দেশের অর্থনীতিতে পোশাক শিল্প

প্রকাশিত
শাহ মো. জিয়াউদ্দিন : বাংলাদেশের অর্থনীতির যে চমকপ্রদ উত্থানটি আজ ঘটেছে তার মূল চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করছে পোশাক শিল্প। আশি দশকের শেষ ভাগে বাংলাদেশে প্রসার ঘটে পোশাক শিল্পের। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার আয়ের বড় একটি অংশ আসে পোশাক রফতানির মাধ্যমে। বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাকের প্রথম চালানটি রফতানি হয় ১৯৭৮ সালে। এই চালানটিতে ছিল শুধুমাত্র ওভেন শার্ট। এরপর পরই বিদেশি ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের পোশাকের কদর বাড়তে থাকে আর রফতানির চাহিদা বেড়ে যায়।
বাংলাদেশে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত কাঁচা পাট ও পাটজাত দ্রব্য মোট রফতানির ৫০ শতাংশ ছিল। যা সেই সময়ের সব পণ্য রফতানির শীর্ষে ছিল পাটের অবদান। তবে আশির দশকের শেষার্ধে পোশাক শিল্পের রফতানির গতি বৃদ্ধি পায়। এবং পোশাক শিল্প রফতানি খাতের শীর্ষে চলে আসে। ১৯৯৯ সালে এই শিল্পের ব্যাপক উত্থান ঘটে। ঐ সময় পোশাক শিল্প খাতে সরাসরি কর্মসংস্থান হয় ১.৪ মিলিয়ন বেশি মানুষের। এই কর্মজীবী শ্রম শক্তির ৮০ শতাংশই নারী। ২০১৫-১৬ অর্থ সছরের রফতানি পণ্যগুলোর মধ্যে তুলনা করলে দেখা যায়, তৈরি পোশাক থেকে আয় হয়েছে সর্বাধিক। এই অর্থ বছরে পোশাক শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধির পরিমাণ ছিল ১০.১৪ শতাংশ। একটি পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ২০১১-১২ অর্থবছর থেকে দেশের পণ্য রফতানির আয় ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। ২০১১-১২ অর্থবছরে মোট রফতানি আয় ছিল প্রায় ২ হাজার ৪২৯ কোটি ডলার। ২০১২-১৩ অর্থ বছরে এই আয় বৃদ্ধি পেয়ে তা হয় ২ হাজার ৭০৩ কোটি ডলার, ২০১৩-২০১৪ অর্থবছরে তা আরও বৃদ্ধি পেয়ে হয় ৩ হাজার ১২১ কোটি ডলার, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে সব রেকর্ড ভেঙে তা বৃদ্ধি পায় ৩ হাজার ৪২৪ কোটি ডলার। এই রফতানি আয়ের বড় যোগানদার পোশাক শিল্প। পোশাক শিল্পকে ঘিরে তৈরি হয়েছে কিছু নতুন নতুন ব্যবসা বাণিজ্য । যেমন পোশাক শিল্পের জন্য গড়ে উঠেছে বন্ত্র, সুতা, প্যাকেটজাত করণের উপকরণ এতদ জাতীয় শিল্প এর পাশাপাশি বিকাশ ঘটেছে পরিবহন, ব্যাংকিং, শিপিং এবং ইন্স্যুরেন্সের মতো আর্থিক খাতের। পোশাক শিল্পের বাইরে এই জাতীয় খাতগুলোতে পরোক্ষভাবে প্রায় দুই লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করেছে পোশাক শিল্পকে অবলম্বন করে গড়ে উঠা শিল্পগুলোতে।
পোশাক শিল্প এবং বাংলাদেশের জনসংখ্যা পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। তাছাড়া কৃষি পণ্যর দাম কম থাকায় জীবনযাত্রার ব্যয়ভার কম তাই পারিশ্রমিক কম দিলেও শ্রমিক পাওয়া যায়। বিশ্ব বাজারে বাংলাদেশ পোশাক শিল্পে স্থান করে নিতে চীন, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ভারত, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া এবং মিয়ানমারের সহিত প্রতিযোগিতা করে আসছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উল্লেখ্য করার মতো সুবিধা হলো শ্রম সম্পদের সহজ প্রাপ্যতা। শ্রমশক্তির সহজ প্রাপ্যতার মূল কারণ হচ্ছে এদেশের জনসংখ্যার ঘনবসতি। উল্লেখিত দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশে প্রতি