দেশ মৃত্যুদণ্ডের আইনের পর ধর্ষণ বেড়ে তিন গুণ

প্রকাশিত

অনলাইন ডেস্ক-

রাজধানীর মুগদায় ১১ বছর বয়সের স্কুলছাত্রী যমজ দুই বোনকে মুখে গামছা গুঁজে ধর্ষণ করেন ফরহাদ নামের এক যুবক। অভিযুক্ত ফরহাদ ধর্ষণের শিকার ওই দুই ছাত্রীর মামাতো ভাই।

গত বুধবারের ওই ঘটনা পরে পারিবারিকভাবে ‘সমাধানের’ চেষ্টা করা হয়। শেষে রবিবার মামলা করেন মেয়েটির বাবা।

মুগদা থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) শেখ এনামুল করিম বলেন, ‘ধর্ষণ এত বড় অপরাধ। সাজা মৃত্যুদণ্ড। কিন্তু এসব ঘটনায় তা মনে হয় না। কেমন যেন ছেলেখেলা। আবার ঘটনা চেপে রেখে বলে মামলা করা যাবে কি না!’

গত ৩ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলায় ১২ বছরের এক কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগে প্রতিবেশী কামাল ব্যাপারীকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বন্দর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আবুল খায়ের বলেন, ‘ধর্ষণ বড় অপরাধ, মৃত্যুদণ্ড হতে পারে এমন কোনো ভয় কামালের মধ্যে আমি দেখিনি।’

প্রতিটি ঘটনায়ই দেখা যাচ্ছে এমন মনোভাব। সিলেট ও নোয়াখালীর ধর্ষণ-নিপীড়নের পর দেশব্যাপী ধর্ষণবিরোধী তীব্র বিক্ষোভ হলে সরকার গত মাসে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন সংশোধন করে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করেছে। কিন্তু এর প্রভাব অপরাধীদের মধ্যে পড়েছে বলে মনে হচ্ছে না। সাজা বাড়লেও কমেনি ধর্ষণ। নতুন সাজা কার্যকর হওয়ার পর গত ১৪ অক্টোবর থেকে ২৩ নভেম্বর পর্যন্ত এক মাস ১০ দিনে কালের কণ্ঠে ছাপানো প্রতিবেদন অনুযায়ী ১৯১ ঘটনায় নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ভুক্তভোগীদের ৪৬ জন দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এ সময় অর্ধশতাধিক নারী ও শিশু যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে। প্রতিদিনই ঘটছে এমন ঘটনা।

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৯ মাসে ৯৭৫ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছে, যেখানে দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনাই ২০৮টি।

সংস্থাটির তথ্য মতে, আইন কঠোর হওয়ার পরও বেড়েছে ধর্ষণ। সেপ্টেম্বরে ছিল এই সংখ্যা ৮৬, যা অক্টোবরে বেড়ে হয়েছে ৩৭৪। এই সংখ্যা আগের মাস আগস্টে ছিল ১৪৮। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় অক্টোবরে ৮৫টি ধর্ষণের ঘটনায় মামলা হয়। সেপ্টেম্বরে এই সংখ্যা ছিল ৬০।

মানবাধিকার ও অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, কঠোর আইন ধর্ষণ প্রতিরোধে সহায়ক হচ্ছে না। কারণ যারা এ অপরাধ করছে, তারা ধর্ষণকে অপরাধ বলেই মনে করে না। সচেতনতা বাড়ালে এবং শাস্তি কার্যকর করা গেলে এর প্রভাব পড়বে। এর জন্য সামাজিক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

গত ২ সেপ্টেম্বর নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে একদল লম্পট ঘরে ঢুকে এক গৃহবধূকে বিবস্ত্র করে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন চালায়। দুর্বৃত্তরা স্বামীকে বেঁধে রেখে গৃহবধূকে নির্যাতনের ভিডিও ধারণ করেছিল।

এর আগে গত ২৫ সেপ্টেম্বর সিলেট এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে স্বামীকে আটকে এক নববধূকে ধর্ষণ করে কয়েকজন তরুণ। দুটি ঘটনায়ই ক্ষমতাসীন দলের কর্মী এবং উঠতি সন্ত্রাসীরা জড়িত বলে তথ্য মেলে। এসব ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সুবিচারের দাবি ওঠে সব মহল থেকে। শুরু হয় আন্দোলন। দুই সপ্তাহের বিক্ষোভের মধ্যে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন সংশোধন করে সরকার।

আইন সংশোধনের পর এক মাস ১০ দিনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঢাকার সাভার ও আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জ, বরিশাল ও গাজীপুরে বেশি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় দায়ের করা মামলায় প্রায় আড়াই শ জনকে আসামি এবং ১৮২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আসামিরা প্রতিবেশী, আত্মীয়, প্রেমিক ও স্কুল-মাদরাসার শিক্ষক। অপরিচিত ব্যক্তিদের দ্বারা ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১৮ জন। মুদি দোকানি, সেলুনের কর্মী, ইজি বাইকের চালক, বাসচালক, চালকের সহকারী, রিকশাচালক, কবিরাজ, সবজি বিক্রেতা, ফায়ার সার্ভিসের কর্মী, পুলিশ সদস্য, বিজিবি সদস্য, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি দ্বারা ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। সহায়তাকারী হিসেবে কমপক্ষে তিনজন নারীর বিরুদ্ধে এ সময় অভিযোগ উঠেছে।

বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, ‘এখনো যারা ধর্ষণ করে যাচ্ছে, তাদের মৃত্যুদণ্ড হলো কি হলো না তার খবর নেই। এখানে জনসচেতনতা বাড়ানোর কাজ করতে হবে। অনেকে নারীকে নির্যাতন করা অপরাধই মনে করে না। কারণ এর জন্য শাস্তির মুখোমুখি হতে হয় না। যুবসমাজকে উন্নয়নমূলক কাজে সম্পৃক্ত করতে হবে।’

পুলিশের সাবেক প্রধান আব্দুল কাইউম বলেন, ‘ধর্ষণ হওয়ার আগেই নিপীড়নের ঘটনায়ও যেন দ্রুত তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। আগের আইনগুলোও আছে। আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমেই পুলিশ পারে বিষয়টি নিয়ন্ত্রণের। প্রয়োজন আইনের বাস্তবায়ন। হত্যার শাস্তিও মৃত্যুদণ্ড, এ কারণে হত্যা বন্ধ হয়নি। তবে হত্যা করলে ফাঁসি হবে, ভয় পায় মানুষ। তদন্ত আর বিচারে সাজা নিশ্চিত করতে হবে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন্স অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. তানিয়া হক বলেন, ‘ধর্ষক বা লাঞ্ছনাকারীদের আমরা উল্লাস করতে দেখি। নারীদের নির্যাতন অপরাধ নয়, এই জঘন্য মানসিকতা গড়ে উঠেছে অনেকের মধ্যে। মূলত বিচারহীনতা এবং ক্ষমতার প্রভাব এটি করছে। এটি হচ্ছে পরিবার থেকে সমাজ, রাষ্ট্রে সবখানে। একদল আদিম মানসিকতাতেই দেখছে নারীদের। তাদের চিহ্নিত করতে হবে। যেহেতু তাদের সেই বোধ নেই, সেহেতু শক্ত বা দৃষ্টান্তমূলক বিচারের ভয় দেখাতে হবে তাদের।’ সূত্র: কালের কণ্ঠ