ধুম চলেছে বেচাকেনা তেলের বাজারে… !

প্রকাশিত

রাজীব সরকার-
সারাবিশ্বের একটা সংকট তৈরী করে দিয়েছে করোনা ভাইরাস। বিশ্ব মোড়ল দেশগুলোও এসমস্যায় জর্জরিত। প্রতিদিন আক্রান্ত হচ্ছে হাজারো মানুষ, দিন দিনের পর দিন বিশ্ববাসী দেখছে লাশের মিছিল। এমতাবস্থায় বিশ্যববাসী যখন এসমস্যা থেকে পরিত্রানের উপায় খুজতে ব্যস্ত তখন আমরা ব্যস্ত বিশেষ ব্যক্তির সুদৃষ্টি পাওয়ার আশায় সত্যকে আড়াল করে তৈল মর্দনে। আমাদের দেশে সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থায় রয়েছে বিনা পুঁজির এই ব্যবসা। কে কার চেয়ে বেশি তৈল মর্দন করতে পারে এবিষয়কে সামনে রেখে প্রতিযোগিতা চলছে। যে যত বেশি তৈলমর্দন করতে পারে তার অবস্থা তত বেশি ভাল। সমাজের সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম সংগঠন পরিবার থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এমনকি ধর্মীয় সংগঠনগুলোও জড়িয়ে যাচ্ছে এ ব্যবসায়। সমস্ত রাষ্ট্রযন্ত্রই যেন আঁতেল নির্ভর হয়ে যাচ্ছে যা মোটেও কাম্য নয়।
একটা উদাহরন টেনে শুরু করতে চাই আঁতেলতার বাজারের অবস্থার বিস্তারিতটা। গত ২০ এপ্রিল সোমবার করোনা সংকট মোকাবেলা করার স্বার্থে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৮ জেলার রাজনৈতিক নেতা ও আমলাদের সাথে ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত ছিলেন। বিভিন্ন সমস্যা ও সমাধানে দিক নির্দেশনার দেয়ার অংশ হিসেবে আয়োজিত এই কনফারেন্স শুরু হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী প্রতিটা জেলার আমলা ও রাজনৈতিক নেতাদের সাথে কথা বলেন। এসময় প্রধানমন্ত্রী আমলা ও নেতাদের কাছে সমস্যা সম্পর্কে জানতে চান। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, আমলারা জনগনের সমস্যা নিয়ে কম/বেশি কথা বললেও নেতারা ব্যস্ত থাকেন তৈল মর্দনে। বেশির ভাগ নেতাই প্রধানমন্ত্রীর সাথে কথা বলার সময় তাদের ব্যক্তিগত বিষয়, অতিত সময়ের নিজেদের কার্যক্রম নিয়ে কথা বলে সময় পাড় করে দেন। এক নেতা তৈল মর্দন করতে করতে করোনা থেকে পরিত্রাণ পেতে বেশি করে শুকনা মরিচ দিয়ে আলু ভর্তা বানিয়ে ভাত খাওয়ার মত তত্ত¡ দিয়ে বসলেন, যা রীতিমত হাসির খোড়াক হয়েছে দেশবাসীর জনে। কিন্তু জনসাধারনের সমস্যার কথা বলার প্রয়োজন বোধ করেননি তারা।
সাম্প্রতিক সময়ে নতুন আরেকটি বিষয় সকলেরই দৃষ্টিগোচর হয়েছে বোধ হয়। তা হলো, ধান কাটা। হায়রে ধান কাটা। করোনার জন্যে ধান কাটা শ্রমিক সংকটের কথা ভেবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কৃষকের ধান কেটে দিতে দলীয় নেতা/কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানানোর পর থেকে হাইকমান্ডের সান্নিধ্য পাওয়ার আশায় শুরু হয়েছে নাটকীয়তা। এমপি থেকে শুরু করে দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা চলে যাচ্ছেন মাঠে। কেউ দামী সু পড়ে, আবার কেউ দামী চশমা পরে, কেউবা আবার গ্লোভস পড়ে ধানের দুইটা ছড়া হাতে নিয়ে বা এক মুঠো ধানের ছড়া কাঁধে নিয়ে ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আপলোড দিয়ে দলীয় হাইকমান্ডের দৃষ্টিতে আসার জোর