বর্গ কিমি. জনবসতি হলো, প্রায় ৯৬৪ অপরদিকে চীনে ১৪১, ভিয়েতনামে ২৫৯, কম্বোডিয়ায় ৮২ ভারতে ৩৮২ পাকিস্তানে ২৩০ ইন্দোনেশিয়ায় ১২১ মিয়ানমারে ৭৪ জন মানুষ বাস করে। তাছাড়া একটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়। ২০১১ সালের ঙ জড়ঁত্শব ত্ড়েঁঢ় ঢ়ধত্ঃহবত্ং পরামর্শক প্রতিষ্ঠান দক্ষিণ আমেরিকার চারটি দেশের এবং এশিয়ার চারটি দেশের পোশাক শিল্প শ্রমিকদের প্রতি ঘণ্টার মজুরীর একটি হিসাব প্রকাশ করেছেন। তাতে দেখা যায়, দক্ষিণ আমেরিকার হাইতি প্রতি ঘণ্টায় শ্রমিকের মজুরী ০.৮৬ মাকিন ডলার, নিকারাগুয়ার ১.০৫ মাকির্ন ডলার, হুণ্ডুরাসের ১.৬৮ মার্কিন ডলার, এবং মেক্সিকোর ২.০৬ মার্কিন ডলারভ এশিয়ার চারটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের ০.৪১ মার্কিন ডলার, ভিয়েতনামের ০.৫১ মার্কিন ডলার, জীন আন্তদেশ ০.৮৯ মার্কিন ডলার, চীন কোস্ট ১.১৮ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের শ্রমিকের মজুরী অনেক কম। এতে প্রতীয়মান হয় যে, বাংলাদেশ পোশাক শিল্পে বিশ্ব বাজারে প্রতিযোগিতায় একটি স্থান করে নিতে পারবে।
১৯৮২ সালে বাংলাদেশে মোট পোশাক কারখানা ছিল ৪৭টি মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে ১৯৮৯ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৮৭টিতে। আর ১৯৯৯ সালে সেই সংখ্যা দাঁড়ায় ২৯০০টিতে। এই ধারাবাহিক বৃদ্ধিতে প্রমাণ করা যায় যে পোশাক শিল্প ক্রমেই সাফল্যের দিকে ধাবিত হচ্ছে। বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই বিশ্ব পোশাক বাজারে রফতানিকারক দেশ হিসাবে ১২তম স্থান দখল করেছে। তাছাড়া যুক্তরাজ্যের বাজারে পোশাক রফতানিকারক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান ষষ্ঠ এবং ইউরোপের বাজারে টি-শার্ট রফতানিকারক দেশ হিসেবে পঞ্চম স্থানে রয়েছে। ১৯৯০ এর দশক থেকে পোশাক শিল্প কারখানার সম্প্রসারণ ঘটেছে বার্ষিক প্রায় ২২ শতাংশ হারে।
১৯৮৩-৮৪ সালে তৈরি পোশাক রফতানি করে দেশের আয় হতো মাত্র .০৯ বিলিয়ন ডলার, যা ছিল সেই সময়কার মোট রফতানি আয়ের শতকরা ৩.৮৯ ভাগ। কয়েক বছরের ব্যবধানে ১৯৯৮-৯৯ সালে তৈরি পোশাক রফতানি করে আয় হয় ৫.৫১ বিলিয়ন যা মোট রফতানি আয়ের ৭৫.৬৭ শতাংশ । বর্তমানে প্রায় ৮০ শতাংশ বৈদেশিক রফতানির আয়ের যোগানদার এই শিল্পটি। তবে পোশাক শিল্পকে ঘিরে একটি শুভঙ্করের খেলা আমরা দেখতে পাই। তা হলো এই শিল্পের আয়ের ৭০ ভাগ আবার এই শিল্পের কাঁচামাল ক্রয়ে আমদানিতে ব্যায় হয়ে যায় পরোক্ষভাবে বিদেশিদের পকেটে চলে যায়। পোশাক শিল্পের কাঁচামাল কাপড়, মেশিন, ও অন্যান্য আনুসাঙ্গিক উপকরণ আমদানি করতে হয়। এই শিল্পকে ঘিরে এর কাঁচামাল প্রস্ততকরণ শিল্প গড়ে উঠা এখন সময় সাপেক্ষ ব্যাপার।
ইপিবি এবং বিজিএমই এর গবেষণা সেলের তথ্য বিশ্লেষণ করলে করে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়, গত তিন বছরের নতুন বাজেটে রফতানি আয় দ্বিগুণ হারে বেড়েছে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরের নতুন বাহারের সম্মিলিত প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২১.১৫ শতাংশ। যা আগের অর্থবছরের ছিল মাত্র ১২.৭১ শতাংশ। আর ২০১১-১২ অর্থ বছরে এই প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৬.৫৬ শতাংশ। বর্তমানে বাংলাদেশের আর্ন্তজাতিক নতুন এবং পুরাতন বাজারে পোশাক রফতানি বেড়েছে। বিশেষ করে নতুন বাজারগুলোতে বাংলাদেশের রফতানি বেড়েছে। সমাপ্ত অর্থবছরের নতুন বাজার থেকে রফতানি আয়ের প্রবৃদ্ধি বেড়েছে প্রায় দ্ধিগুণ। যেমন ২০১২-১৩ অর্থবছরে এসব বাজারের প্রবৃদ্ধি ছিল ১২.৭১ শতাংশ যা ২০১৩-১৪ অর্থবছরে বেড়ে হয়েছে ২১.১৫ শতাংশ।
