয়ে, এক শাখা হতে অন্য শাখায়, দিবা শিফট হতে প্রভাতী শিফটে বা প্রভাতী শিফট হতে দিবা শিফটে নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর বদলির জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করা যেতে পারে। যারা একইসঙ্গে দীর্ঘদিন একই প্রতিষ্ঠানে বহাল থেকে কোচিং বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত থেকে অনৈতিকভাবে অর্থ উপার্জন করেছেন তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। কারণ, এ জাতীয় আয়ে কোনো প্রকার ভ্যাট বা কর দেওয়া হয় না। ফলে এভাবে উপার্জিত আয় অনুপার্জিত আয়ে পরিণত হয়, যা সংবিধানের ২০(২) অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন। যেখানে বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্র এমন অবস্থা সৃষ্টির চেষ্টা করিবেন, যেখানে সাধারণ নীতি হিসাবে কোনো ব্যক্তি অনুপার্জিত আয় ভোগ করিতে সমর্থ হইবেন না।’ এছাড়া কোচিং বন্ধে আইন প্রণয়নের কথা বলা হয়েছে সুপারিশে। এর আগে অনুসন্ধান পর্যায়ে দুদক টিম বেশ কয়েকবার রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কোচিং সেন্টারে অভিযান পরিচালনা করে।

এ বিষয়ে দুদক সচিব ড. শামসুল আরেফিন  বলেন, ‘দুদকের ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয় থেকে অনুসন্ধান প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর কমিশন তা যাচাই-বাছাই শেষে সুপারিশ চূড়ান্ত করেছে।’

২০১২ সালের ২০ জুন কোচিং বাণিজ্য বন্ধ করতে নীতিমালা তৈরি করে প্রজ্ঞাপন জারি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। নীতিমালায় নিজ নিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কোচিং অথবা প্রাইভেট পড়াতে নিষেধ করা হয়েছে। তবে কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে অন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ ১০ জন ছাত্রছাত্রীকে নিজ বাসায় পড়ানোর সুযোগ রয়েছে। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান প্রধানকে লিখিতভাবে ছাত্র-ছাত্রীর নাম ও রোল নম্বরসহ তালিকা জানাতে হবে। শুধু তাই নয়, সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা ওই ১০ শিক্ষার্থীর মধ্যে নিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একজনকে পড়ালেও তাকে অভিযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হবে। কোচিং সেন্টারের নামে বাসা ভাড়া নেওয়ার ক্ষেত্রে বিধি-নিষেধের কথা বলা হয়েছে। এমনকি কোনো শিক্ষক বাণিজ্যিকভাবে গড়ে ওঠা কোচিং প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত হতে পারবেন না।

শাস্তির বিষয়ে নীতিমালায় বলা হয়েছে, সরকারি বা এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক কোচিং বাণিজ্যে জড়িত থাকলে সাময়িক বা চূড়ান্ত বরখাস্ত, এমপিওভুক্ত শিক্ষক হলে এমপিও স্থাগিত, বাতিল, বেতন-ভাতাদি স্থগিত, বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি স্থগিত, বেতন এক ধাপ অবনমিতকরণ ইত্যাদি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।