চেষ্ঠা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের মধ্যে কেউ আবার লোক দেখানো ধান কাটার নামে কৃষকের কাঁচা ধান কেটে সাবার করে দিয়েছেন। কেউ কেউ শ্রমিকের হাত থেকে কাস্তে নিয়ে ধান কেটে সারা ক্ষেত জুরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ফেলে দিয়েছেন। এই ধান কাটা মিশনে অংশ নেয়াদের মধ্যে মন থেকে কৃষকের উপকার করতেও গিয়েছেন অনেকেই। কিন্তু অধিকাংশই মূলত গিয়েছেন ছবি তুলে হাইকমান্ডকে জানান দিতে, যাদের মুল উদ্দেশ্য ছিল তৈলমর্দন।
রাজনৈতিক ক্ষেত্রে আঁতেলদের বাজার সব চেয়ে বেশি জমজমাট। বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় আঁতেলদের সংখ্যাই বেশি তাই তাদের বদৌলতে রাষ্ট্রের বিভিন্ন ছোট বড় অনেক দপ্তরে অধিষ্ঠিত হচ্ছে অযোগ্য, অসামর্থ, নেশাখোর, মাতাল, চরিত্রহীন শ্রেণির লোকজন। চরিত্র বলতে কিছু থাক বা না থাক টাকা থাকলেই হল। ক্ষমতা দেওয়ার জন্যেত আঁতেলরা আছেই। আমরা যারা সাধারন জনগণ আছি একবার কি ভেবে দেখেছি অন্যের কথায় আমরা যাকে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অধিষ্ঠিত করছি কে সে? কি তার পরিচয়? কি তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট? কি তার যোগ্যতা? এই কথাটা সবারই জানা যে,“দ্বায়িত্বহীন লোককে দ্বায়িত্ব দেওয়াও চরম দ্বায়িত্ব হীনতা”। তাহলে দ্বায়িত্ব দিয়ে হা-হুতাশ করার কি দরকার? দ্বায়িত্ব দেওয়ার আগে ভেবে নিন যাকে দিচ্ছেন সে দ্বায়িত্ব পালনে কতটুকু সচেতন।
এবার আসা যাক অফিস আদালতের তেলবাজদের অবস্থায়। বর্তমান যুগে অপ্রিয় সত্য কথা বলার মানুষ খুব একটা খুঁজে পাওয়া যায় না। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সিইও বা ম্যানেজারদের আশে-পাশে নির্জলা সত্য কথা বলা লোকের অভাব আরও বেশি। এর অনেকগুলো কারন আছে। মানুষ স্বভাবতই চায় তার সিনিয়রদের বা বসদের ভালবাসা এবং প্রশংসা পেতে। অধিকাংশ মানুষই আছে যারা কষ্ট করে তাদের কর্মক্ষমতা, দক্ষতা, সততা দিয়ে ভালবাসা অর্জন করতে চায় না। তারা বেছে নেয় ভালবাসা অর্জনের অন্য উপায়। তৈল মর্দনের মত কুৎসিত পথ। এই শ্রেণির লোকেরা কথায় কথায় বুঝে নাবুঝে জ্বি স্যার, হ্যাঁ স্যার, ইয়েস স্যার অথবা জ্বি ভাই, হ্যাঁ ভাই, ইয়েস ভাই বলতে থাকে। এক কথায় ওরা উর্দ্ধতন কর্মকর্তার উপর তোষামোদ করেই চাকুরি টিকিয়ে রাখে। বস্ কোন আইডিয়া শেয়ার করলে তা ঠিক মত না শুনে, না বুঝেই বলে উঠে দারুন স্যার, অসাধারন আইডিয়া। এরা কখনো সত্যি কথা বলে না। বস্ একটা মারাত্মক ভূল কথা বা প্রতিষ্ঠানের জন্য ক্ষতি হবে এমন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে বুঝেও প্রকাশ করে না। তারা মনে করে বসের মতামতের বিরুদ্ধে গেলেই যদি বস্ অসন্তুষ্ট হন। বসের বিরুদ্ধে গিয়ে নিজের ক্ষতি করে লাভ কি? তার চেয়ে বরং প্রতিষ্ঠানেরই ক্ষতি হোক। এভাবেই বস্ বা ভাইদের ভূল সিদ্ধান্ত গুলোকে প্রাধান্য দিয়ে দেশ ও জাতির সর্বনাশ করছে আঁতেলরা।