আশির দশকে দিকে পোশাক শিল্পের রফতানি আয়ে তেমন একটা অবদান ছিল না বর্তমানে মোট রফতানি আয়ের ক্ষেত্রে। বর্তমানে দেশের মোট রফতানি আয়ের ৭৫ শতাংশ এখন বাংলাদেশের পোশাক রফতানিকারকদের দখলে। অসংখ্য বায়িং হাউস গার্মেন্ট সামগ্রী ক্রয়-বিক্রয়ে নিয়োজিত আছে। বাংলাদেশের অদক্ষ শ্রমিক যারা কাজ পেত না তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিয়েছে এই পোশাক শিল্প। দেশের প্রায় ৪০ লাখ শ্রমশক্তি এই শিল্পে নিয়োজিত। পোশাক শিল্পের মোট শ্রমিকদের মধ্যে ৮০ শতাংশই নারী। বাংলাদেশ মূলত একটি কৃষি প্রধান দেশ। এই দেশটির অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি ছিল কৃষক এবং কৃষি সম্পদ। বর্তমানে জিডিপিতে কৃষির অবদান প্রত্যক্ষভাবে কমছে তবে পরোক্ষভাবে কৃষি উত্পাদনের কারণে খাদ্যপণ্য মূল্য কম হওয়ায় সস্তা মজুরীতে শ্রমিক পাওয়া যায় বাংলাদেশে। আর এই ব্যবস্থাকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে পোশাকসহ নানা শিল্প। বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের বিকাশের ফলে সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য ক্ষুদ্র উদ্যোক্ততা। এই শিল্পের কারণে বাংলাদেশে ষ্পিনিং, উইভ, সিটিং, ডাই ফিনিশিং এবং প্রিন্টিং শিল্পের বিকাশ ঘটছে।
পোশাক শিল্পের কাঁচামালের যোগানদার হিসেবে গড়ে উঠেছে বহু বস্ত্র কারখানা। এই শিল্পের কারণে নিম্ন আয়ের মানুষের কিছুটা ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে আর এই ক্রয় ক্ষমতার যোগানদার পণ্য সরবরাহ করতে গিয়ে তৈরি হয়েছে ছোট ছোট কিছু শিল্প।
বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে সবচেয়ে বড় অবদান তাদের যারা এদেশের কৃষি খাতের উদ্ধৃত্ত শ্রম শক্তি। এরা দক্ষ না কথা ঠিক তবে দেশের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তির চাবিটি তাদের হাতে। কিন্তু অতীব দুঃখের বিষয় নানাভাবে পোশাক শিল্পের প্রসার ঘটলেও এই শিল্পে নিয়োজিত শ্রমিকদের ভাগ্যের কোনো পরির্বতন ঘটেনি গত ৩০ বছরে। পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের অবস্থা এখনও াঁষহবত্ধনষব। যাদের শ্রম ঘামে এই বিকাশ তাদের ভাগ্য উন্নয়নে সরকারি বেসরকারি সংস্থাগুলোর ভূমিকা প্রায় সময়ই প্রশ্নবিদ্ধ ।
শ্রমিকদের ভাগ্য উন্নয়ন ব্যতিত কোনো শিল্পের বিকাশমান ধারা অব্যহত থাকে না। একটু পেছনে ফিরে তাকালে দেখা যায়, তাজরীন, স্পেক্ট্রাম, রানা প্লাজাসহ বেশ কিছু গামের্ন্ট দুর্ঘটনায় এই শিল্পের ইমেজ ক্ষুণ্ন হয়েছে মারাত্মকভাবে। এই কারণে সম্প্রসারিত পোশাকের আন্তর্জাতিক বাজার নানাভাবে বাধাগ্রস্থ হয়েছে। এই শিল্পে নিয়োজিত শ্রমিকদের ভবিতব্য তহবিল নাই বললেই চলে, একজন শ্রমিক জীবনের সায়াহ্নে এসে যখন আর শ্রম বিনিয়োগ করতে পারবে না তার তখন কি হবে তা সরকারের ভাবা উচিত। শ্রমিক নিরাপত্তা, শ্রমিকদের কল্যাণ তহবিল প্রদানসহ কিছু কল্যাণমুখী পদক্ষেপ নিলে এই শিল্পের বর্তমান বিকাশমান ধারার গতিকে আরও ত্বরান্বিত করা যায়। এ ধরনের পদক্ষেপের ফলে দেশের অর্থনীতিটা আরও মজুবুত হবে।

Be the first to write a comment.

Leave a Reply