সামাজিক দিক থেকেও খুব একটা পিছিয়ে নেই এই ব্যবসা। মানুষ যেহেতু সমাজবদ্ধ জীব সেহেতু সমাজে বসবাস করতে গিয়ে অনেক সময় কিছু বিশৃংখল পরিস্থিতিতে পরতে হয় কারন সমাজের সুখ-দুঃখ, ভাল-মন্দ, আনন্দ-বেদনা, চাওয়া-পাওয়া ইত্যাদি নিয়েই মানব জীবন। তাই অবাঞ্চিত বা অনাকাংখীত ঘটনা ঘটাও স্বাভাবিক। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সমাজপতীদের সাথে নিয়ে আঁতেলবাজরা টাকা খেয়ে পুরো সত্য ঘটনাটাকে ধামাচাপা দিয়ে ঘটনার দায়ভার চাপিয়ে দিচ্ছে নির্যাতিতের উপর। যাতে করে নির্যাতিত হচ্ছে সর্বশান্ত আর নির্যাতনকারী হচ্ছে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ।
সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ক্ষেত্রগুলোর কথা কি আর বলব? এসব ক্ষেত্রে টাকার বিনিময়ে পদ বেচা-কেনার ঘটনা মোটামুটিভাবে সবারই জানা। যার অনুদান যত বড় তার পদবীটাও তত বড়। এদিক থেকেও বড় ভূমিকা রাখছে তেলবাজরা। সৎ, দক্ষ ও কর্মক্ষম মানুষদের বাদ দিয়ে আঁতেলদের দৌরাত্মে দায়িত্ব চলে যাচ্ছে অযোগ্যদের হাতে। যে কারনে মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে সংগঠনগুলো। তাই অর্থের মানদন্ডে যাচাই না করে চারিত্রিক ও যোগ্যতার মানদন্ডে যাচাই করে ক্ষমতা প্রদান করে সমগ্র দেশের উন্নয়নে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখাই শ্রেয়।
অবশেষে সেই সব বস্, স্যার ও ভাইদেরকে বলছি, প্রশংসা শুনতে সবারই ভাল লাগে তাই বলে ভাল-মন্দ সব কাজেই যারা প্রশংসা করে তারা অবশ্যই আপনার ভাল চায় না। তাদের কাজই হচ্ছে তেল মেরে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করা। আজ আপনাকে তেল মারছে কাল আরেকটু বড় স্বার্থের জন্যে আরেকজনকে মারবে এমন কি আপনাকে থু থু দিতেও বুক কাঁপবে না তার। তাই আঁতেল হতে নিরাপদ দুরত্ব বজায় রাখুন এবং একটি সুন্দর শ্রেষ্ঠ জাতি গঠনে হউন বদ্ধ পরিকর।
আঁতেল ভাইদেরকে বলছি… আঁতেলতা বাদ দিয়ে সঠিক সমালোচক হন। সাদাকে সাদা আর কালকে কাল বলতে শিখেন। প্রতিবাদী হোন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। এতে করে হয়ত ব্যক্তিগত সুবিধা খুব একটা পাবেন না, পকেটটাও গরম হবে না তবে একটা সুন্দর দেশ গড়া যাবে। যে দেশে অযোগ্যদের হাত ক্ষমতা থাকবে না বরং যোগ্যরাই প্রতিষ্ঠিত হবে। আর যোগ্যরা প্রতিষ্ঠিত হলে দেশ হয়ে উঠবে শক্তিশালী ও পরাক্রমশালী। তাই যত শীঘ্র সম্ভব তেলবাজিকে পরিহার করুন, সুখি ও সমৃদ্ধশালী দেশ গড়–ন।
পরিশেষে বলব, জানি আমি যত কথাই বলি তাতে আপনাদের তথা তেলবাজদের কিছুই আসে যায় না। বরং আপনাদের কাছে আমি পাগল বলেও আখ্যায়িত হতে পারি। বিশ্বাস করুন, তাতে আমারও কিছু আসে যায় না। কারন আমি জানি আঁতেলতা আপনাদের চিন্তায়-চেতনায়-আত্মায়-মননে-মগজে-ধ্যানে-জ্ঞানে, এক কথা সর্বত্রই। তবে বর্তমান চলমান করোনা সংকট মোকাবেলার স্বার্থে হলেও এই পেশা থেকে সড়ে এসে মানুষের পাশে দাঁড়ান। যাদের সামর্থ্য আছে তারা একেক জন অন্তত একটা করে পরিবারকে সহযোগীতা করুন। তাহলে খুব সহজেই এই সংকট কাটিয়ে উঠা সম্ভব। নইলে সরকারের একার পক্ষে এত বড় জনগোষ্ঠীর সকল দ¦ায়ভার নেয়া দুরুহ ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে। তাই আপাতত জনকল্যাণ নিয়ে ভাবুন। কেননা, মানুষ বেঁচে থাকলে তেল মারার জায়গা পাবেন নইলে তেল থাকলেও তা প্রয়োগ করার জায়গা নাও পেতে পারেন।